মানুষ মাত্রই ভুল করে। কখনো নিজের প্রবৃত্তির তাড়নায়, কখনো শয়তানের প্ররোচনায় মানুষ গুনাহে জড়িয়ে পড়ে। কিন্তু গুনাহ করার পর হতাশ হয়ে পড়া নয়, বরং অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে ফিরে আসাই ইসলামের শিক্ষা। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের আন্তরিকভাবে তওবা করার নির্দেশ দিয়েছেন। তবে তওবা করার সঠিক নিয়ম কী? গুনাহ থেকে ফিরে আসতে হলে কোন বিষয়গুলো মেনে চলা জরুরি?
১. গুনাহ ছেড়ে আল্লাহর কাছে ফিরে আসা
তওবার প্রথম শর্ত হলো যে গুনাহের জন্য তওবা করা হচ্ছে, তা থেকে বিরত থাকা। শুধু মুখে ক্ষমা চাওয়া নয়, বরং নিজের কাজ ও আচরণে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করতে হবে। গুনাহের পথ থেকে সরে এসে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করাই তওবার মূল উদ্দেশ্য।
২. নিজের ভুলের জন্য অনুতপ্ত হওয়া
আন্তরিক তওবার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো গুনাহের জন্য অনুশোচনা করা। নিজের ভুল উপলব্ধি করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে এবং সেই ভুল থেকে ফিরে আসার চেষ্টা করতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘অনুশোচনাই তওবা।’ (সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৪২৫২)
৩. ভবিষ্যতে গুনাহ না করার দৃঢ় সংকল্প করা
তওবা করার সময় মনে দৃঢ় সংকল্প রাখতে হবে, ভবিষ্যতে আর সেই গুনাহে জড়ানো যাবে না। তবে পরবর্তী সময়ে দুর্বলতার কারণে আবারও গুনাহ হয়ে গেলে হতাশ হওয়া উচিত নয়। বরং পুনরায় আন্তরিকভাবে তওবা করে নিজেকে সংশোধনের চেষ্টা করতে হবে।
৪. অন্যের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া
গুনাহের সঙ্গে যদি অন্য মানুষের অধিকার জড়িত থাকে, তাহলে শুধু আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়াই যথেষ্ট নয়। কারও সম্পদ আত্মসাৎ করলে তা ফিরিয়ে দিতে হবে, কারও পাওনা থাকলে পরিশোধ করতে হবে এবং অন্যের ক্ষতি করে থাকলে যথাসম্ভব তা সংশোধন করতে হবে। মানুষের অধিকার রক্ষা করা আন্তরিক তওবার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
৫. বেশি বেশি ইস্তিগফার ও নেক আমল করা
আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার পাশাপাশি বেশি বেশি ইস্তিগফার করতে হবে এবং নেক আমল বাড়াতে হবে। নিয়মিত নামাজ আদায়, কোরআন তিলাওয়াত, দান-সদকা ও মানুষের উপকার করার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করা যায়।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে আন্তরিক তওবা করো।’ (সুরা আত-তাহরিম, আয়াত: ৮)
তওবা করার জন্য কি নির্দিষ্ট কোনো দোয়া আছে?
তওবা করার জন্য নির্দিষ্ট একটি বাক্য বলতেই হবে, এমন নয়। নিজের ভাষায়ও আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া যায়। তবে ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ অর্থাৎ, আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি, এ কথা বেশি বেশি বলা যায়। পাশাপাশি নিজের গুনাহ স্বীকার করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও সাহায্য চাইতে হবে।
কোরআনে বর্ণিত একটি গুরুত্বপূর্ণ দোয়া হলো:
উচ্চারণ: রাব্বানা জালামনা আনফুসানা, ওয়া ইল্লাম তাগফির লানা ওয়া তারহামনা লানাকুনান্না মিনাল খাসিরিন।
অর্থ: হে আমাদের রব! আমরা নিজেদের প্রতি জুলুম করেছি। আপনি যদি আমাদের ক্ষমা না করেন এবং আমাদের প্রতি দয়া না করেন, তবে অবশ্যই আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হব।(সুরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ২৩)।
গুনাহ যত বড়ই হোক, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া যাবে না
মানুষ বারবার ভুল করতে পারে। তবে গুনাহের কারণে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া উচিত নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করেন।’ (সুরা আয-যুমার, আয়াত: ৫৩)
এই আয়াত মানুষকে আল্লাহর ক্ষমা ও রহমতের ব্যাপারে আশাবাদী হতে শেখায়। তবে ক্ষমার আশা নিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে গুনাহে অবিচল থাকা নয়, বরং আন্তরিকভাবে গুনাহ ছেড়ে আল্লাহর দিকে ফিরে আসাই একজন মুমিনের কর্তব্য।
তওবা করার জন্য বিশেষ কোনো দিন বা মাসের অপেক্ষা করতে হয় না। গুনাহের কথা উপলব্ধি হলে যত দ্রুত সম্ভব তওবা করা উচিত। কারণ মানুষের জীবন অনিশ্চিত। তাই আজই নিজের ভুল সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
