আফগানিস্তানের ক্ষমতা পুনর্দখলের পর থেকেই নারীশিক্ষার উপর একের পর এক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে তালিবান নেতৃত্ব। গোটা বিশ্বের সমালোচনা ও নিন্দার মুখে পড়েও নারীকে দমিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত থেকে একচুল নড়েনি সে দেশের শাসকেরা। যদিও তালিবান সরকারের দাবি, তারা মোটেই নারীশিক্ষার বিরোধী নয়!
০১ / ১৭
তালিবানি শাসনে আইনকানুন যে সব্বোনেশে, তার পরিচয় আগেই পেয়েছে গোটা বিশ্ব। বিশেষ করে মেয়েদের। পান থেকে চুন খসলেই কঠোর শাস্তি। বিশেষ শর্তে নারীদের বিরুদ্ধে গার্হস্থ্য হিংসাও সেখানে ‘বৈধ’। নিয়ম না মানলে স্ত্রী এবং সন্তানদের শারীরিক ভাবে শাস্তি দিতে পারবেন আফগান পুরুষেরা। এমনই ফতোয়া রয়েছে তালিব শাসিত আফগানিস্তানে।
০২ / ১৭
পাঁচ বছর আগে আফগানিস্তানের ক্ষমতা পুনরায় দখল করেছিল তালিবান। তার পর থেকে মহিলাদের উপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। সে দেশে মেয়েরা ষষ্ঠ শ্রেণির পরে আর স্কুলে যেতে পারে না। অধিকাংশ চাকরিতেই মহিলাদের উপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। পুরুষ সঙ্গী ছাড়া বাড়ির বাইরে বেশি দূর যেতে পারেন না আফগান মহিলারা।
০৩ / ১৭
আফগান মহিলাদের চলাফেরা, জীবনযাপনকে বজ্র আঁটুনির মধ্যে রেখে দিতে আরও কঠোর নিয়মকানুন আরোপ করছে তালিব শাসকেরা। তারা সে দেশের নারীদের পোশাক ও চলাফেরার উপর প্রবল বিধিনিষেধ আনায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে রাজধানী কাবুল ও হেরাতে অন্তত ৫২ জন মহিলা ও এক কিশোরীকে আটক করেছেন তালিবান কর্তৃপক্ষ।
০৪ / ১৭
গত ৮ অক্টোবর রাষ্ট্রপুঞ্জের আফগানিস্তান সহায়তা মিশন (উনামা) এক বিবৃতিতে এই তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। এই সমস্ত মহিলাদের ‘অপরাধ’ ছিল রঙিন স্কার্ফ পরা, সর্বাঙ্গ ঢাকা পোশাক না পরা, রূপটান ব্যবহার করা ও চুলের অংশ দেখা যাওয়া। এ ছাড়াও মাহরাম (নির্দিষ্ট পুরুষ অভিভাবক) ছাড়া প্রকাশ্যে বা জনসমক্ষে বার হওয়ার অপরাধে মহিলাদের ধরপাকড় করে তালিব শাসকদল।
০৫ / ১৭
উনামার তথ্য অনুযায়ী, আটক মহিলাদের কয়েক ঘণ্টা হেফাজতে রাখার পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। তবে এই ঘটনাগুলির প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। সামাজিক কলঙ্কের ভয় এবং মহিলাদের নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে অনেক ঘটনা সামনে আসছে না বলে মনে করছে রাষ্ট্রপুঞ্জের আফগানিস্তান সহায়তা মিশন।
০৬ / ১৭
শুধু গ্রেফতার বা আটকই নয়, আফগান নারীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, মারধর এবং হুমকির ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিশেষ করে মহিলা দোকানদারদের সঙ্গে এ ধরনের আচরণের অভিযোগ বিপুল পরিমাণে সামনে এসেছে। উনামা-র মতে, এই ধরনের পদক্ষেপ নারীর স্বাধীন ভাবে চলাফেরা, নিজের মত প্রকাশ এবং ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
০৭ / ১৭
আফগানিস্তানের ক্ষমতা পুনর্দখলের পর থেকেই নারীশিক্ষার উপর একের পর এক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে তালিবান নেতৃত্ব। ২০২২ সালের মার্চে, ক্ষমতা দখলের প্রায় সাত মাস পরে, আচমকাই মেয়েদের হাই স্কুলে যাওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। পরবর্তী সময়ে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও মহিলাদের জন্য বন্ধ হয়ে যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজা। তালিবানের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আমেরিকা-সহ বিশ্বের বহু দেশ প্রতিবাদ জানায়। আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচনা সত্ত্বেও নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসেনি তালিবান নেতৃত্ব।
০৮ / ১৭
গোটা বিশ্বের সমালোচনা ও নিন্দার মুখে পড়েও নারীকে দমিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত থেকে একচুল নড়েনি সে দেশের শাসকেরা। যদিও তালিবান সরকারের দাবি, তারা মোটেই নারীশিক্ষার বিরোধী নয়। বরং পোশাকবিধি-সহ কয়েকটি বিষয় পর্যালোচনা ও সংশোধনের উদ্দেশ্যেই সাময়িক ভাবে মেয়েদের পড়াশোনা বন্ধ রাখা হয়েছিল।
০৯ / ১৭
তবে সেই সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। এর পর থেকে আফগানিস্তানে মেয়েদের জন্য কার্যত বন্ধই রয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার দরজা। মহিলাদের উচ্চ স্বরে কথা বলার উপরেও নিষেধাজ্ঞা চাপিয়েছে তালিবান সরকার। আফগানিস্তানের মহিলারা জনসমক্ষে বা বাড়ির ভিতরে জোরে কথা বলতে পারবেন না বলে নিয়ম চালু করা হয়েছে।
১০ / ১৭
আফগানিস্তানে তালিবান শাসনে প্রকাশ্যে গান গাওয়া, আবৃত্তি করা বা স্লোগান দেওয়ার মতো কাজকর্ম করলে কঠোর শাস্তির মুখে পড়তে হয় মহিলাদের। এমনকি সে দেশে নারীর প্রকাশ্যে কথা বলাও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নতুন করে এই আটকের ঘটনায় আফগানিস্তানে নারীর অধিকারের সীমা আরও সঙ্কুচিত হল বলে মনে করছে মানবাধিকার সংগঠনগুলির একাংশ।
১১ / ১৭
নারীর পোশাকবিধি নিয়ে তালিবান কর্তৃপক্ষ কঠোর অবস্থান নিলেও প্রতিবাদের স্ফূরণ দেখা দিয়েছে আফগানভূমে। গত জুন মাসে হেরাতে একটি বিরল বিক্ষোভের ঘটনাও সামনে আসে। প্রত্যক্ষদর্শী এবং রাষ্ট্রপুঞ্জের মিশনের তথ্য অনুযায়ী, সেই বিক্ষোভে আফগান কর্তৃপক্ষ গুলি চালান। ঘটনায় অন্তত এক জনের মৃত্যু হয়। আহত হন আরও বেশ কয়েক জন।
১২ / ১৭
এই ঘটনা আফগানিস্তানে নারীর অধিকার এবং প্রতিবাদ জানানোর স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করে। গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আফগানিস্তানে রাষ্ট্রপুঞ্জের শাখা সংগঠনটি। পোশাকবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে মহিলাদের আটক করার মতো পদক্ষেপ নিয়ে রীতিমতো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে তারা। পাশাপাশি আফগান নারীদের চলাফেরার স্বাধীনতা, মত প্রকাশের অধিকার এবং নিজেদের জীবন সম্পর্কে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার উপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ কায়েম করা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছে উনামা।
১৩ / ১৭
তালিবদের জারি করা বিধি অনুযায়ী, আফগানিস্তানের মহিলাদের সর্বদা শরীর সম্পূর্ণ ঢেকে রাখতে হবে। এমনকি মুখমণ্ডল ঢেকে রাখাও বাধ্যতামূলক। শুধু পোশাকবিধিই নয়, অপরিচিত পুরুষের দিকে তাকানোর ক্ষেত্রেও মহিলাদের উপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এই কঠোর নিয়মগুলির ফলে আফগানিস্তানে নারীর ব্যক্তিস্বাধীনতা ও স্বাভাবিক জীবনযাপন ক্রমশই বাধার মুখে পড়ছে বলে মত সমাজবিদদের।
১৪ / ১৭
মহিলাদের পাতলা আঁটোসাটো পোশাক পরা নিষিদ্ধ তালিব রাজত্বে। রাস্তায় বোরখা বা সর্বাঙ্গ ঢাকা পোশাক আবশ্যিক। পায়ের পাতাটকু দেখা গেলেও কঠিন শাস্তি। ঝাঁ-চকচকে বিউটি পার্লারে ঝোলানো হয়েছে তালা। মেয়েদের ছবিতেও বুলিয়ে দেওয়া হয় রঙের প্রলেপ। একা রাস্তায় বেরনোর অর্থ হল যেচে মৃত্যুকে বরণ করা।
১৫ / ১৭
নিয়ম না মানার শাস্তি কী, তা হাড়ে হাড়ে জানেন আফগান নারীরা। প্রকাশ্যে রাস্তায় পাথর ছুড়ে হত্যা, নয়তো হাত-পা কেটে দেওয়া কিংবা স্রেফ ফাঁসিকাঠে ঝুলিয়ে দেওয়া। এক আফগান তরুণীর কথায়, ‘‘তালিবান মেয়েদের মানুষ ভাবে না, শুধু একদলা মাংস আর চামড়া।’’
১৬ / ১৭
আফগানিস্তানে রাষ্ট্রপুঞ্জের মিশনের প্রধান রোজ়া ওটুনবায়েভা ২০২৪ সালে জানান, নারীর অধিকারের, বিশেষত নারীশিক্ষার উপর তালিবান শাসকের জারি করা নিষেধাজ্ঞা আফগানিস্তানকে মানবিক মূলধন থেকে বঞ্চিত করছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের ভবিষ্যৎ।
১৭ / ১৭
৫ অক্টোবর আফগানিস্তানে নারী ও কিশোরীদের অধিকার খর্ব করার অভিযোগে চার জন শীর্ষ তালিবান কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করার কথা প্রকাশ্যে এনেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)। তাঁদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। আফগানিস্তানে নারীর শিক্ষা, স্বাধীনভাবে চলাফেরা এবং অন্যান্য মৌলিক অধিকারের উপর তালিবান সরকারের আরোপিত বিধিনিষেধের প্রেক্ষাপটে এই পদক্ষেপ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন অনেকেই।
সব ছবি: সংগৃহীত।
