ডেঙ্গুর সময়ে রোগীর পথ্য হিসেবে ব্যবহৃত মাল্টা আমদানিতে শুল্ক-করভার ১২১ দশমিক ৭৮ শতাংশ। অর্থাৎ আমদানি পর্যায়ে যে মাল্টার প্রতি কেজির দাম প্রায় ৮৭ টাকা, সেই মাল্টার জন্যই শুল্ক-কর দিতে হচ্ছে প্রায় ১০৭ টাকা।
অথচ চলতি অর্থবছরের ট্যারিফ অনুযায়ী, টেসলা বা মার্সিডিজ বেঞ্জসহ অন্তত ১৪৬টি এইচএস কোডভুক্ত গাড়ি আমদানিতে শুল্ক-করের হার মাল্টার চেয়ে কম।
সম্প্রতি আমদানি কমে যাওয়ায় খুচরা বাজারে মাল্টার দাম কেজিপ্রতি ৪৮০ থেকে ৫২০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। সরবরাহ বাড়ার পর অবশ্য দাম কিছুটা কমে এখন কেজিপ্রতি প্রায় ৪০০ টাকা হয়েছে। তবে আমদানি পর্যায়ে পণ্যের দামের তুলনায় শুল্ক-কর বেশি হওয়ায় আবারও আলোচনায় এসেছে মাল্টার উচ্চ করভার।
বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক তৌহিদুল আলম বলেন, বিশ্বের কোথাও ফল আমদানিতে এত শুল্ক–কর নেই। তার ভাষ্য, বাংলাদেশে মাল্টাসহ তাজা ফলে শুল্ক–কর গাড়ির চেয়েও বেশি।
২০০৬–০৭ অর্থবছরে মাল্টা আমদানিতে মোট শুল্ক-করভার ছিল ৫৯ দশমিক ২৫ শতাংশ। তখন প্রতি কেজি মাল্টায় শুল্ক-কর দিতে হতো প্রায় ১২ টাকা। এরপর ধাপে ধাপে করভার বাড়তে থাকে। ২০২১-২২ অর্থবছর পর্যন্ত তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮৯ দশমিক ৩২ শতাংশে। তখন প্রতি কেজিতে শুল্ক-কর দিতে হতো প্রায় ৩৮ টাকা।
করভার আরও বাড়ে ২০২২ সালের মে মাসে। ডলার-সংকটের মধ্যে আমদানি নিরুৎসাহিত করতে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ফলের ওপর নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক আরোপ করে। এতে মাল্টার মোট শুল্ক-করভার বেড়ে প্রায় ১১৪ শতাংশে ওঠে।
এরপর ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মাঝামাঝি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে করভার আরও বাড়িয়ে ১৩৬ শতাংশ করা হয়। এর প্রতিবাদে আন্দোলনে নামেন ফল আমদানিকারকেরা। পরে ২০২৫ সালের মার্চে বাড়তি শুল্ক-কর কিছুটা কমানো হয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছর থেকে মাল্টার মোট শুল্ক-করভার নির্ধারণ করা হয় ১২১ দশমিক ৭৮ শতাংশ, যা এখনো বহাল রয়েছে।
একদিকে মাল্টাসহ তাজা ফলের ওপর শুল্ক-কর বাড়ানো হয়েছে, অন্যদিকে পরিবেশবান্ধব প্লাগ-ইন হাইব্রিড ও বৈদ্যুতিক গাড়িতে শুল্ক–করের সুবিধা দেওয়া হয়েছে। ফলে কোনো কোনো বৈদ্যুতিক গাড়ির করভার মাল্টার প্রায় অর্ধেক।
বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ইলন মাস্কের বৈদ্যুতিক গাড়ি টেসলা আমদানি হয়েছে সাতটি। বছরভেদে এসব গাড়িতে শুল্ক-কর দিতে হয়েছে ৮৯ থেকে ৯২ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে ৫০ হাজার ডলার মূল্যের টেসলা আমদানি করলে সর্বোচ্চ শুল্ক-করভার হবে ৮০ শতাংশ। আর ২৫ হাজার ডলারের বিওয়াইডি বা একই শ্রেণির বৈদ্যুতিক গাড়িতে করভার ৬৪ শতাংশ।
মার্সিডিজ বেঞ্জের ক্ষেত্রেও চিত্র একই। গত ২৩ সেপ্টেম্বর ঢাকার কমলাপুর আইসিডি থেকে ২০২৬ সালে তৈরি তিনটি মার্সিডিজ বেঞ্জ গাড়ি খালাস করেছে র্যানকন মোটরস লিমিটেড। ১ হাজার ৯৯৯ সিসির প্লাগ–ইন হাইব্রিড প্রতিটি গাড়ির বাজারমূল্য প্রায় ২ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। এসব গাড়ি আমদানিতে মোট শুল্ক-কর দিতে হয়েছে ৯৬ দশমিক ১০ শতাংশ হারে।
যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ২৩ গুণ বেশি
মাল্টা উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর একটি যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি নিজে মাল্টা উৎপাদন ও রপ্তানি করলেও বিদেশ থেকেও ফলটি আমদানি করে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি কেজি মাল্টার সাধারণ শুল্কহার ১ দশমিক ৯ সেন্ট। আবার ১৬টি দেশ ও অঞ্চল থেকে মাল্টা আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে শুল্কমুক্ত সুবিধার বাইরে যেসব দেশ থেকে মাল্টা আমদানি হয়েছে, সেসব চালানে গড় কার্যকর শুল্কহার ছিল ৫ দশমিক ১৯ শতাংশ। সেই হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় বাংলাদেশে মাল্টার মোট শুল্ক-করভার প্রায় ২৩ গুণ বেশি।
প্রতিবেশী ভারতেও মাল্টা আমদানিতে ৩০ শতাংশ মৌলিক শুল্ক রয়েছে। অন্যান্য করসহ দেশটিতে মোট করভার প্রায় ৩৩ শতাংশ।
বাড়তি করের চাপ ভোক্তার ওপর
চট্টগ্রাম ফল ব্যবসায়ী সমিতির প্রচার সম্পাদক ও আমদানিকারক জুনায়েদুল হক বলেন, আগে এক কনটেইনার মাল্টা আমদানিতে শুল্ক–কর দিতে হতো প্রায় সাড়ে সাত লাখ টাকা। এখন দিতে হচ্ছে ২৮ থেকে ২৯ লাখ টাকা। তার ভাষ্য, ফলের ওপর এত বেশি শুল্ক-কর আরোপের ফলে শুধু ব্যবসায়ীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন না, শেষ পর্যন্ত এর চাপ পড়ছে ভোক্তার ওপরও।
