কালবেলা · সাধারণ
জীবন বাঁচাতে কিডনি দিচ্ছেন মা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষার অভাবে মৃত্যুশয্যায় ছেলে
২৪/১০/২০২৬

বড় ভাইয়ের কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় ‘ডিটিপিএ রেনোগ্রাম উইথ স্প্লিট ফাংশন অ্যান্ড জিএফআর’ পরীক্ষা করাতে পারছেন না সাংবাদিক নূরে আলম সিদ্দিকী জুয়েল। দেশের সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে খোঁজ করেও পরীক্ষাটি করানোর ব্যবস্থা করতে পারেননি তিনি।
অন্যদিকে, সপ্তাহে দুইবার ডায়ালাইসিসসহ চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে হচ্ছে পরিবারটিকে। এমন পরিস্থিতিতে জরুরি এই পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে প্রধানমন্ত্রী ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন তিনি।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) রাতে নিজের ফেসবুক প্রোফাইল থেকে প্রকাশিত ভিডিও বার্তায় এসব কথা বলেন এই সাংবাদিক। যশোরের মনিরামপুর উপজেলার মুন্সিখানপুর বাড়ির বাসিন্দা মাসুদুর রহমান। পেশায় কমিউনিটি ক্লিনিকের হেলথ প্রোভাইডার। তাকে নিয়েতার ছোটভাই সাংবাদিক জুয়েল জানান, বড় ভাইয়ের কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রস্তুতি হিসেবে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। তবে দাতা হিসেবে তার মায়ের উপযুক্ততা যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় একটি পরীক্ষার ব্যবস্থা না হওয়ায় পরবর্তী চিকিৎসা কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া যাচ্ছে না।
জুয়েল বলেন, গত দুই-তিন মাস ধরে তার পরিবারকে কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। বড় ভাইয়ের চিকিৎসার জন্য চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী কিডনি প্রতিস্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ জন্য তার মা কিডনি দাতা হতে সম্মত হয়েছেন। প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকদের পরামর্শে ক্রস-ম্যাচসহ প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পরীক্ষা করানো হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যায়ে এসে একটি বিশেষ পরীক্ষার জন্য আটকে আছে পুরো প্রক্রিয়া।
ভিডিও বার্তায় পরীক্ষাটির নাম উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ডিটিপিএর রেনোগ্রাম উইথ স্প্লিট ফাংশন অ্যান্ড জিএফআর’। তার ভাষ্য অনুযায়ী, কিডনি দাতার এই পরীক্ষাটি করাতে হচ্ছে জাতীয় কিডনি রোগ ও ইউরোলজি ইনস্টিটিউটের সংশ্লিষ্ট সেবার মাধ্যমে। কিন্তু বর্তমানে দেশে কোথায় পরীক্ষাটি করানো সম্ভব, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাচ্ছেন না তিনি।
জুয়েল জানান, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতাল ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে খোঁজ নিয়েও পরীক্ষাটি করানোর নির্দিষ্ট কোনো ব্যবস্থা পাননি। এমনকি কবে নাগাদ পরীক্ষাটি করা সম্ভব হবে, সে বিষয়েও নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারছেন না। অথচ পরীক্ষাটি সম্পন্ন করা গেলে কিডনি প্রতিস্থাপনের পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া সহজ হতো।
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের সপ্তাহে দুইটা করে ডায়ালিসিস করতে হচ্ছে। সঙ্গে ওষুধ তো চলছেই একাধারে। তো সেক্ষেত্রে আমরা যদি এই টেস্টটা করাতে পারতাম, তাহলে হয়তোবা আমাদের কাজটা আরও সহজ হয়ে যেত।’
পরীক্ষাটি বিদেশে পাঠিয়ে করানোর সুযোগও নেই বলে জানান তিনি। তার ভাষ্য, এটি শুধু রক্ত বা প্রস্রাবের নমুনা পরীক্ষার বিষয় নয়; কিডনি দাতাকে সরাসরি উপস্থিত থেকে পরীক্ষাটি করাতে হয়। ফলে দেশের বাইরে নমুনা পাঠিয়ে পরীক্ষা করানোর বিকল্পও কার্যকর হচ্ছে না।
জুয়েল আরও জানান, সর্বশেষ গত সপ্তাহে পূজার ছুটির আগে তিনি বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েও খোঁজ নিয়েছেন। সেখানেও পরীক্ষাটি করানোর বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাননি। এ সময় একই পরীক্ষার জন্য অপেক্ষায় থাকা আট-নয় বছর বয়সী আরেকটি শিশুর কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষায় থাকায় ওই শিশুটির চিকিৎসাও এগিয়ে নেওয়া যাচ্ছে না।
নিজের পরিবারের পাশাপাশি একই সমস্যায় থাকা অন্য রোগীদের কথা বিবেচনা করে জরুরি ভিত্তিতে পরীক্ষাটির ব্যবস্থা করার আহ্বান জানান সাংবাদিক জুয়েল। তিনি বলেন, দেশের বাইরে গিয়ে চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য সবার নেই। তাই দেশের ভেতরেই প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।
প্রধানমন্ত্রী ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ থাকবে, যেহেতু টেস্টটা খুবই জরুরি, সেক্ষেত্রে দেখুন অনেক মানুষই।’
নিজের অসহায়ত্ব তুলে ধরে জুয়েল বলেন, পরীক্ষাটি কবে করানো যাবে, তা অনিশ্চিত থাকায় তারাও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে এগোচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখলে তার পরিবারের পাশাপাশি একই সমস্যায় থাকা অন্য রোগীরাও উপকৃত হবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
ভিডিওটির ক্যাপশনে জুয়েল লিখেছেন, ‘অনিশ্চয়তার মধ্যে এগিয়ে যাওয়া। শুধু অপেক্ষা আর অপেক্ষা। সোনার বাংলা শুধু বইয়ে না, বাস্তবেও হয়ে ওঠ।’
এর আগে বড় ভাই মো. মাসুদুর রহমানের চিকিৎসায় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করে আলোচনায় এসেছিলেন সাংবাদিক নূরে আলম সিদ্দিকী জুয়েল। মাসুদুর রহমান স্বাস্থ্য বিভাগের মাঠপর্যায়ের একজন কর্মী। জটিল কিডনিজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসা নিচ্ছেন। নিয়মিত ডায়ালিসিসের পাশাপাশি তার চিকিৎসার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
পরিবারের পক্ষ থেকে কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রস্তুতি নেওয়া হলেও প্রয়োজনীয় পরীক্ষার ব্যবস্থা না হওয়ায় চিকিৎসাপ্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে জটিলতা তৈরি হয়েছে। বর্তমানে দাতা হিসেবে জুয়েলের মা প্রস্তুত থাকলেও তার কিডনির কার্যক্ষমতা ও বিভাজিত কার্যকারিতা মূল্যায়নে প্রয়োজনীয় ডিটিপিএ রেনোগ্রাম পরীক্ষাটি করানোই বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজনৈতিক জীবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন জুয়েল। প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে হল সংসদ নির্বাচনে ছাত্রদল মনোনীত প্রার্থী হিসেবে অংশ নেওয়া এবং রাজনৈতিক কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিজ্ঞতার কথা আগেও তুলে ধরেছেন তিনি। পরবর্তী সময়ে রাজনীতি ছেড়ে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন।
আগের বক্তব্যে জুয়েল জানিয়েছিলেন, পরিবারের এই কঠিন সময়ে তিনি মানবিক সহযোগিতা ও মানসিক সমর্থন প্রত্যাশা করেন। এবার বড় ভাইয়ের চিকিৎসায় জরুরি পরীক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী, স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন তিনি।
মূল প্রতিবেদনে যান ↗