কবুতরের মাধ্যমে চিঠি আদান–প্রদান, ঢোল পিটিয়ে সংবাদ প্রচার, ডাকহরকরার ছুটে চলা কিংবা ভোরের সংবাদপত্র ফেরিওয়ালা–বার্তা আদান–প্রদানের ইতিহাস ও ঐতিহ্য এবার পূজামণ্ডপে তুলে ধরেছে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা শ্যামা সংঘ। গতকাল শনিবার সরেজমিনে দেখা যায়, ব্যতিক্রমী এই আয়োজনে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি দর্শনার্থীদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে প্রাচীনকাল থেকে আধুনিক যুগে সংবাদ পৌঁছে দেওয়ার নানা মাধ্যম। মণ্ডপজুড়ে সাজানো হয়েছে বিভিন্ন পত্রিকার কপি, সংবাদবাহকদের প্রতিকৃতি, পুরোনো ছাপাখানার মেশিনের অনুকৃতি এবং শিক্ষণীয় প্রবাদবাক্য। মণ্ডপে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে পত্রিকা হাতে বাসাবাড়ি, অফিস–আদালতে ছুটে চলা সংবাদ ফেরিওয়ালার প্রতিকৃতি। একসময় ভোরের নীরবতা ভেঙে মানুষের ঘরে ঘরে সংবাদ পৌঁছে দেওয়া এসব হকারের অবদানকে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে এখানে। ডিজিটাল যুগে মুহূর্তেই তথ্য আদান–প্রদান সম্ভব হলেও সেই সহজ যোগাযোগব্যবস্থার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। সেই ইতিহাসই শিল্প ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে দর্শনার্থীদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন আয়োজকেরা।
মণ্ডপের বিভিন্ন দেয়াল ও কোণে স্থান পেয়েছে তথ্যবহনের নানা ঐতিহাসিক মাধ্যমের চিত্র। কোথাও ফুটিয়ে তোলা হয়েছে কবুতরের মাধ্যমে চিঠি আদান–প্রদানের দৃশ্য, কোথাও রয়েছে ঢোল পিটিয়ে গ্রামগঞ্জে সংবাদ প্রচারকারীর প্রতিকৃতি। আবার একসময় পায়ে হেঁটে মানুষের কাছে চিঠি ও সংবাদ পৌঁছে দেওয়া রানার বা ডাকহরকরার স্মৃতিও তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে সাইকেলে সংবাদপত্র পৌঁছে দেওয়ার দৃশ্য। প্রতিটি উপস্থাপনায় ফুটে উঠেছে সময়ের সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থার পরিবর্তন এবং সংবাদ পৌঁছে দেওয়ার সঙ্গে যুক্ত মানুষের শ্রম ও অবদানের গল্প।
মণ্ডপের সাজসজ্জায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে সংবাদপত্র। বিভিন্ন স্থানে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে পুরোনো পত্রিকার কপি। দর্শনীয় দুটি কর্নারে স্থান পেয়েছে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী দৈনিক আজাদী–র বহু কপি। পত্রিকাগুলোর সামনে রাখা হয়েছে পাঠকের প্রতিকৃতি। পাশাপাশি তুলে ধরা হয়েছে সংবাদপত্র ছাপানোর মেশিনের চিত্র। মণ্ডপের বিভিন্ন অংশ এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে দর্শনার্থীরা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে যেতে বার্তা আদান–প্রদানের বিবর্তন সম্পর্কে ধারণা পেতে পারেন।
কবুতরের মাধ্যমে চিঠি আদান–প্রদানের দৃশ্যের সঙ্গে রয়েছে আবেগময় বার্তা– ‘কবুতরের ডানায় ভর করে উড়ত ভালোবাসা, দূরত্ব পেরিয়ে চিঠির পাতায় পৌঁছাত মনের ভাষা।’ একইভাবে ঢোল পিটিয়ে সংবাদ প্রচারের দৃশ্যের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে গ্রামীণ জনপদে খবর পৌঁছে দেওয়ার পুরোনো পদ্ধতি। আর রানার ও সংবাদপত্র হকারের প্রতিকৃতিতে স্মরণ করা হয়েছে তাঁদের, যাঁরা প্রতিকূলতা পেরিয়ে মানুষের কাছে সংবাদ পৌঁছে দিয়েছেন।
পতেঙ্গা শ্যামা সংঘের এবারের শারদীয় আয়োজনের মূল ভাবনা ‘যুগান্তরের বার্তাবহন’। এর মূল প্রতিপাদ্য– ‘বার্তা হারিয়ে যায়, বাহনের ইতিহাস থেকে যায়।’ আয়োজকদের মতে, কবুতরের ডানায় বার্তা বহন থেকে শুরু করে ঢোলের শব্দে সংবাদ প্রচার, রানারের ছুটে চলা, সাইকেলে সংবাদপত্র পৌঁছে দেওয়া এবং আজকের পেপারওয়ালা– প্রতিটি মাধ্যমই একটি সময়ের সাক্ষী। এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে সংবাদ ও যোগাযোগের বিবর্তনের পাশাপাশি নীরব বার্তাবাহকদের শ্রম, নিষ্ঠা ও অবদানকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়েছে।
পতেঙ্গা শ্যামা সংঘের কার্যকরী সভাপতি পিন্টু দেব বলেন, “আমরা প্রতিবছর দর্শনার্থীদের সামনে ব্যতিক্রমী কিছু তুলে ধরার চেষ্টা করি। এবার বার্তাবহনের ইতিহাসকে মূল ভাবনা হিসেবে বেছে নিয়েছি। পূজা দেখতে এসে মানুষ যেন আমাদের যোগাযোগব্যবস্থার অতীত ও ঐতিহ্য সম্পর্কেও জানতে পারেন, সেটিই আমাদের প্রত্যাশা।”
কার্যকরী কমিটির সহসভাপতি সুমন বলেন, “এই মণ্ডপ নির্মাণে প্রায় দুই মাস ধরে কাজ চলছে। প্রতিটি বিষয় পরিকল্পনা করে সাজানো হয়েছে, যাতে দর্শনার্থীরা বার্তাবহনের বিভিন্ন ধাপ সহজে বুঝতে পারেন। আমাদের উদ্দেশ্য শুধু মণ্ডপ সাজানো নয়, ইতিহাসকে মানুষের সামনে তুলে ধরা।”
হিন্দুপাড়া শ্মশান শিব ও কালী মন্দিরের পরিচালক লিটন চৌধুরী বলেন, “প্রতিবছরই আমরা ব্যতিক্রমী কিছু আয়োজন করার চেষ্টা করি। এবার বার্তাবাহকদের ইতিহাস ও অবদান তুলে ধরার উদ্যোগ নিয়েছি। আমরা চাই, পূজার পাশাপাশি দর্শনার্থীরা ইতিহাস সম্পর্কেও জানুন।”
মণ্ডপ ঘুরে দর্শনার্থী অনির্বাণ দাশ বলেন, “কবুতর থেকে শুরু করে সংবাদপত্রের হকার– এভাবে যোগাযোগের ইতিহাস একসঙ্গে দেখতে পেরে ভালো লেগেছে। পুরোনো দিনের সংবাদ পৌঁছে দেওয়ার পদ্ধতি সম্পর্কে অনেক কিছু জানা গেল।”
দর্শনার্থী তনুশ্রী দে বলেন, “ধর্মীয় আয়োজনের পাশাপাশি ইতিহাস ও শিক্ষণীয় বিষয় তুলে ধরার উদ্যোগটি ভালো লেগেছে। বিশেষ করে পুরোনো পত্রিকা ও সংবাদবাহকদের প্রতিকৃতি অতীতকে মনে করিয়ে দেয়।”

