সাতক্ষীরা প্রতিনিধি।।
ছেলের খোঁজ নেই। আর সেই ছেলের নেওয়া অগ্রিম টাকার দায় মেটাতে মাকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে এক ইটভাটা সর্দারের বিরুদ্ধে। সাতক্ষীরার শ্যামনগরে ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় শ্রমিকের দাদনপ্রথা, অসহায় পরিবারের নিরাপত্তা এবং অগ্রিম টাকার বিনিময়ে শ্রম আদায়ের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৭টার দিকে শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের জেলেখালি গ্রামের বাড়ি থেকে দীপালি রানী নামে এক নারীকে জোর করে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে ঈশ্বরীপুর ইউনিয়নের শ্রীফলকাটি গ্রামের ইটভাটা সর্দার আমজাদ হোসেনের বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, দীপালি রানীর ছেলে জগদীশ ইটভাটায় কাজ করার শর্তে আমজাদের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নিয়েছিলেন। কিন্তু নির্ধারিত দিনে কাজে যোগ দিতে না যাওয়ায় তাঁর মাকে নিয়ে যাওয়া হয়।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, দুর্গাপূজার বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জন দেখতে গিয়ে নিখোঁজ হন জগদীশ। এরপর থেকে তাঁর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। বৃহস্পতিবার ছিল ইটভাটায় কাজে যোগ দেওয়ার নির্ধারিত দিন। ছেলেকে না পেয়ে ভাটা সর্দার তাঁর মাকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যান বলে অভিযোগ স্বজনদের।
দীপালি রানীর ভাই ভোলানাথ জানান, পূজার আগে ইটভাটায় কাজ করার শর্তে তাঁর ভাগনে জগদীশকে অগ্রিম টাকা দেওয়া হয়েছিল। চুক্তি অনুযায়ী, জগদীশের ভাটায় শ্রমিকের জোগাড়ের কাজ এবং তাঁর মায়ের রান্নার কাজ করার কথা ছিল। কিন্তু বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জন দেখতে গিয়ে জগদীশ আর বাড়িতে ফেরেননি। পরে নির্ধারিত দিনে কাজে যোগ না দেওয়ায় তাঁর বোনকে বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া হয়।
ভোলানাথের অভিযোগ, ঘটনার পর জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে বিষয়টি জানানো হলেও তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিকার পাননি তাঁরা। অসহায় পরিবারটির আশঙ্কা, ছেলের নেওয়া অগ্রিম টাকার দায়ে তাঁর মাকে জোরপূর্বক কাজ করানো হতে পারে।
অন্যদিকে, ভাটা সর্দার আমজাদ হোসেন দাবি করেন, দীপালি রানী ও তাঁর ছেলে—দুজনই তাঁর কাছ থেকে ইটভাটায় কাজ করার কথা বলে টাকা নিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, মা রান্নার কাজ করবেন এবং ছেলে শ্রমিকের জোগাড়ের কাজ করবে। কিন্তু জগদীশ কাজে না গিয়ে পালিয়ে যাওয়ায় তিনি তাঁর মাকে নিয়ে যাচ্ছেন। কাজ করতে না পারলে তাঁকে বাড়ি ফিরিয়ে দেওয়া হবে বলেও দাবি করেন আমজাদ।
তবে অগ্রিম টাকা নেওয়ার অভিযোগ সত্য হলেও কাউকে জোর করে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার অধিকার কারও রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শ্রমের অগ্রিম অর্থ নিয়ে বিরোধের নিষ্পত্তি আইনসম্মত উপায়ে হওয়ার কথা; কোনো ব্যক্তিকে জিম্মি করে বা তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজে বাধ্য করার অভিযোগ গুরুতর।
এ বিষয়ে শ্যামনগর থানার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভুক্তভোগী পরিবার থানায় এসে সুনির্দিষ্ট তথ্যসহ লিখিত অভিযোগ দিলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঘটনাটি শুধু অগ্রিম টাকা নিয়ে বিরোধের নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একজন নারীর নিরাপত্তা, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মর্যাদার প্রশ্ন। ছেলের অবস্থান অজানা থাকায় পরিবারের উদ্বেগের মধ্যে মাকে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
এখন প্রয়োজন দীপালি রানীর অবস্থান নিশ্চিত করা, তিনি নিরাপদে আছেন কি না তা যাচাই করা এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত। অগ্রিম টাকা নিয়ে কোনো বিরোধ থাকলে তার আইনসম্মত সমাধান হতে পারে। কিন্তু সেই বিরোধের দায়ে একজন নারীকে জোর করে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ যেন উপেক্ষিত না থাকে—এটাই স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের কাছে ভুক্তভোগী পরিবারের প্রত্যাশা।
