কাঁটাতারের বেড়া দুই দেশকে আলাদা করে রেখেছে। কিন্তু আত্মীয়তার বন্ধন, নাড়ির টান আর বাঙালির চিরচেনা ভালোবাসায় সেই বিভাজন যেন ম্লান হয়ে গেছে। শারদীয় দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে দিনাজপুরের হিলি সীমান্তের শূন্যরেখায় জমে উঠেছে দুই বাংলার মানুষের মিলনমেলা। উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করতে সীমান্তের দুই পাশে ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা। কেউ এসেছেন স্বজনদের সঙ্গে দেখা করতে, কেউবা দূর থেকে প্রিয়জনকে একনজর দেখতে। আবার কেউ সীমান্তের শূন্যরেখায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলে ধরে রাখছেন স্মরণীয় মুহূর্ত।
শারদীয় দুর্গোৎসবকে ঘিরে গত সোমবার থেকে গতকাল বুধবার পর্যন্ত হিলি সীমান্ত এলাকায় বিরাজ করেছে উৎসবমুখর পরিবেশ। আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতজনদের সঙ্গে পূজার আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে সীমান্তের দুই পাশে মানুষের উপস্থিতি বেড়েছে। কাঁটাতারের বেড়া আর সীমান্তের কঠোর নিয়মের কারণে চাইলেই এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবু প্রিয়জনের প্রতি টান আর উৎসবের আনন্দে সীমান্ত এলাকায় ছুটে আসছেন অনেকে।
প্রতিবছর দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে হিলি সীমান্তের এই এলাকায় তৈরি হয় এক আবেগঘন পরিবেশ। দুই দেশের মানুষের মধ্যে ভাষা, সংস্কৃতি, আত্মীয়তা ও ঐতিহ্যের যে নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে, এই মিলনমেলা যেন তারই প্রতিচ্ছবি। ভৌগোলিক সীমারেখা আলাদা করলেও মানুষের হৃদয়ের সম্পর্ক যে অটুট, সীমান্তের এই দৃশ্য তা আবারও মনে করিয়ে দেয়।
দর্শনার্থীদের কেউ কেউ বৈধ পাসপোর্ট ও প্রয়োজনীয় ভ্রমণ-অনুমতি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে যাতায়াত করে স্বজনদের সঙ্গে পূজার আনন্দ ভাগাভাগি করছেন। আবার অনেকেরই রয়েছে প্রিয়জনের সঙ্গে দেখা করার প্রবল ইচ্ছা। কিন্তু প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকায় কিংবা বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে সীমান্ত পার হতে না পেরে তাদের ফিরতে হচ্ছে আক্ষেপ নিয়ে। দূর থেকে স্বজনদের দেখা, কথা বলা কিংবা হাত নেড়ে শুভেচ্ছা বিনিময়ের মধ্যেই খুঁজে নিচ্ছেন উৎসবের আনন্দ।
সীমান্ত পার হতে না পারলেও শূন্যরেখায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন অনেক দর্শনার্থী। কেউ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে, কেউ বন্ধু কিংবা স্বজনদের নিয়ে ক্যামেরাবন্দি করছেন মুহূর্তগুলো। কাঁটাতারের বেড়াকে পেছনে রেখে তোলা এসব ছবি তাদের কাছে হয়ে উঠছে দুর্গোৎসবের বিশেষ স্মৃতি। উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি স্বজনদের সঙ্গে দেখা করতে না পারার বেদনা ও আক্ষেপও ফুটে উঠছে তাদের কথায়। দুই বাংলার মানুষের এই মিলনমেলায় যেমন রয়েছে আনন্দ-উচ্ছ্বাস, তেমনি রয়েছে বিচ্ছেদের কষ্ট। দীর্ঘদিন পর প্রিয়জনকে দেখতে পাওয়ার আনন্দ যেমন কারও চোখেমুখে, তেমনি সীমান্তের ওপারে থাকা স্বজনের কাছে যেতে না পারার হতাশাও কারও কারও মনে। তারপরও দুর্গোৎসবের আবহে হিলি সীমান্ত হয়ে উঠেছে মানুষের ভালোবাসা, আবেগ আর আত্মীয়তার এক অনন্য মিলনস্থল।
হিলি ইমিগ্রেশন চেকপোস্টের ওসি মো. জাকারিয়া বলেন, পূজা শুরু থেকেই হিলি সীমান্ত দিয়ে পাসপোর্ট যাত্রী পারাপার বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া অনেকেই আসছে সীমান্তে ভারতীয় আত্মীয়দের দেখতে, কথা বলতে।
সব মিলিয়ে শারদীয় দুর্গোৎসবকে ঘিরে হিলি সীমান্তের শূন্যরেখায় তৈরি হয়েছে এক আবেগঘন দৃশ্য। দুই দেশের মাঝে কাঁটাতারের বেড়া থাকলেও ভাষা, সংস্কৃতি ও আত্মীয়তার বন্ধন যে মানুষের হৃদয়ে গভীরভাবে গেথে আছে, সীমান্তের এই মিলনমেলা যেন তারই এক জীবন্ত উদাহরণ।
