মানবজীবনের সবচেয়ে প্রাণবন্ত, উদ্যমী ও সম্ভাবনাময় অধ্যায় হলো যৌবনকাল। শক্তি, আবেগ ও সৃজনশীলতার এই অগ্নিস্ফুলিঙ্গকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে পারলে তা যেমন এক অসামান্য বিপ্লব ঘটাতে পারে, তেমনি ভুল পথে পরিচালিত হলে তা জাতির অপূরণীয় ক্ষতি ডেকে আনে। আর তাই তরুণ সমাজকে সঠিক পথের দিশা দিতে প্রয়োজন একজন শ্রেষ্ঠ পথপ্রদর্শকের। আমাদের প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর গোটা জীবনচরিত যুবকদের জন্য আত্মগঠন, চরিত্র বিকাশ এবং সততার সঙ্গে সমাজ গড়ার অনন্য আলোকবর্তিকা। তিনি তরুণদের কেবল ভবিষ্যতের আশাই মনে করেননি, বরং তাদের মেধা ও যোগ্যতার ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে অর্পণ করেছিলেন রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সব দায়িত্ব।
১. ইসলাম ও আল-কুরআনে যুবকদের বিশেষ স্বীকৃতি
ইসলাম চিরকালই যুবসমাজকে শক্তির প্রধান উৎস হিসেবে দেখে এসেছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা সেইসব তরুণদের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন, যারা বাতিল ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে ইমানের ঝাণ্ডা সমুন্নত রেখেছিলেন। আসহাবে কাহফের যুবকদের ইমানি দৃঢ়তার প্রশংসা করে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
إِنَّهُمْ فِتْيَةٌ آمَنُوا بِرَبِّهِمْ وَزِدْنَاهُمْ هُدًى
‘তারা ছিল কয়েকজন যুবক, তারা তাদের রবের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছিল এবং আমি তাদের হেদায়েত ও সৎপথে চলার শক্তি আরও বৃদ্ধি করে দিয়েছিলাম।’ (সুরা আল-কাহফ: আয়াত ১৩)
একইভাবে মূর্তিপূজা ও বাতেলের প্রাচীর গুঁড়িয়ে দেওয়া হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর সাহসিকতার চিত্র তুলে ধরে আল্লাহ তাআলা বলেন—
قَالُوا سَمِعْنَا فَتًى يَذْكُرُهُمْ يُقَالُ لَهُ إِبْرَاهِيمُ
‘তাদের কেউ কেউ বলল, আমরা শুনেছি এক যুবক এই মূর্তিগুলোর সমালোচনা করে। তাকে বলা হয় ইবরাহিম।’ (সুরা আল-আম্বিয়া: আয়াত ৬০)
২. হাদিসে যৌবনের গুরুত্ব ও প্রতিদান
কিয়ামতের কঠিন ময়দানে যেখানে সূর্য মাথার খুব কাছে চলে আসবে, সেদিন যে সাত শ্রেণির মানুষ আল্লাহর আরশের শীতল ছায়া লাভ করবে, তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন ইবাদতগুজার যুবক। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন—
سَبْعَةٌ يُظِلُّهُمُ اللَّهُ فِي ظِلِّهِ يَوْمَ لاَ ظِلَّ إِلاَّ ظِلُّهُ: ... وَشَابٌّ نَشَأَ فِي عِبَادَةِ رَبِّهِ
‘সাত শ্রেণির মানুষকে আল্লাহ তাআলা তার (আরশের) ছায়ায় আশ্রয় দেবেন, যেদিন তার ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবে না। (তাদের অন্যতম হলো) সেই যুবক, যে তার রবের ইবাদতের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছে।’ (বুখারি ৬৬০, মুসলিম ১০৩১)
যৌবনের এই বহু মূল্যবান সময়কে হেলায় না হারিয়ে কাজে লাগানোর তাগিদ দিয়ে নবীজি (সা.) অপর এক হাদিসে যুবকদেরকে এভাবে হুঁশিয়ার করেছেন—
اغْتَنِمْ خَمْسًا قَبْلَ خَمْسٍ: ... وَشَبَابَكَ قَبْلَ هَرَمِكَ
‘পাঁচটি বিষয়কে পাঁচটি বিষয় আসার আগেই গণিমত (মূল্যবান সম্পদ) মনে করো। (তার মধ্যে একটি হলো) তোমার বার্ধক্য আসার আগে তোমার যৌবনকে।’ (আল-মুস্তাদরাক লিল-হাকিম ৭৮৪৬)
৩. তরুণদের বাস্তব দায়িত্ব প্রদান
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তরুণদের প্রতি তার ভালোবাসা ও মূল্যায়ন শুধু মুখের কথায় বা উপদেশের সারমর্মে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি বড় বড় সিদ্ধান্ত ও সামরিক অভিযানে প্রবীণদের উপস্থিতিতেও দক্ষ তরুণদের নেতৃত্বের আসনে বসিয়েছেন। তার কিছু দৃষ্টান্ত হলো—
- হজরত উসামা ইবনে জায়েদ (রা.): রোমান পরাশক্তির বিরুদ্ধে প্রেরিত সেনাদলের সেনাপতি হিসেবে মাত্র ১৮ বছর বয়সী তরুণ উসামা (রা.)-কে মনোনীত করেন নবীজি (সা.)। আর সেই সেনাদলে সাধারণ সিপাহি হিসেবে ছিলেন হজরত আবু বকর (রা.) ও হজরত উমর (রা.)-এর মতো প্রবীণ ও বয়োজ্যেষ্ঠ সাহাবিরা।
- হজরত মুসআব ইবনে উমাইর (রা.): মদিনায় প্রথম দাওয়াতি মিশন পাঠাতে মাত্র ২০-২২ বছর বয়সী তরুণ মুসআব (রা.)-কে নির্বাচন করেন রাসুলুল্লাহ (সা.)। তারই প্রজ্ঞা ও মেধার বরকতে মদিনার ঘরে ঘরে ইসলামের আলো পৌঁছে যায় এবং প্রথম ইসলামি রাষ্ট্রের ঐতিহাসিক ভিত্তি স্থাপিত হয়।
- হজরত মুআজ ইবনে জাবাল (রা.): মাত্র ২৭ বছর বয়সে বিচারিক গভীরতা ও ফিকহি যোগ্যতার ওপর আস্থা রেখে নবীজি তাকে ইয়েমেনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশের গভর্নর ও বিচারক করে পাঠান।
- হজরত জায়েদ ইবনে সাবিত (রা.): কূটনীতি ও ভিনদেশি ভাষায় যোগাযোগের তাগিদে মাত্র ২০-২১ বছর বয়সে তাকে মাত্র দুই সপ্তাহে হিব্রু ভাষা শেখার দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরবর্তীতে এই তরুণ সাহাবির কাঁধেই অর্পিত হয়েছিল পবিত্র কুরআন সংকলন ও সংরক্ষণের ঐতিহাসিক দায়িত্ব।
৪. আধুনিক সমাজে এই শিক্ষার প্রাসঙ্গিকতা
রাসুলুল্লাহ (সা.) বিশ্বকে দেখিয়েছেন যে, বয়স কখনো নেতৃত্ব ও বড় দায়িত্ব পালনের প্রধান শর্ত হতে পারে না; বরং আসল যোগ্যতা হলো নিষ্ঠা, মেধা, সততা ও খোদাভীতি। আজকের আধুনিক সমাজেও তরুণদের কেবল ‘আগামী দিনের ভবিষ্যৎ’ হিসেবে বসিয়ে না রেখে, দেশের নীতিনির্ধারণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, বিচার ও নেতৃত্ব বিকাশে তাদের সম্পৃক্ত করা অত্যন্ত জরুরি। এতে করে তরুণরা বিভ্রান্তির পথ ছেড়ে সামাজিক অবক্ষয় ও বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধে এক ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারবে।
যুব সমাজ যেকোনো জাতির চালিকাশক্তি ও প্রাণস্পন্দন। নবীজি (সা.) তরুণদের সম্ভাবনাকে চিনতে পেরেছিলেন এবং পরম স্নেহে তাদের যোগ্যতাকে উম্মাহর কল্যাণে কাজে লাগিয়েছিলেন। আজকের দিনেও যদি আমরা আমাদের যুবসমাজকে কুরআন-সুন্নাহর সঠিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে নববি আদর্শে গড়ে তুলতে পারি এবং তাদের ওপর আস্থা রেখে উপযুক্ত দায়িত্ব অর্পণ করি, তবে সমাজ থেকে সকল অন্যায়-অনাচার দূর হয়ে এক ইনসাফভিত্তিক ও সুন্দর পৃথিবীর সূচনা হবে। মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের তরুণদেরকে নববি শিক্ষায় আলোকিত হয়ে সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখার তৌফিক দান করুন। আমিন।