• বাংলাদেশের মোট রপ্তানির ৬১ শতাংশ যায় ইইউতে।
• উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও দাম কমানোর চাপ ইইউ ক্রেতাদের।
• ইইউ থেকে আট মাসে আয় কমেছে ১১.৬৭ শতাংশ।
• রপ্তানির পরিমাণ কমেছে ৪.৫৮ শতাংশ।
মাহফুজুল ইসলাম, ঢাকা

দেশে তৈরি পোশাক রপ্তানি আয়ের সবচেয়ে বড় গন্তব্য হলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দেশগুলো। মোট রপ্তানির ৬১ শতাংশই যায় এই বাজারে। তবে দীর্ঘদিনের এই ধারাবাহিকতায় এবার ছেদ পড়তে শুরু করেছে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি থেকে আয় এসেছে মাত্র ১ হাজার ১৯৩ কোটি ইউরো, যা ২০২৫ সালের একই সময়ে ছিল ১ হাজার ৩৫০ কোটি ইউরো। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি আয় কমেছে ১৫৮ কোটি ইউরো। কমার হার ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের তথ্য বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েস (বিএভি) এমন তথ্য সামনে এনেছে।
এদিকে রপ্তানি আয়ের নিম্নমুখী ধারা কাটিয়ে ওঠার আগেই নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে ইউরোপের অস্থির পরিস্থিতি। বাংলাদেশের বড় ক্রেতা দেশ ফ্রান্স, ইতালিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে হঠাৎ শুরু হওয়া বিক্ষোভ, ভাঙচুর ও লুটপাটের মতো ঘটনা এবং উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতি পোশাক রপ্তানিতে নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। এ নিয়ে শঙ্কিত বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিকারকেরা। তাঁদের আশঙ্কা, দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি না হলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি কমতে পারে। এতে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি পোশাকের নতুন চাহিদাও ব্যাহত হতে পারে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির আশঙ্কা। দেশে কারখানাগুলোয় দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি প্রাপ্তির অনিশ্চয়তার মধ্যে ব্যবহারের উচ্চমূল্য গুনতে হচ্ছে, আবার ফ্যাব্রিকসের সুতা সংগ্রহে সরকারের সাম্প্রতিক বিধিনিষেধের কারণেও খরচ আরও উসকে দিচ্ছে। ফলে একদিকে ইউরোপের বাজারে চাহিদা কমার আশঙ্কা, অন্যদিকে দেশে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির চাপ—দুই দিক থেকেই চাপে পড়ছেন রপ্তানিকারকেরা।
ইউরোস্ট্যাটের তথ্য বলছে, ইইউতে বাংলাদেশের শুধু মোট রপ্তানি আয়ই কমেনি, পাশাপাশি পোশাকের একক মূল্য কমেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্টে প্রতি কেজি পোশাকের গড় মূল্য ছিল ১৪ দশমিক ৮৭ ইউরো। চলতি বছরের একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ৭৬ ইউরো। এতে প্রতি কেজিতে গড় মূল্য কমেছে ৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ। অন্যদিকে এ সময়ে রপ্তানির পরিমাণ কমেছে ৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের (বিএভি) প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মহিউদ্দিন রুবেল জানান, উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও ইউরোপীয় ক্রেতারা পোশাকের বাড়তি দাম দিতে রাজি নন; বরং তাঁরা আরও কম দামে পোশাক সরবরাহের চাপ দিচ্ছেন। এতে রপ্তানিকারকদের ব্যবসায়িক চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) দেশগুলো ৬ হাজার ২৯ কোটি ইউরোর পোশাক আমদানি করেছে, যা ২০২৫ সালের একই সময়ে ছিল ৬ হাজার ২৬৯ কোটি ইউরো। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে ইইউতে পোশাক আমদানি কমেছে ৩ দশমিক ৮৩ শতাংশ। একই সময়ে প্রতি কেজি পোশাকের গড় আমদানি মূল্যও কমেছে। গত বছর প্রতি কেজি পোশাকের গড় আমদানি মূল্য ছিল ১৯ দশমিক ৯১ ইউরো, যা চলতি বছরের প্রথম আট মাসে কমে দাঁড়িয়েছে ১৯ দশমিক ৬৫ ইউরোতে। অর্থাৎ প্রতি কেজি পোশাকের গড় আমদানি মূল্য কমেছে ১ দশমিক ২৯ শতাংশ।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে চীনের অবস্থান তুলনামূলক ভালো। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে দেশটির পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ২ দশমিক ৩৮ শতাংশ। রপ্তানি মূল্য দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯৭১ কোটি ইউরো। একই সময়ে চীনের রপ্তানির পরিমাণ বেড়েছে ৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ। তবে প্রতি কেজি পোশাকের গড় মূল্য কমেছে ১ দশমিক ০৪ শতাংশ।
ভিয়েতনামের পোশাক রপ্তানিও বেড়েছে ৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ। দেশটির রপ্তানি মূল্য দাঁড়িয়েছে ৩০০ কোটি ইউরো। তবে তাদের রপ্তানির পরিমাণ কমেছে ৫ দশমিক ১৩ শতাংশ। এ ক্ষেত্রে প্রতি কেজি পোশাকের গড় মূল্য বেড়েছে ১০ দশমিক ১১ শতাংশ। অর্থাৎ রপ্তানির পরিমাণ কমলেও তুলনামূলক বেশি দামে পোশাক বিক্রি করায় দেশটির রপ্তানি আয় বেড়েছে।
অন্যদিকে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের অন্যান্য প্রতিযোগী দেশের রপ্তানিও কমেছে। এ সময়ে তুরস্কের পোশাক রপ্তানি কমেছে ১১ দশমিক ০২ শতাংশ, ভারতের ১০ দশমিক ৮৪, শ্রীলঙ্কার ১১ দশমিক ১২, ইন্দোনেশিয়ার ১১ দশমিক ০৩, পাকিস্তানের ৯ দশমিক ৬৩, মরক্কোর ৬ দশমিক ১০ এবং কম্বোডিয়ার ৪ দশমিক ৫১ শতাংশ।
তবে এসব দেশের রপ্তানিতে পরিমাণ ও দামের প্রভাব এক রকম নয়। পাকিস্তানের পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ৩ দশমিক ৮২ শতাংশ বাড়লেও প্রতি কেজির গড় মূল্য কমেছে ১২ দশমিক ৯৬ শতাংশ। বিপরীতে কম্বোডিয়ার রপ্তানির পরিমাণ কমেছে ১১ দশমিক ৬৩ শতাংশ, কিন্তু প্রতি কেজি পোশাকের গড় মূল্য বেড়েছে ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ।

