১৫৮ বছরের পুরোনো টাটা গ্রুপে কর্মীসংখ্যা ১০ লাখের বেশি, বার্ষিক আয় প্রায় ১৮০ বিলিয়ন ডলার। ভারতের অন্যতম বৃহৎ এই শিল্পগোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এখন তীব্র ক্ষমতার লড়াই চলছে। এ দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে সামনে এসেছে ভারতীয় পুঁজিবাদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে একটি মৌলিক প্রশ্ন—দেশের বৃহৎ করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তৃত্ব কার হাতে থাকবে? মালিকপক্ষ, পেশাদার ব্যবস্থাপক, নাকি সরকার?
টাটা গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধে একদিকে রয়েছে পরিবার পরিচালিত দাতব্য ট্রাস্টগুলো, যেগুলোর হাতে গোষ্ঠীটির হোল্ডিং কোম্পানি টাটা সন্সের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মালিকানা। অন্যদিকে রয়েছেন গ্রুপটির ব্যবসা পরিচালনার দায়িত্বে থাকা শক্তিশালী চেয়ারম্যান এন. চন্দ্রশেখরন। এর মধ্যে ভারত সরকারও গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ হয়ে উঠেছে। সরকার টাটা সন্সকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এমন পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে কোম্পানিটির মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আসতে পারে, দুর্বল হতে পারে প্রতিষ্ঠাতা পরিবারের প্রভাব। খবর দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের।
বিজ্ঞাপন
প্রতিবেদন অনুযায়ী, অন্তত এক বছর ধরে টাটা গ্রুপের অভ্যন্তরে এ বিরোধ দানা বাঁধছিল। গত আগস্টে তা প্রকাশ্যে আসে, যখন ভারতের অন্যতম সফল করপোরেট নির্বাহী চন্দ্রশেখরন ঘোষণা দেন, তিনি চেয়ারম্যান হিসেবে আরেকটি পাঁচ বছর মেয়াদি দায়িত্ব নিতে চান না। তিনি জানান, আগামী ফেব্রুয়ারির পরও তার দায়িত্বে থাকা নিয়ে বোর্ডের একজন সদস্য আপত্তি জানিয়েছেন।
সে সময় এক চিঠিতে চন্দ্রশেখরন সতর্ক করে বলেন, গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কৌশলগত প্রকল্প যখন বাস্তবায়নের সংকটময় পর্যায়ে, তখন নেতৃত্ব নিয়ে ‘সর্বসম্মত সমর্থনের অভাব’ কোম্পানির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। কর্মী, বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়িক অংশীদারসহ সংশ্লিষ্ট সবার স্বার্থে নেতৃত্বের বিষয়ে স্পষ্টতা থাকা জরুরি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তবে এক মাসের ব্যবধানে অবস্থান বদলান চন্দ্রশেখরন। গত ১৭ সেপ্টেম্বরের এক সভায় পরিচালনা পর্ষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য তাকে পুনর্নিয়োগের পক্ষে ভোট দেন। এর বিরোধিতা করেন টাটা ট্রাস্টের প্রধান ও টাটা সন্সের বোর্ড সদস্য নোয়েল টাটা। টাটা সন্সের প্রায় ৬৬ শতাংশ শেয়ারের মালিক এই দাতব্য ট্রাস্টগুলোর নেতৃত্বে থাকা নোয়েল দাবি করেন, তার ভেটো দেওয়ার অধিকার উপেক্ষা করা হয়েছে। তিনি পুনর্নিয়োগের ভোটকে ‘অবৈধ’ বলেও অভিহিত করেন।
সেদিনই নোয়েল লেখেন, চন্দ্রশেখরন স্বেচ্ছায় পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এখন নতুন অধ্যায় শুরুর সময় এসেছে। এরপর থেকে নোয়েলের কার্যালয়-সংশ্লিষ্ট পক্ষ ভোটের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে একাধিক আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টাটা গ্রুপের এই বিরোধের প্রভাব ভারতের বৃহত্তর ব্যবসায়িক অঙ্গনেও পড়তে পারে। দেশটির অনেক বড় কোম্পানির দৈনন্দিন কার্যক্রম পেশাদার ব্যবস্থাপকেরা পরিচালনা করলেও চূড়ান্ত মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ থাকে প্রতিষ্ঠাতা পরিবারগুলোর হাতে। ফলে টাটার বিরোধটি শুধু একটি শিল্পগোষ্ঠীর নেতৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব নয়; বরং পারিবারিক মালিকানা ও পেশাদার ব্যবস্থাপনার ক্ষমতার সীমা নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলেছে।
মুম্বাইভিত্তিক ইনস্টিটিউশনাল ইনভেস্টর অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেসের প্রতিষ্ঠাতা অমিত ট্যান্ডনের ভাষ্য, ভারতে কোনো নিয়ন্ত্রণকারী শেয়ারহোল্ডারের বিরুদ্ধে পরিচালনা পর্ষদের এমন বিদ্রোহের নজির তার জানা নেই। দেশটির বৃহত্তম কোম্পানিগুলোর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পারিবারিক মালিকানাধীন। তার মতে, এই বিরোধ ব্যবসায়ী পরিবারগুলোর জন্য সতর্কবার্তা—শুধু মালিকানা থাকলেই কোম্পানির ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত হয় না।
ভারতের ব্যবসায়ী পরিবারগুলোর আশঙ্কা, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তৃত্ব একসময় তাদের নিয়োগ দেওয়া পেশাদার ব্যবস্থাপকদের হাতে চলে যেতে পারে। অন্যদিকে চন্দ্রশেখরনের সমর্থকদের যুক্তি, টাটা গ্রুপ ভারতের অর্থনীতি ও জনজীবনের সঙ্গে এত গভীরভাবে যুক্ত যে, এর ভবিষ্যৎ কেবল পুরোনো মালিকানা কাঠামো কিংবা প্রতিষ্ঠাতা পরিবারের ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না।
টাটা সন্সের মালিকানাধীন সাতটি দাতব্য সংস্থার ট্রাস্টি এবং ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব বিজয় সিং মালিকানা ও ব্যবস্থাপনার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্যের কথা তুলে ধরেছেন। তার বক্তব্য, ট্রাস্টিরা কোম্পানির মালিক হতে পারেন, কিন্তু সে কারণে কোম্পানি পরিচালনার অধিকার তাদের হাতে থাকা উচিত নয়। দাতব্য কার্যক্রম ও ব্যবসায়িক ব্যবস্থাপনাকে আলাদা রাখার কথা ছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
টাটা গ্রুপের গুরুত্ব বুঝতে হলে ভারতের দৈনন্দিন জীবনে এর বিস্তৃতি বিবেচনায় নেওয়াই যথেষ্ট। বিমান পরিবহন, হোটেল, ট্যাক্সি, রিয়েল এস্টেট, জীবনবিমা, চা, ঘড়ি ও গয়নাসহ নানা খাতে রয়েছে গোষ্ঠীটির ব্যবসা। ভারতের আইফোন উৎপাদন ও সংযোজন কার্যক্রমেও টাটার ভূমিকা রয়েছে। ফলে টাটার সিদ্ধান্তের প্রভাব শুধু বিনিয়োগকারী বা ব্যবসায়িক মহলে সীমাবদ্ধ নয়; তা দেশটির বিপুলসংখ্যক কর্মী, ভোক্তা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ওপরও পড়তে পারে।
ব্যবসার পাশাপাশি জনহিতকর কার্যক্রমের জন্যও টাটা গ্রুপ ভারতের মানুষের আস্থা অর্জন করেছে। টাটা ট্রাস্ট ক্যানসার চিকিৎসা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, পুষ্টি কর্মসূচি ও শিল্পকলার বিকাশে সহায়তা দেয়। এসব উদ্যোগের কয়েকটির শিকড় ভারতের স্বাধীনতারও আগের সময়ে। বর্তমানে ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য ও দাতব্য ট্রাস্ট—টাটা গ্রুপের এই দুই গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভই যেন মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে।
মুম্বাইয়ের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার থেকে প্রতিষ্ঠাতা জামশেদজি টাটার বংশধর নোয়েল টাটা ট্রাস্টগুলোর কার্যক্রম পরিচালনা করেন। ট্রাস্টগুলো টাটা সন্সের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের মালিক। টাটা সন্স আবার শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত একাধিক টাটা কোম্পানির বড় অংশের শেয়ার ধারণ করে। পাশাপাশি গ্রুপটির বেসরকারি ব্যবসা, রিয়েল এস্টেট সম্পদ ও সামগ্রিক ব্র্যান্ড পরিচালনার ক্ষেত্রেও এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
অন্যদিকে, সেখান থেকে প্রায় দেড় মাইল দূরে অবস্থিত ‘বোম্বে হাউস’ থেকে টাটা গ্রুপের ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করেন চন্দ্রশেখরন ও তার ব্যবস্থাপনা দল। ১৯২৪ সালে নির্মিত এই সদর দপ্তর ২০১৭ সালে চন্দ্রশেখরন দায়িত্ব নেওয়ার পর সংস্কার করা হয়। ভবনটির চতুর্থ তলার বোর্ডরুমে তার সহযোগীরা এমন এক পরিস্থিতির মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিচ্ছেন, যেটিকে তারা নোয়েল টাটার ‘অযাচিত হস্তক্ষেপ’ হিসেবে দেখছেন।
টাটা গ্রুপের ইতিহাস ঊনবিংশ শতাব্দীতে বিস্তৃত হলেও বর্তমান বিরোধের তাৎপর্য শুধু ঐতিহ্যবাহী একটি শিল্পগোষ্ঠীর নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। এর কেন্দ্রে রয়েছে টাটা সন্সকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগ। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে মালিকানা, জবাবদিহি ও নিয়ন্ত্রণের ভারসাম্যে পরিবর্তন আসতে পারে। ফলে পরিচালনা পর্ষদের বিরোধ ক্রমেই বৃহত্তর মালিকানা ও কর্তৃত্বের লড়াইয়ে রূপ নিচ্ছে—যার পরিণতি ভারতের করপোরেট জগতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
