জুন মাসে জন্ম নেওয়া তৌফিক ইমরোজ খালিদী ওরফে টিআইকে রাশিতে প্রবল বিশ্বাসী ছিলেন কিনা জানি না; তবে মানুষের রাশি জানতে চাইতেন আগ্রহ নিয়ে। কারও জন্ম জুনে জানলে তিনি উচ্ছ্বসিতও হতেন। ধারণা করি, কাউকে আপাদমস্তক বিশ্লেষণ করতে রাশির বৈশিষ্ট্য কাজে লাগাতেন তিনি। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে সাপ্তাহিক রাশিফল ছাপা হয়। টিআইকে মারা গেলেন ২ অক্টোবর। সেদিন পর্যন্ত সাপ্তাহিক রাশি পড়ে দেখলাম; তাতে যত সব ভালো ভালো কথা লেখা, কোনো দুর্ঘটনার আঁচ নেই। টিআইকে কি জীবনের অন্তিম সময়ে পৌঁছানোর আগে রাশি পড়েছিলেন?
টিআইকের হঠাৎ প্রস্থানে বিডিনিউজের কী হবে ভেবে ধাক্কা খেয়েছেন অনেকে। তার মৃত্যুসংবাদে চমকে উঠেছিলাম আরও একটি কারণে। যারা তাকে কর্মক্ষেত্রে দেখেছেন, তার কথা শুনেছেন, তারা বুঝতে পারবেন টিআইকের জীবনযাপনে ভালো রান্না, ভালো খাবার ও পরিমিত আহারের চর্চা ছিল। কিছু অসুস্থতা থাকলেও চিকিৎসকের সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। সেই মানুষের দুম করে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হবে এবং উন্নত দেশে থেকেও তিনি কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মারা যাবেন—এসব ভাবলে এক ধরনের হতাশা ঘিরে ধরে।
টিআইকে মারা গেলেন মাত্র ৫৯ বছর বয়সে। বাংলাদেশে মানুষের গড় আয়ু ৭২ বছর। টিআইকে আরও এক যুগ বাঁচতে পারতেন। এ বছর শান্তিতে নোবেল পেলেন নাভি পিল্লাই, ৮৫ বছর বয়সে। টিআইকে তাহলে আরও আড়াই দশক বাঁচতে পারতেন। এই এক যুগ অথবা আড়াই দশকে বাংলাদেশসহ বিশ্বে বড় ধরনের রাজনৈতিক বাঁক বদল হবে; এল নিনো আরও দানবীয় হবে; বিশ্বে শরণার্থীর সংখ্যা আরও কয়েক কোটি বাড়বে। এই কঠিন ও অস্থির সময়ে একজন টিআইকে নিশ্চিতভাবে সাংবাদিকতা ও সহকর্মীদের অভিভাবক হয়ে থাকতেন। সময়ের কাছে বহু বছর পাওনা রইল টিআইকের। অকালপ্রয়াণ একেই বলে!
২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের একদিন‘কেমন নগর চাই’ শীর্ষক নাগরিক সাংবাদিকদের আলোচনা সভার একপর্যায়ে খোলামেলা আড্ডায় যোগ দেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী।
আমার আইবিএম-কর্মজীবন শুরুর কিছু আগেই বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে নাগরিক সাংবাদিকতার পাতা দেখভালে যুক্ত হয়েছিলাম। তারপর দুটোই পাশাপাশি চলছিল। একসময় বাংলাদেশ থেকে কার্যক্রম গুটিয়ে নিল আইবিএম। ঠিক করলাম করপোরেটে আর নয়; সাংবাদিকতাতেই পুরো সময় দেব। ওই সময় দুজন ব্যক্তি আমাকে দ্বিতীয়বার ভেবে দেখতে বলেছিলেন। একজন গাজী নাসিরউদ্দিন আহমেদ খোকন, আরেকজন তৌফিক ইমরোজ খালিদী। কারণ একটাই—বেতন সমস্যা; যা আইবিএম জীবনে ভুগতে হয়নি। মাসের বেতন মাস পেরিয়েও না পাওয়া যেতে পারে—এ অভিজ্ঞতা আমার বিডিনিউজেই প্রথম হয়েছে। দেশের সাংবাদিকতায় অনেক ‘প্রথম’ ধারা যুক্ত করার পরও বিডিনিউজকে আর্থিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। কোনো সন্দেহ নেই এতে বিডিনিউজের বড় বড় সম্ভাবনা ধুঁকেছে। এই হোঁচট খাওয়া এড়ানো গেলে, আজকে বিডিনিউজ আরও বহু ‘প্রথম’ যুক্ত করত গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতায়।
প্রতিষ্ঠানমাত্রই তাতে পর্যাপ্ত আয় থাকতেই হবে। নীতি ঠিক রাখতে গিয়ে কোনো গণমাধ্যম কেন আর্থিক লোকসান গুনবে? এই উত্তর দেওয়ার পুরো দায় নিশ্চয়ই তৌফিক ইমরোজ খালিদী রাখেন না। তবে প্রত্যাশা ছিল, এর উত্তর তিনি কোনো অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উন্মোচিত করবেন। টিআইকের জীবনাধ্যায়ের ইতি টানার খবরে আক্ষেপ হলো, উত্তরটা আদৌ জানা হবে কি?
আদর্শিকভাবে টিআইকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ‘যদি-কিন্তু’ ছাড়াই থাকতেন। তার অবর্তমানে মুক্তিযুদ্ধ বিডিনিউজে কীভাবে জায়গা পাবে তা সময়ই বলে দেবে। এই ক্ষণে আমার মনে পড়ছে ২০১২ সালের ১ ডিসেম্বরের কথা। এর আগে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের নাগরিক সাংবাদিকরা মিলে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর নির্মাণে দুটো প্রতীকী ইট ক্রয়ের জন্য অনুদান একাট্টা করেছিল। ওই শীতের সকালে পুরোনো জাদুঘরের আঙিনায় দুটো ইটের ক্রয়মূল্য তুলে দেওয়া হয় জাদুঘরের ট্রাস্টি গবেষক মফিদুল হকের হাতে। এরপর ২০১৮ সালের ২৫ মার্চ জাদুঘর কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে স্মারক ইট গ্রহণ করে নাগরিক সাংবাদিকরা। সেই স্মারক ইট গর্বভরে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কার্যালয়ে রাখতে পেরেছে নাগরিক সাংবাদিকরা। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর নির্মাণে অংশী হতে পারা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের নাগরিক সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে একটি ধন্যবাদ টিআইকের জন্য সবসময়ই বরাদ্দ রাখা আছে।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সময় বিডিনিউজের প্রতিটি প্রতিবেদনের শিরোনাম স্পষ্ট হস্তাক্ষরে লেখা ছিল। বিচার প্রক্রিয়ার গতানুগতিক খবরের বাইরে বিডিনিউজের অনেক বিশেষ প্রতিবেদন যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে একেকটা দলিল। ফেইসবুক ও এআইয়ের প্রভাবে চটকদার শিরোনামের ভিড়ে গা ভাসিয়ে লাইক বাড়ানোর পথে কখনও এবং এখনও নামেনি বিডিনিউজ। দেশে সাংবাদিকতায় অনেক ‘প্রথম’ শুরু যে নিউজরুমে, সেখানে তৌফিক ইমরোজ খালিদীকে সদম্ভে বলতে শুনেছি—প্রয়োজনে খবর ‘আগে’ দেওয়ার দৌড়ে বিডিনিউজ দ্বিতীয় অথবা আরও পেছনে থাকবে, তবে যে খবরটা প্রকাশ হবে তা ৯৯.৯৯ পারসেন্ট নয়, ১০০ পারসেন্ট দিয়েই হবে। টানা বেতন না পাওয়ার দিনগুলোতেও এই নীতিতে এক চুল ছাড় দেয়নি প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মীও। ঈদের মাসে বেতন না পাওয়ার দুঃখ মনে থাকলেও তাতে ম্লান হয়নি খবরের মান।
‘ফাইট ইজ স্টিল অন...’ স্লোগান নিয়ে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের চতুর্দশ বর্ষপূর্তির ঘরোয়া আয়োজনে সহকর্মীদের সঙ্গে কেক কাটছেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী।
সাংবাদিকতা মানে শুধুই লেখার স্টাইল নয়, জীবনযাপনেও স্টাইল থাকা চাই। বুদ্ধিবৃত্তিক কাজে থাকা মানেই উসকোখুসকো জীবনযাপন নয়। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ঝাঁকড়া চুল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মোটা ফ্রেমের কালো চশমা, মাদার তেরেসার সাদা ও নীল পাড়ের শাড়ি, স্টিভ জবসের স্নিকার্স ও ব্লু জিন্স দিয়ে কালো টার্টলনেক ফুলস্লিভ টি-শার্ট, মহাত্মা গান্ধীর খাদি কাপড়ের ধুতি ও চাদর, নেলসন ম্যান্ডেলার মাদিবা শার্ট, সনজীদা খাতুনের কপালজুড়ে টিপ, ইন্দিরা গান্ধীর মাথায় সাদা চুলের রেখার সঙ্গে খাদি-তাঁতের শাড়ি—তাদের নিজ নিজ ব্যক্তিত্বকে স্বকীয় করেছে। টিআইকে মানে শুধু ধোপদুরস্ত পরিচ্ছদ নয়, তার পোশাকের নকশা ও রং নির্বাচনেরও বিশেষ স্টাইল আছে। বিডিনিউজের লাইফস্টাইল পাতাটি টিআইকের বসনভূষণ স্টাইল নিয়ে ফিচার করবে কিনা আমার জানা নেই। তবে হলপ করে বলা যায়, তার ক্ষুরধার ব্যক্তিত্বের পেছনে এই স্টাইলের ভূমিকা আছে। নেতৃত্ব দেওয়ার যে ব্যক্তিত্ব, তাতে পোশাকের প্রভাব নিয়ে নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের টিআইকে থেকে শেখার আছে।
বিডিনিউজের পাতা এখন একটি খোলা শোকবই। টিআইকের মৃত্যুসংবাদ জানাজানির পর দেশ-বিদেশে থাকা একেকজন শত শত শব্দে তাকে মনে করছেন নিকটবর্তী থেকে দূরবর্তী স্মৃতি হাতড়ে। তবে শোকে-সন্তাপের মাঝেও বিডিনিউজ থেমে নেই; নিয়মিত খবর উঠছে। কিন্তু সপ্তাহখানেক ধরে কোনো খবরের শিরোনাম নিয়ে কথা বলতে আসেননি টিআইকে। কোনো বিদেশি নামের বাংলা উচ্চারণ শুধরে দিচ্ছেন না তিনি আর। তার প্রতিষ্ঠানে তার সহকর্মীদের গাঢ় শোকের দিনে ‘অবিচুয়ারি’ লেখার কায়দাও আর শেখাতে আসছেন না তিনি। এরই নাম প্রয়াত হওয়া!
শুধু যে বিডিনিউজের পাতাতে শোকনামা এসেছে তাকে নিয়ে, তা নয়; আরও অনেক পত্রিকাতেও টিআইকে স্মরণে লেখা হয়েছে। অনলাইনে ২৪ ঘণ্টা পার হতে না হতেই সব তথ্য তলিয়ে যায়। বিডিনিউজ একসময় বিপিএল প্রকাশনা চালু করে বলেছিল—‘বুক ইজ ব্যাক’। টিআইকে স্মরণে সবখানে প্রকাশিত সমস্ত শোকনামা ও খবর এক মলাটে ছাপিয়ে রাখতে পারে বিডিনিউজ; এই অবিচুয়ারিই দেশে সাংবাদিকতা চর্চার পাঠ্য হয়ে থাকবে। টিআইকের সব ভিডিও নিয়ে তার স্মরণে একটি ডকুমেন্টারি করা সম্ভব। তার সমস্ত উদ্ধৃতি একাট্টা করে তারিখ অনুসারে সাজিয়ে প্রকাশ ও প্রদর্শন করা গেলে নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকরাও তার দীক্ষা পাবে। আর এভাবে টিআইকে আরও অনেক যুগ ফিরে ফিরে আসবেন সাংবাদিকতায়।
আইরিন সুলতানা: কবি ও কথাসাহিত্যিক; বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সাবেক কর্মী।
