বরিশালের বাবুগঞ্জে ল্যাপটপ ও বিশেষ ডিভাইস ব্যবহার করে রোগ নির্ণয়ের নামে দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে আলীমুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। চিকিৎসক পরিচয়ে রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার অভিযোগে অভিযান চালিয়ে তাকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে উপজেলা প্রশাসন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত না হওয়ার মুচলেকা নেওয়া হয়েছে।
রোববার (১৯ অক্টোবর) রাতে বাবুগঞ্জ উপজেলার কলেজ গেট এলাকার এনএমএস ফার্মেসিতে অভিযান চালিয়ে তাকে জরিমানা করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসমা উল হুসনা। অভিযানে উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।
আলীমুল ইসলাম বরিশালের উজিরপুর উপজেলার বাহেরঘাট এলাকার আব্দুল আলী হাওলাদারের ছেলে। অভিযোগ অনুযায়ী, ল্যাপটপ ও বিশেষ ডিভাইস ব্যবহার করে রোগ নির্ণয়ের কথা বলে রোগীদের চিকিৎসা দিতেন আলীমুল ইসলাম। শারীরিক নানা সমস্যার সমাধান খুঁজতে আসা রোগীরা দালালের মাধ্যমে তার সন্ধান পেতেন। পরে বাবুগঞ্জের কলেজ গেট এলাকার ফার্মেসিতে গিয়ে চিকিৎসা নিতেন তারা।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ডিভাইসে হাত রেখে রোগ নির্ণয়ের পদ্ধতিতে তাদের চিকিৎসা দেওয়া হতো। পরে তার চিকিৎসক পরিচয় ও শিক্ষাগত যোগ্যতার কাগজপত্র নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়। একপর্যায়ে কাগজপত্র ভুয়া বলে জানতে পারেন তারা। তার কাছ থেকে চিকিৎসা নিয়েও কোনো উপকার পাননি বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন রোগী। রোগীদের আরও অভিযোগ, চিকিৎসার পাশাপাশি ওষুধ কিনতে হতো ওই ফার্মেসি থেকেই। এভাবে চিকিৎসার নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হতো।
প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, আলীমুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে বরিশাল সদর, উজিরপুর ও বাবুগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় রোগী দেখতেন। বাবুগঞ্জের মাধবপাশা বাজার ও ডিগ্রি কলেজ গেট এলাকাতেও নিয়মিত রোগী দেখার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ব্যবস্থাপত্রে নিজের নামের আগে ‘ডা.’ লিখে চিকিৎসক পরিচয় দিতেন তিনি। সেখানে এমবিইএইচ (ভারত), ডিএমএফ (ঢাকা) এবং কলকাতার এনআরএস মেডিকেল কলেজে প্রশিক্ষণ নেওয়ার তথ্য উল্লেখ ছিল। পাশাপাশি মেডিসিন, চর্ম, যৌন ও অ্যালার্জি রোগের চিকিৎসায় অভিজ্ঞ বলেও দাবি করতেন। তবে অভিযানের সময় তার দেখানো কাগজপত্র যাচাই করে সেগুলো ভুয়া বলে শনাক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ।
অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ইউএনওর নেতৃত্বে উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের একটি দল এনএমএস ফার্মেসিতে অভিযান চালায়। এ সময় আলীমুল ইসলামের কাগজপত্র যাচাই করা হয়। বৈধ চিকিৎসাগত যোগ্যতার প্রমাণ দেখাতে না পারায় তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। অভিযানে থাকা উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের মেডিকেল অফিসার তূর্য অধিকারী বলেন, খবর পেয়ে তারা ইউএনওর সঙ্গে ঘটনাস্থলে যান এবং আলীমুল ইসলামের কাগজপত্র যাচাই করেন। তার দেখানো কাগজপত্র ভুয়া বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। চিকিৎসার নামে তিনি মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছিলেন।
অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া ইউএনও আসমা উল হুসনা বলেন, চিকিৎসক না হয়েও চিকিৎসক পরিচয়ে রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার অভিযোগে অভিযান চালানো হয়। আলীমুল ইসলাম ব্যবস্থাপত্রে নিজের নামের আগে চিকিৎসক পরিচয় ব্যবহার করলেও বৈধ যোগ্যতার কাগজপত্র দেখাতে পারেননি।
ইউএনওর ভাষ্য, আলীমুল ইসলাম প্রায় ১৫ বছর ধরে এভাবে প্রতারণা করে আসছেন বলে স্বীকার করেছেন। তাকে প্রথমবারের মতো ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। ভবিষ্যতে চিকিৎসাসংক্রান্ত কোনো কার্যক্রমে জড়িত না হওয়ার শর্তে তাকে কারাদণ্ড থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, চিকিৎসক পরিচয়ে প্রতারণার অভিযোগে জড়িত অন্য কেউ রয়েছেন কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফার্মেসির মালিকদের সহযোগিতার অভিযোগও রয়েছে; তবে এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
