বরিশালের মাঠজুড়ে এখন সবুজের সমারোহ। যতদূর চোখ যায়, ধানখেত। কোথাও আমনের চারা বেড়ে উঠেছে, কোথাও ধানগাছ শীষ ধরার অপেক্ষায়। উন্নত জাতের ধানের আবাদ বাড়ানো এবং আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার ভালো ফলনের আশা করছেন কৃষকরা। তাদের প্রত্যাশা, ফলন ভালো হলে উৎপাদন খরচ সামলে বাড়তি আয়ও করা সম্ভব হবে। তবে জ্বালানির দাম বাড়ায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তারা।
কৃষি কর্মকর্তারা জানান, বরিশাল জেলার ১০টি উপজেলা ও মহানগর এলাকায় এবার আমন ও আউশের আবাদ হয়েছে ব্যাপক জমিতে। বিশেষ করে উফশী জাতের ধান চাষে কৃষকদের আগ্রহ বেড়েছে। এ জাতের ধানে তুলনামূলক বেশি ফলন পাওয়া যায়। উৎপাদন খরচও অনেকটা কম হওয়ায় কৃষকরা উফশী জাতের ধানের দিকে ঝুঁকছেন।
তারা জানিয়েছেন, ফলন ভালো হয়েছে। তবে জ্বালানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় চাষের খরচ বেড়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে বরিশাল জেলায় উফশী জাতের আমন আবাদ হয়েছে ৬২ হাজার ১৮৭ হেক্টর জমিতে। স্থানীয় জাতের আমন আবাদ হয়েছে ৫৫ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে। সব মিলিয়ে আমনের আবাদ ও বীজতলা কার্যক্রমে অগ্রগতি হয়েছে ১ লাখ ১৭ হাজার ৭৮৭ হেক্টর জমিতে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রতি লিটার ডিজেল ১০২ টাকা, কেরোসিন ১১৪ টাকা, পেট্রোল ১১৮ টাকা এবং অকটেন ১২২ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। এবারে (সেপ্টেম্বর) দাম বাড়ানোয় ডিজেল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা ও অকটেন ১৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ৩৩ টাকা বা ৩২ দশমিক ৩৫ শতাংশ, কেরোসিন ৪১ টাকা বা ৩৫ দশমিক ৯৬ শতাংশ, পেট্রোল ৪২ টাকা বা ৩৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ ও অকটেন ৪৩ টাকা বা ৩৫ দশমিক ২৫ শতাংশ বেড়েছে।
বানারীপাড়ার দিদিহার গ্রামের কৃষক সান্টু সরদার বলেন, উফশী জাতের বীজের কারণে এবার আউশে ভালো ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে। শেষ পর্যন্ত কৃষি বিভাগের লোকজন পাশে থেকে ঠিকমতো পরামর্শ দিলে ফলন আরও ভালো হবে বলে আশা তার।এই কৃষক জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় চাষের খরচ বেড়ে যাবে বলে জানান।
শুধু আমন নয়, আউশের আবাদেও উফশী জাতের আধিপত্য দেখা যাচ্ছে। চলতি মৌসুমে জেলায় ৩ হাজার ১৭ হেক্টর জমিতে আউশের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে উফশী জাতের আউশ ২ হাজার ৫০৩ হেক্টর এবং স্থানীয় জাতের আউশ ৫১৪ হেক্টর জমিতে আবাদ করা হয়েছে।
আউশের আবাদে এগিয়ে রয়েছে মেহেন্দিগঞ্জ। সেখানে উফশী জাতের আউশ আবাদ হয়েছে ১ হাজার ১৫৫ হেক্টর জমিতে। হিজলায় ৫২৫ এবং বাকেরগঞ্জে ৫৮৮ হেক্টর জমিতে এ জাতের আউশ আবাদ হয়েছে। এ ছাড়া মুলাদী, গৌরনদী, আগৈলঝাড়া, সদর, বাবুগঞ্জ, উজিরপুর ও বানারীপাড়াতেও উফশী জাতের আউশ আবাদ হয়েছে।
চরমোনাই এলাকার কৃষক জব্বার হাওলাদার বলেন, উফশী জাতের ধানের ফলন বেশি হওয়ায় এবার গত বছরের তুলনায় বেশি জমিতে ধান চাষ করেছি। ফলন ভালো হলে কৃষকরা লাভবান হতে পারবেন। চাষের খরচ বেড়েছে। এমন সময়ে হঠাৎ করেই জ্বালানি খরচ বাড়ানো হয়েছে। এতে লাভ কমবে বলে জানান তিনি।
সাহেবেরহাট এলাকার কৃষক এনায়েত হোসেন বলেন, সময়মতো সার, বীজ ও সেচ সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব। শুধু ফলন বাড়লেই হবে না; উৎপাদন খরচ, বাজারদর ও কৃষি উপকরণের দামও সরকারের বিবেচনায় নিতে হবে। এই খরচের সঙ্গে যোগ হয়েছে হঠাৎ করে বাড়ানো জ্বালানির দাম। এসব কারণে ফলন ভালো হলেও আয় কমবে বলে জানান তিনি।
উজিরপুরের গুঠিয়া এলাকার কৃষক সোহাগ মোল্লার আশঙ্কা, সময়মতো সার ও বীজ না পাওয়া, সেচের খরচ বেড়ে যাওয়া কিংবা ধান কাটার মৌসুমে শ্রমিকের সংকট তৈরি হলে উৎপাদন ভালো হলেও লাভ কমে যেতে পারে। অতিবৃষ্টি, রোগবালাই কিংবা ঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগও ফলনের সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
উজিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কপিল বিশ্বাস বলেন, উফশী জাতের ধানে প্রতি হেক্টরে গড়ে আড়াই মেট্রিক টন পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়। স্থানীয় জাতের ধানে গড় ফলন প্রায় দেড় মেট্রিক টন। বেশি ফলনের কারণে কৃষকরা উফশী জাতের দিকে ঝুঁকছেন। এতে একই জমি থেকে বেশি ধান পাওয়ার পাশাপাশি উৎপাদন খরচ সামলে লাভের সুযোগও তৈরি হয়। তবে জ্বালানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক কৃষক দুশ্চিন্তায় বলে জানান তিনি।
বরিশাল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোসাম্মাৎ মরিয়ম বলেন, কৃষকদের উন্নত জাতের বীজ ব্যবহারে উৎসাহিত করা হচ্ছে। উফশী জাতের ধানের ফলন তুলনামূলক বেশি হওয়ায় কৃষকরা এ জাতের ধান চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
