সৌদি আরবের মক্কা নগরীর একটি মসজিদে ‘অনৈতিক’ কাজের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর দেশটির সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বিস্তারিত ব্যাখ্যা চেয়েছে বাংলাদেশ।
তবে দুই বাংলাদেশির শাস্তি কার্যকরের বিষয়ে তাঁদের পরিবার বা বাংলাদেশ দূতাবাসকে কোনো তথ্য না জানিয়ে সৌদি আরব ভিয়েনা কনভেনশন লঙ্ঘন করেছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশের কাছে ব্যাখ্যা দিতে সৌদি আরব আইনগতভাবে কতটা বাধ্য এবং ওই দুই বাংলাদেশির মরদেহ কীভাবে দেশে আনা হবে, কিংবা আদৌ আনা হবে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
জেদ্দায় বাংলাদেশ দূতাবাসের সূত্রগুলো জানিয়েছে, ওই দুই বাংলাদেশির আটক, বিচার ও শাস্তি কার্যকরের বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষ দূতাবাসকে কোনো তথ্য জানায়নি। সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে বিষয়টি জানার পর বাংলাদেশ ব্যাখ্যা চাইলেও সৌদি আরব তা দিতে আইনগতভাবে বাধ্য কি না, সেটি এখনো পরিষ্কার নয়।
সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলেন, কোনো নাগরিক বিদেশে এমন পরিস্থিতির মুখে পড়লে তিনি নিজ দেশের কনস্যুলার সুবিধা চাইতে পারেন। তিনি বলেন, ‘কিন্তু এ ক্ষেত্রে কি হয়েছে আমরা জানি না। বিচারটি সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ আইনি প্রক্রিয়াতে হওয়ায় বাংলাদেশকে জানাতে তাদের জন্য আইনি কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তবে বাংলাদেশ জানতে চাইলে তারা হয়তো জবাব দিতে পারে।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, দুই বাংলাদেশির পরিবার ও বাংলাদেশ দূতাবাসকে না জানিয়ে শাস্তি কার্যকর করার মাধ্যমে সৌদি আরব ভিয়েনা প্রটোকল লঙ্ঘন করেছে। সৌদি আরব ১৯৮১ সালে কূটনৈতিক সম্পর্কবিষয়ক ভিয়েনা কনভেনশনে স্বাক্ষর করে। এটি ভিয়েনা প্রটোকল নামেও পরিচিত।
ওই প্রটোকলের ৩৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, বিদেশি কোনো নাগরিককে আটক বা বন্দি করা হলে তাঁর অনুরোধে বিলম্ব না করে নিজ দেশের কনস্যুলার বিভাগ বা দূতাবাসকে জানাতে হবে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ ড. রায়হান রশীদ বলেন, প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে আপিল প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছিল। অর্থাৎ, বিষয়টি আকস্মিকভাবে ঘটেনি। তাঁর মতে, এ বিষয়ে বাংলাদেশ দূতাবাসের জানার কথা ছিল।
তিনি বলেন, ‘এটি বাংলাদেশ দূতাবাসের জানা উচিত ছিল। ভিকটিম বা সৌদি কর্তৃপক্ষ না জানালে দূতাবাস জানবে না এটি গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ প্রক্রিয়াটি একদিনে হয়নি। আবার ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী ওই দুজনকে বারবার নোটিফাই করার কথা যে তারা কনস্যুলার সুবিধা নেবেন কি-না। তারা না নিতে চাইল সৌদি কর্তৃপক্ষের দায় নেই।’
ঘটনা নিয়ে কী জানা যাচ্ছে
সৌদি প্রেস এজেন্সি দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে গত বুধবার দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর প্রকাশ করে। ওই খবরে বলা হয়, মক্কার একটি মসজিদে অনৈতিক ও অশালীন কাজে লিপ্ত থাকার অভিযোগে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী তাঁদের আটক করেছিল।
বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর বৃহস্পতিবার জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট থেকে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়ে ঘটনার বিস্তারিত জানাতে অনুরোধ করা হয়। বাংলাদেশ দূতাবাসের সূত্রগুলো বলছে, ওই দুই বাংলাদেশিকে আটক, তাঁদের বিচার এবং শাস্তি কার্যকরের বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষ কোনো তথ্য দেয়নি।
এমনকি ওই দুজন আদৌ বাংলাদেশের নাগরিক কি না, তা-ও দূতাবাসের মাধ্যমে যাচাই করেনি সৌদি কর্তৃপক্ষ। অথচ কোনো দেশের নাগরিক অন্য দেশে আটক বা বন্দি হলে ভিয়েনা প্রটোকল অনুযায়ী তাঁর দেশের দূতাবাসকে অবহিত করার কথা।
ব্র্যাকের অভিবাসন বিভাগের প্রধান শরীফুল হাসান বলেন, পুরো প্রক্রিয়ায় সৌদি আরব ভিয়েনা কনভেনশন লঙ্ঘন করেছে। ১৯৬১ সালে জাতিসংঘের উদ্যোগে বিভিন্ন দেশের অংশগ্রহণে কূটনীতিকদের আচরণসংক্রান্ত যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, সেটিই ভিয়েনা কনভেনশন অন ডিপ্লোম্যাটিক রিলেশনস নামে পরিচিত। বিভিন্ন দেশে অন্য রাষ্ট্রের কূটনৈতিক মিশন বা প্রতিনিধিদের অবস্থান ও কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে এই কনভেনশনে বিভিন্ন নিয়মনীতি নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিশ্বের ১৮০টিরও বেশি দেশ এই চুক্তি অনুসমর্থন করায় এটি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ও কনস্যুলার আইনের পাশাপাশি যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার অন্যতম মৌলিক ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
কনভেনশনের ৩৬ ধারায় বিদেশে আটক বা গ্রেফতার হওয়া নাগরিকের নিজ দেশের দূতাবাস বা কনস্যুলেটের সঙ্গে যোগাযোগ এবং আইনি সহায়তা পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। এর আওতায় কনস্যুলার কর্মকর্তারা আটক ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাৎ, কথা বলা ও যোগাযোগ করতে পারেন। পাশাপাশি ওই ব্যক্তি চাইলে তাঁর জন্য আইনি প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থাও করতে পারেন।
ড. রায়হান রশীদ জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ও সৌদি আরব উভয় দেশই ভিয়েনা কনভেনশনে স্বাক্ষর করেছে। ফলে বিদেশি নাগরিক আটক হলে এ-সংক্রান্ত বিধান মেনে চলার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তাঁর ভাষ্য, ‘আটক হওয়া ব্যক্তিদের কনস্যুলার সুবিধা নেওয়ার পর নোটিফাই করতে হবে এবং এটি করা হয়েছে কি-না তার প্রমাণ থাকতে হবে সৌদি আরবের কাছে।’
মূলত ভিয়েনা কনভেনশনের ৩৬ ধারা বিদেশে আটক নাগরিকদের কনস্যুলার ও আইনি অধিকার নিশ্চিত করে। অর্থাৎ, কোনো বিদেশি নাগরিককে আটক করা হলে তাঁর দেশের কনস্যুলার বিভাগকে জানাতে হয়। এরপর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ওই নাগরিকের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় আইনি সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে পারেন।
শরীফুল হাসান আরও বলেন, ‘কিন্তু এক্ষেত্রে কিছুই হয়নি। সৌদি আরব বাংলাদেশি নাগরিকদের সাথে আগেও এমন করেছে। আমার প্রশ্ন হলো, এই দুজন যদি আমেরিকার নাগরিক হতো তাহলে কি সৌদি আরব এটা করতে পারতো।’
সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবিরের মতে, কোনো দেশের নাগরিক অন্য দেশে অপরাধে জড়ালে সেই দেশের অভ্যন্তরীণ আইনি প্রক্রিয়ায় বিচার করার ক্ষেত্রে বাধা নেই। বিদেশি নাগরিকের বিচার বা শাস্তির বিষয়ে তাঁর দেশের দূতাবাসকে জানাতে সংশ্লিষ্ট দেশ আইনগতভাবে বাধ্য নয়।
তিনি বলেন, ‘তবে অনেক সময় অনেক দেশের কর্তৃপক্ষ বিদেশি নাগরিক আটক করলে তার দূতাবাসকে অবহিত করে। বা কোনো দেশ তার নাগরিক আটক হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট দেশ সেই তথ্য দিয়ে থাকে। কিন্তু আইনি কোনো বাধ্যবাধকতা এক্ষেত্রে নেই।’
মরদেহ আসবে কবে?
ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জেদ্দায় বাংলাদেশ মিশনের কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশির বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষ এখনো বাংলাদেশকে কোনো তথ্য দেয়নি। ফলে তাঁদের মরদেহ কোথায় রাখা হয়েছে, তা জানা যাচ্ছে না। একই কারণে মরদেহ কবে নাগাদ বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হবে, সে বিষয়েও নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই।
অন্যদিকে, বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে না জানানোর কারণে ওই দুই বাংলাদেশির পরিবারকেও দূতাবাসের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য দেওয়া বা যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে না। পরিবারের পক্ষ থেকে আবেদন করা হলে দূতাবাস সেই আবেদনের ভিত্তিতে নিহতদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করে থাকে।
শরীফুল হাসান বলেন, ‘কিন্তু এ ক্ষেত্রে পরিবার দূতাবাস কারও সাথেই তো সৌদি কর্তৃপক্ষ কোনো যোগাযোগ করেনি। এমনকি ওই দুজন আদৌ তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পেয়েছেন কি-না তাও নিশ্চিত না। তারা তো বিদেশি নাগরিক হিসেবে কনস্যুলার সুবিধার আওতায় দূতাবাসের মাধ্যমে আইনি সহায়তা পাওয়ার অধিকারী ছিলেন। কিন্তু সৌদি আরব এক্ষেত্রে সবাইকে অন্ধকারে রেখেছে।’
এমএমটি
-20261018053943.jpg&w=1440&q=75)