বহু নাটকীয়তার পর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন পদত্যাগ করলেন। ১৭ অক্টোবর গেন্ডারিয়ায় অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযান চালাতে গিয়ে বিভিন্ন মহলে সমালোচনার শিকার হন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর এই অভিযান নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে সারা দিন বাগ্যুদ্ধ চলে। একজন প্রতিমন্ত্রীর এভাবে সশস্ত্র হয়ে জনসমক্ষে আসা উচিত কি না, সেটি নিয়েও জমে ওঠে আলোচনা। অনেকে মনে করিয়ে দেন, অস্ত্র হাতে মাদক হটানোর দায়িত্ব একজন সংসদ সদস্যের নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজ তাদেরই করতে দেওয়া উচিত।
শনিবার নিজের ফেসবুক পেজে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক তাঁর মাদকবিরোধী অভিযানের একাধিক ভিডিও প্রকাশ করেছিলেন। ছবিগুলোয় অস্ত্র হাতে প্রতিমন্ত্রীকে দেখা যায়। কেন অস্ত্র হাতে নিয়েছিলেন, তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন ইশরাক হোসেন। বলেছেন গুমটিঘর এলাকায় প্রবেশের পর একদল লোককে ছোটাছুটি করতে দেখে নিজের নিরাপত্তার জন্য তিনি লাইসেন্স করা আগ্নেয়াস্ত্র হাতে নেন। একজন জনপ্রতিনিধি প্রকাশ্যে অস্ত্র হাতে এভাবে অভিযান পরিচালনা করতে পারেন কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। অবশেষে বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমে প্রচার পায় যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে বলেছেন। কিন্তু বিষয়টিকে অসত্য, ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন ইশরাকের প্রেস কর্মকর্তা। জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে ইশরাক হোসেন প্রতিমন্ত্রীর পদ ছাড়ার ঘোষণা দেন।
আমাদের দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত করার ক্ষেত্রে অনেক রকম প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। আইনের মানুষ বেআইনি কাজে যুক্ত মানুষদের সঙ্গে আঁতাত করে অনেক অবৈধ কর্মকাণ্ড চলতে দেয়। দেশের বিভিন্ন জায়গায় মাফিয়া চক্র কীভাবে, কাদের প্রশ্রয়ে বেড়ে ওঠে; সেটা এখন ওপেন সিক্রেট। রাজনৈতিক নেতা, পুলিশ বাহিনী, স্থানীয় প্রভাবশালী মহলসহ ক্ষমতাশালী যে কেউ নানা ধরনের অপকর্মকে প্রশ্রয় দিয়ে থাকে বলে অভিযোগ অনেক দিনের। এই ব্যবসায় মুনাফা এত বেশি যে কে কোন দিক দিয়ে তাদের প্রশ্রয় দিচ্ছে, তা জানা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই অনেকেই নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়ার চেষ্টা করেন।
আইনশৃঙ্খরা রক্ষাকারী বাহিনীকে থোড়াই কেয়ার করে এই দেশে মবের রাজত্ব কায়েম করে গেছে ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। তার জের এখনো চলছে। কারও কারও মনে একধরনের বিশ্বাস তৈরি হয়েছে, সোজা আঙুলে যেহেতু ঘি উঠবে না, তাই নিজের হাতে তুলে নিতে হবে আইন। প্রতিমন্ত্রী কি সে রকম কোনো ভাবনায় আচ্ছন্ন হয়েছিলেন? তিনি কি একবারও ভাবেননি, এ ধরনের উদাহরণ অন্যদেরও অস্ত্র হাতে অভিযানে বেরিয়ে পড়াকে উৎসাহিত করবে? প্রতিটি জেলায় যদি ১০ জন করে রাজনৈতিক নেতা নিজের বৈধ অস্ত্র নিয়ে নিজ এলাকায় অভিযানে নেমে পড়েন, তাহলে দেশে আইনের শাসন বলে কি কিছু অবশিষ্ট থাকবে? দেশ যে তাতে মধ্যযুগে ফিরে যাওয়ার হুমকির মুখে পড়বে, সেটাও তিনি বুঝলেন না?
এ রকম সাহস কোনো ইতিবাচক বার্তা দেয় না। দেশে সুস্থিতি ফিরিয়ে আনার জন্য সবাইকে সতর্ক হতে হবে। আশা করি, ইশরাক হোসেন তাঁর রাজনৈতিক জীবনের চলার পথ ভবিষ্যতে মসৃণ করার চেষ্টা করবেন।
