জালালাবাদ ডেস্ক: জমি কেনাবেচায় পুরোনো মৌজা মূল্যের সুযোগ নিয়ে রাজস্ব ফাঁকি বন্ধ ও কালো টাকার বিস্তার ঠেকাতে স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তরে সরাসরি প্রকৃত বাজারমূল্য কার্যকরের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বাস্তবসম্মত মূল্যে নিবন্ধন নিশ্চিত করার মাধ্যমে বছরে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতি ঠেকানো সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা। শুক্রবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
উচ্চপর্যায়ের সরকারি সিদ্ধান্তের পর সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ভূমি মন্ত্রণালয় এবং আইন ও বিচার বিভাগের সচিবের কাছে এই সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে। নির্দেশনা অনুযায়ী, আইন সচিবের তত্ত্বাবধানে মাঠপর্যায়ের কমিটিগুলো বাস্তবভিত্তিক মূল্যতালিকা প্রস্তুত করবে। অন্যদিকে ভূমি সচিবকে সংশ্লিষ্ট আইন, বিধিমালা পর্যালোচনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ডিজিটাল সংস্কারের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুসারে, বড় শহরগুলোর জন্য বিভাগীয় কমিটি, পৌরসভা ও ক্যান্টনমেন্ট অঞ্চলের জন্য জেলা কমিটি এবং অন্যান্য গ্রামীণ বা স্থানীয় এলাকার জন্য উপজেলা কমিটি দর নির্ধারণ করবে। বিগত রেজিস্ট্রিকৃত দালিলিক মূল্য, বর্তমান ক্রয়-বিক্রয়ের উপাত্ত, অবকাঠামোগত সুবিধা, স্থানীয় অনুসন্ধান ও গণশুনানির মাধ্যমে এই দর চূড়ান্ত করা হবে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তরে প্রকৃত বাজারদরের চেয়ে কম মূল্য দেখানোয় সরকার প্রতি বছর প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হয়। অথচ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জমি ও ফ্ল্যাট নিবন্ধন ফি এবং কর বাবদ আদায় হয়েছিল ১২ হাজার ৬৪৩ কোটি টাকা।
মৌজা দর নির্ধারণের পর ২০২৭ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে একটি পর্যালোচনা সভার পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে নতুন মূল্যের প্রেক্ষিতে করভার যৌক্তিক রাখা এবং রাজস্ব বৃদ্ধির ভারসাম্য বজায় রেখে কর ও ফির হার পুনর্বিন্যাস করা হবে। পরবর্তী সময়ে ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে সংশোধিত এই ফি ও করের হার পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হবে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. এমদাদুল হক চৌধুরী জানান, কমিটির মাধ্যমে দর নির্ধারণের বিষয়টি একটি অন্তর্বর্তীকালীন উদ্যোগ। স্থায়ী সমাধান হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়া সরকারের সহায়তায় বিজ্ঞানভিত্তিক ভ্যালুয়েশন মডেল প্রণয়নের প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন রয়েছে, যা দেড় থেকে দুই বছরের মধ্যে সম্পন্ন হবে।
অর্থ বিভাগের পর্যালোচনায় উঠে এসেছে, ২০১৫ সালের পর সারাদেশে সম্পত্তির দাম কয়েকগুণ বাড়লেও মৌজা দরে সমন্বিত কোনো পরিবর্তন আসেনি। ফলে রাজধানীতে সরকারি সর্বনিম্ন দরের চেয়ে প্রকৃত বাজারদর বহুগুণ বেশি হওয়া সত্ত্বেও দলিলে পুরোনো দর ব্যবহার করা হচ্ছে। এর ফলে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থেকে অপ্রদর্শিত বা কালো টাকায় রূপ নিচ্ছে।
উদ্যোগটিকে ইতিবাচক উল্লেখ করে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন জানান, কেবল প্রকৃত দর নির্ধারণ করলেই সুফল মিলবে না, জটিলতা দূর করতে জমি নিবন্ধন প্রশাসনকেও যুগোপযোগী করতে হবে। পাশাপাশি নতুন মূল্যায়ন কাঠামো স্বচ্ছ ও বৈজ্ঞানিক হওয়া দরকার, যাতে কোনো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী অনৈতিক সুবিধা নিতে না পারে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান উল্লেখ করেন, দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই সংস্কার জমি কেনাবেচায় অবৈধ লেনদেন এবং কালো টাকার প্রভাব অনেকটাই সীমিত করবে। তবে এজন্য স্পষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণের পাশাপাশি নিয়মিত বিরতিতে দর হালনাগাদ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।
