রোগীর মৃত্যু, অস্ত্রোপচারের পর অঙ্গহানি ও গুরুতর শারীরিক জটিলতার অভিযোগ উঠেছে খুলনার কয়রা উপজেলার আনিসা ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে। অথচ ক্লিনিকটিতে অস্ত্রোপচারের উপযুক্ত পরিবেশ, প্রয়োজনীয় জনবল ও রোগীর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। টিনের ছাউনির নিচে অস্ত্রোপচার কক্ষ, দেয়ালের খসে পড়া পলেস্তরা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং বিশেষজ্ঞ অ্যানেসথেসিয়া চিকিৎসকের অনুপস্থিতির অভিযোগও রয়েছে। নিবন্ধনপ্রক্রিয়া নিয়েও রয়েছে জটিলতা। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ পরিদর্শন করে নোটিশ দিলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জবাব দেয়নি ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ।
ক্লিনিকটিতে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের পর বৈশাখী রায় নামে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। একই প্রতিষ্ঠানে অস্ত্রোপচারের পর আরও দুই নারীর মূত্রনালি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ করেছেন তাদের স্বজনরা। তাদের দাবি, পরবর্তী চিকিৎসায় কয়েক লাখ টাকা ব্যয় করেও একজনকে পুরোপুরি সুস্থ করা যায়নি। অন্যজনের চিকিৎসায় দেশে-বিদেশে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১০ লাখ টাকা। তবে এসব শারীরিক জটিলতা ও মৃত্যুর সঙ্গে অস্ত্রোপচারের সরাসরি সম্পর্ক নির্ধারণে স্বাধীন চিকিৎসাগত তদন্তের ফল এখনও পাওয়া যায়নি।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রেজাউল করিম জানিয়েছেন, গত ১৪ অক্টোবর সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর ক্লিনিক কর্তৃপক্ষকে তিন
দিনের মধ্যে জবাব দিতে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ২০ অক্টোবর বিকাল ৫টা পর্যন্ত কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। অভিযোগের বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
কয়রার আমাদী গ্রামের বৈশাখী রায় গত ১০ সেপ্টেম্বর সুস্থ হওয়ার আশায় আনিসা ক্লিনিকে ভর্তি হয়েছিলেন। তার স্বামী বাঁধন ঘোষের অভিযোগ, ক্লিনিকে তাকে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দেওয়া হয়। ওই রাতেই চিকিৎসক সুজাত আহম্মেদ অস্ত্রোপচার করেন। এরপর থেকেই বৈশাখীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে।
বাঁধন ঘোষ জানান, অস্ত্রোপচারের চার দিন পর বৈশাখীকে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসকরা তার কিডনির নালি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা জানান বলে দাবি করেন তিনি। তার ভাষ্য, অস্ত্রোপচারের আগে স্ত্রীর কিডনিতে কোনো সমস্যা ছিল না। অস্ত্রোপচারের সময় আঘাতের কারণেই এ জটিলতা তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ তার। শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে ২৫ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর বৈশাখীর মৃত্যু হয়।
তবে অস্ত্রোপচারের সঙ্গে কিডনির নালির ক্ষতি ও মৃত্যুর সরাসরি সম্পর্ক নিশ্চিত করতে চিকিৎসার নথি, বিশেষজ্ঞ মতামত এবং প্রয়োজনীয় তদন্ত জরুরি। এ বিষয়ে এখনও কোনো চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি।
খুলনা জেলা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, অল্পদিন আগে গড়ে ওঠা ক্লিনিকটির বিরুদ্ধে একাধিক মৃত্যু ও অঙ্গহানির অভিযোগে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। দরিদ্র ও অসচ্ছল পরিবারগুলো আর্থিক অসামর্থ্যরে কারণে যথাযথ প্রতিবাদ ও আইনি পদক্ষেপ নিতে পারছে না। এ সুযোগে অননুমোদিত ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিকরা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এই নাগরিক নেতা।
বৈশাখীর ঘটনা বিচ্ছিন্ন কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন একই ক্লিনিকে অস্ত্রোপচার করানো আরও দুই নারীর স্বজনরা।
প্রায় চার মাস আগে আনিসা ক্লিনিকে অস্ত্রোপচার করানো বেবী খাতুনের স্বামী ফারুক মোল্লার অভিযোগ, অস্ত্রোপচারের সময় তার স্ত্রীর পেটের ভেতরে গজ বা কোনো চিকিৎসা সরঞ্জাম রয়ে গিয়েছিল। পরে তাকে আবার অস্ত্রোপচার করাতে হয়। এতে তার স্ত্রীর মূত্রনালি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে অভিযোগ করেন ফারুক। বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা ব্যয় করেও স্ত্রীর অবস্থার উন্নতি হয়নি বলে জানান তিনি।
কয়রার বাগালি ইউনিয়নের ঘুগরাকাঠি গ্রামের পলি দাসের স্বামী পঞ্চানন দাসও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন। তার দাবি, আনিসা ক্লিনিকে অস্ত্রোপচারের পর স্ত্রীর মূত্রনালি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে অন্য হাসপাতালে অস্ত্রোপচার করাতে হয়েছে। দেশে বিভিন্ন হাসপাতাল ও বিদেশে চিকিৎসা করাতে প্রায় ১০ লাখ টাকা ব্যয় করেও স্ত্রীকে পুরোপুরি সুস্থ করতে পারেননি তিনি।
তিন পরিবারের অভিযোগে অস্ত্রোপচারের সময় সম্ভাব্য ত্রুটি, অস্ত্রোপচার-পরবর্তী জটিলতা এবং রোগীদের যথাসময়ে উন্নত চিকিৎসাকেন্দ্রে স্থানান্তরের বিষয়গুলো সামনে এসেছে। তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা ও শারীরিক ক্ষতির কারণ নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসার নথি, পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফল এবং বিশেষজ্ঞ মতামত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
সম্প্রতি সরেজমিনে আনিসা ক্লিনিকে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে সিজারিয়ান, অ্যাপেন্ডিসাইটিসসহ বিভিন্ন সমস্যায় অস্ত্রোপচার করানো ১২ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন। তাদের কেউ ছোট খাটে, কেউ মেঝেতে পাটি বিছিয়ে শুয়ে আছেন। পরিদর্শনের সময় কোনো চিকিৎসক বা নার্সকে পাওয়া যায়নি।
পুরনো ভবনের ইটের গাঁথুনির ওপর টিনের ছাউনি। কোথাও কোথাও দেয়ালের পলেস্তরা খসে পড়েছে। স্বাভাবিক প্রসবের কক্ষেও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ দেখা গেছে। অস্ত্রোপচার কক্ষের ছাউনিও টিনের। সেখানে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ও আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামের পর্যাপ্ত উপস্থিতি চোখে পড়েনি। শৌচাগারও ছিল অপরিচ্ছন্ন।
অস্ত্রোপচারের ফরম ও চিকিৎসাপত্রে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের নাম, স্বাক্ষর এবং অস্ত্রোপচার-সংক্রান্ত নোট পাওয়া যায়নি বলে সরেজমিন পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। ডিপ্লোমাধারী নার্স, মালিকপক্ষ, ব্যবস্থাপক কিংবা ল্যাব টেকনিশিয়ানের কাউকেও সেখানে পাওয়া যায়নি।
এ সময় তানিয়া নামের এক নারীকে রোগীদের বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করতে দেখা যায়। রোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কখনও নিজেকে নার্স, কখনও চিকিৎসকের সহকারী হিসেবে পরিচয় দেন। ক্লিনিকের নিবন্ধন সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আবেদন করা হয়েছে’।
অস্ত্রোপচারের আগে রোগীর শারীরিক অবস্থা মূল্যায়ন, উপযুক্ত অ্যানেসথেসিয়া দেওয়া এবং অস্ত্রোপচারের পর পর্যবেক্ষণ নিরাপদ চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু আনিসা ক্লিনিকে এসব ব্যবস্থা কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চিকিৎসক সুজাত আহম্মেদ নিজেই রোগীকে অ্যানেসথেসিয়া দিয়ে অস্ত্রোপচার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ক্লিনিকটিতে বিশেষজ্ঞ অ্যানেসথেসিয়া চিকিৎসক নিয়োজিত আছেন কিনা, অস্ত্রোপচারের সময় রোগীর শ্বাস-প্রশ্বাস ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে কিনা, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
অস্ত্রোপচারের ধরন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় জনবল, উপযুক্ত অবকাঠামো, রোগীর নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে উন্নত হাসপাতালে স্থানান্তরের কার্যকর ব্যবস্থা থাকা জরুরি। কিন্তু সরেজমিন পর্যবেক্ষণে এসব ব্যবস্থার পর্যাপ্ত উপস্থিতি দেখা যায়নি বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে দেওয়া একাধিক লিখিত ও মৌখিক অভিযোগে বলা হয়েছে, আনিসা ক্লিনিকের নিবন্ধনপ্রক্রিয়া অসম্পূর্ণ এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেই। অন্য একটি নামে নিবন্ধনের আবেদন করে কার্যত আনিসা ক্লিনিক পরিচালনা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, প্রতিষ্ঠানটি প্রায় দেড় বছর আগে চালু হয়েছে। তবে নিবন্ধনের আবেদন, অনুমোদনের অবস্থা, অনুমোদিত শয্যাসংখ্যা, অস্ত্রোপচারের অনুমতি এবং প্রয়োজনীয় জনবলসংক্রান্ত নথি যাচাই করে এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ক্লিনিকটির পরিচালক হিসেবে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ও সাবেক সিভিল সার্জন ডা. সুজাত আহম্মেদের নাম রয়েছে বলে জানা গেছে। তবে তাকে সরেজমিনে পাওয়া যায়নি। তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মোবাইল ফোন ও ক্লিনিকের নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। পরে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও জবাব পাওয়া যায়নি।
কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রেজাউল করিম বলেন, ক্লিনিকটির অনিয়ম, নিবন্ধনসংক্রান্ত জটিলতা ও রোগীদের শারীরিক ক্ষতির বিষয়ে লিখিত ও মৌখিক অভিযোগ পাওয়ার পর গত ১৪ অক্টোবর তিনি প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর কর্তৃপক্ষকে নোটিশ দিয়ে তিন দিনের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছিল। কিন্তু ২০ অক্টোবর বিকাল ৫টা পর্যন্ত কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
খুলনার সিভিল সার্জন ডা. মোছা. মাহফুজা খাতুন বলেন, বিশেষজ্ঞ অ্যানেসথেসিয়া চিকিৎসক ছাড়া অস্ত্রোপচার এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে চিকিৎসাসেবা দেওয়া চিকিৎসানীতি ও আইনপরিপন্থি। আনিসা ক্লিনিকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মূল ফটকের সামনে অবস্থিত একটি বেসরকারি ক্লিনিকে অস্ত্রোপচারের পর একাধিক রোগীর গুরুতর শারীরিক জটিলতার অভিযোগ উঠেছে। স্বাস্থ্য বিভাগ পরিদর্শন করে নোটিশও দিয়েছে। এরপরও প্রতিষ্ঠানটির নিবন্ধন, চিকিৎসক-নার্সের উপস্থিতি, অস্ত্রোপচারের নিরাপত্তা এবং চিকিৎসার নথিপত্র নিয়ে প্রশ্নের নিষ্পত্তি হয়নি।
এ অবস্থায় ক্লিনিকটির নিবন্ধন ও অনুমোদনের প্রকৃত অবস্থা প্রকাশ, অস্ত্রোপচার-সংক্রান্ত নথি পরীক্ষা এবং বৈশাখী রায়সহ অভিযোগকারী রোগীদের চিকিৎসার নথি স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের দিয়ে পর্যালোচনা করা জরুরি। একই সঙ্গে অ্যানেসথেসিয়া দেওয়ার দায়িত্বে কে ছিলেন, অস্ত্রোপচারের সময় কী ঘটেছিল এবং রোগীদের শারীরিক ক্ষতির সঙ্গে চিকিৎসার কোনো সম্পর্ক রয়েছে কিনা, তা নিরপেক্ষ তদন্তে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
শুধু নোটিশ দিয়ে জবাবের অপেক্ষায় থাকলে রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না। অভিযোগগুলোর দ্রুত তদন্ত, প্রয়োজন অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা এবং তদন্তের ফল প্রকাশ। চিকিৎসাসেবার নামে কী ঘটেছে এবং এমন অভিযোগের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে স্বাস্থ্য বিভাগের নজরদারি কতটা কার্যকর ছিল।
