ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ক্ষমতার রাজনীতির প্রভাবে রাষ্ট্রসংস্কার ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের সম্ভাবনা দৃশ্যত জিম্মিদশায় পড়েছে বলে মনে করছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির মতে, আইনি, প্রাতিষ্ঠানিক ও আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণের চর্চা শুধু হাতবদল হয়েছে। ফলে জবাবদিহিমূলক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ও রাষ্ট্রসংস্কারের যে সম্ভাবনা রক্তস্নাত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হয়েছিল, তা এখন ক্ষমতার রাজনীতি ও আমলাতান্ত্রিক দুষ্টচক্রের হাতে জিম্মি।
জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) দেওয়া এক বিবৃতিতে এ উদ্বেগ তুলে ধরেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। আগামী ১৭ অক্টোবর সনদ স্বাক্ষরের এক বছর পূর্ণ হচ্ছে।
বিবৃতিতে টিআইবি বলেছে, ৩১ দফা ও নির্বাচনী ইশতেহারে রাষ্ট্রসংস্কার এবং জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নের অঙ্গীকার নিয়ে নির্বাচনে বিজয়ী দলের সংসদ সদস্যরা গণভোটের পক্ষে অবস্থান নিলেও প্রস্তাবিত সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেননি। এই অবস্থান রাষ্ট্রসংস্কার ও সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এখন সংবিধান সংশোধন ও রাষ্ট্রসংস্কার ক্ষমতাসীন জোটের একচ্ছত্র ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
সংস্কারের সম্ভাবনা যেভাবে অনিশ্চিত হলো: চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা বাতিলের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের পতন ঘটে। এর মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার টানা দেড় দশকের শাসনের অবসান হয়।
এরপর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার সংবিধান, বিচার বিভাগ, পুলিশ, দুর্নীতি দমন কমিশন, নির্বাচনব্যবস্থা ও জনপ্রশাসন সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। পরে সংস্কারের পরিধি বাড়িয়ে আরো পাঁচটি কমিশন গঠন করা হয়।
পাঁচটি কমিশনের ১৬৬টি সুপারিশ রাজনৈতিক দল ও জোটগুলোর কাছে পাঠানোর পর ৩৩টি দলের সঙ্গে ৭২টি বৈঠক করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। এসব আলোচনার পর ঐকমত্য ও ভিন্নমতসহ ৮৬টি সুপারিশ নিয়ে প্রণীত হয় জুলাই জাতীয় সনদ।
গত বছরের ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের উপস্থিতিতে সনদটি গৃহীত হয়। পরে নভেম্বরে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি করেন। ওই আদেশের ভিত্তিতে গণভোট অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল।
এর ধারাবাহিকতায় ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রায় ৬৯ শতাংশ ভোট পড়ে সংবিধান সংস্কারের পক্ষে। তবে বিএনপি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও প্রস্তাবিত সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি।
সরকার ও বিরোধী দলের ভূমিকার সমালোচনা: টিআইবি মনে করে, রাষ্ট্রসংস্কারের প্রশ্নে সরকারি দল ও বিরোধী জোট- উভয় পক্ষের রাজনৈতিক অবস্থান জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিবৃতিতে বিরোধী জোটের সমালোচনা করে সংস্থাটি বলেছে, “বিরোধী জোট জনস্বার্থে রাষ্ট্রসংস্কারে সহায়ক ভূমিকার পথ ছেড়ে দলীয় রাজনৈতিক ফায়দার রাজনীতিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান থেকে রাজনৈতিক দলগুলো ও আমলাতন্ত্র শিক্ষা গ্রহণে ব্যর্থ হওয়ায় এমনটা ঘটেছে।”
অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের অধিকাংশ আইনে পরিণত করা হলেও কয়েকটি অধ্যাদেশ বাতিলের সমালোচনা করেছে টিআইবি। সংস্থাটির ভাষ্য, “যেসব অধ্যাদেশ জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় সহায়ক ছিল, তা রহিত বা স্থগিত করা হয়েছে। অর্থাৎ ক্ষমতার রাজনীতি ও আমলাতান্ত্রিক শক্তির যোগসাজশে জুলাই আন্দোলনের মূল অভীষ্ট, একটি জবাবদিহি ও দায়বদ্ধ সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পথ রুদ্ধ হচ্ছে।
“অন্যদিকে কর্তৃত্ববাদ পতনের বিজয়ী শক্তি হিসেবে প্রধান রাজনৈতিক দলের দখলবাজি, চাঁদাবাজি ও দলীয়করণে ‘এবার আমাদের পালা’র লাগামহীন হাতবদল রাষ্ট্রসংস্কার ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নকে কার্যত অসম্ভব করে তুলেছে।”
ঐকমত্য থেকে সরে যাওয়ার পরিণতি: বিবৃতিতে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “জুলাই সনদ মূলত কর্তৃত্ববাদী শাসনামলসহ বিগত সময়ের অর্জিত বাস্তব অভিজ্ঞতার নিরিখেই প্রণীত হয়েছে এবং সরকারি দলসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো কিছু ক্ষেত্রে মতপার্থক্য সত্ত্বেও বৃহত্তর স্বার্থে তখন ঐকমত্যে পৌঁছেছিল। এখন সংখ্যাগরিষ্ঠতান্ত্রিক একচ্ছত্র ক্ষমতার চর্চার মোহে সরকারি দল যেমন অভিজ্ঞতার বিপরীতমুখী পথ ধরেছে তেমনই বিরোধী জোটও মূলত দলীয় রাজনৈতিক ফায়দা অর্জনের তৎপরতায় লিপ্ত রয়েছে।”
টিআইবির মূল্যায়নে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র ও সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার যে সুযোগ তৈরি হয়েছিল, ক্ষমতার রাজনীতি, দলীয় স্বার্থ এবং আমলাতান্ত্রিক প্রভাবের কারণে তা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। ফলে জুলাই জাতীয় সনদের প্রতিশ্রুত সংস্কার বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
সানা/আপ্র/১৬/১০/২০২৬
