পড়াশোনা, নিয়মিত ক্লাস, পরীক্ষা আর নানা কাজের ব্যস্ততায় দিন কীভাবে কেটে যায়, তা বোঝাই যায় না। এই ব্যস্ততায় আমরা অনেক সময় খেয়ালই করি না, শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী ঘুম হচ্ছে কি না। অথচ ঘুমের অভাব ও অতিরিক্ত ক্লান্তির ছাপ সহজেই ফুটে ওঠে চেহারায়।
ক্লান্ত থাকলে চোখের নিচে কালচে দাগ, ফোলা ভাব কিংবা সূক্ষ্ম ভাঁজ দেখা দিতে পারে। কারণ, চোখের চারপাশের ত্বক মুখের অন্য অংশের তুলনায় অনেক পাতলা ও সংবেদনশীল। ফলে ঘুমের অভাব, রোদ কিংবা বয়সের প্রভাব এই অংশে সহজেই বোঝা যায়। তা ছাড়া মুখের অভিব্যক্তি প্রকাশের সময় চোখের চারপাশের পেশি নিয়মিত কাজ করে। আমরা দিনে প্রায় ২৮ হাজারবার চোখের পলক ফেলি বলেও ধারণা করা হয়।
অনেকে ভাবেন, পরীক্ষার পর বা ব্যস্ততার শেষে এক রাত ভালোভাবে ঘুমালেই চোখের নিচের কালচে দাগ ও ফোলা ভাব পুরোপুরি দূর হয়ে যাবে। কিন্তু বিষয়টি এত সহজ নয়। ঘুমের অভাব এর অন্যতম কারণ হলেও বংশগত বৈশিষ্ট্য, ত্বকের রং ও পুরুত্ব, রোদে থাকা এবং শরীরে পানির ঘাটতির মতো বিষয়ও এতে ভূমিকা রাখে। তাই শুধু ঘুম পূরণ করলেই সব সময় এই দাগ দূর হয় না।
তাহলে প্রশ্ন হলো, ক্লান্তি বা ঘুমের অভাবে চোখের নিচেই কেন কালি পড়ে? চোখের নিচে ফোলা ভাব বা ‘আই ব্যাগ’ তৈরি হয় কীভাবে? আর এসব সমস্যা কমানোর উপায়ই–বা কী?
ঘুমের অভাবে চোখের নিচে ফোলা ভাব হয় কেন
ঘুমের সময় আমাদের শরীর বিভিন্ন ক্ষতিগ্রস্ত কোষের মেরামতসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে এসব প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে। চোখের চারপাশের ত্বক পাতলা হওয়ায় ঘুমের অভাবের প্রভাব সেখানে তুলনামূলকভাবে বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
কম ঘুমালে চোখের নিচের অংশে রক্তনালি আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি ত্বকের নিচে তরল জমে সাময়িকভাবে ফোলা ভাব দেখা দিতে পারে। ফলে চোখের নিচে তৈরি হয় ‘আই ব্যাগ’ বা থলির মতো ফোলা অংশ। তবে সবার ক্ষেত্রে এর কারণ এক নয়।
নিয়মিত অপর্যাপ্ত ঘুম ত্বকের স্বাভাবিক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ত্বকের স্থিতিস্থাপকতা কমে এবং চোখের চারপাশের চর্বির বণ্টনেও পরিবর্তন আসে। বংশগত কারণেও কারও কারও চোখের নিচে ফোলা ভাব বেশি দেখা যায়। তাই সব ধরনের আই ব্যাগের জন্য শুধু ঘুমের অভাবকে দায়ী করা ঠিক নয়।

চোখের নিচের ফোলা ভাব কমাবে কীভাবে
মাঝেমধ্যে রাত জাগার পর সকালে চোখের নিচে ফোলা ভাব দেখা দিলে কয়েকটি সহজ উপায় কাজে লাগতে পারে। প্রথমত, পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, চোখ বন্ধ করে তার ওপর পরিষ্কার কাপড়ে মোড়ানো ঠান্ডা সেঁক কিছুক্ষণ ধরে রাখা যায়। ঠান্ডা সেঁক সাময়িকভাবে ফোলা ভাব কমাতে সাহায্য করতে পারে। ঠান্ডা টি-ব্যাগও ব্যবহার করা যায়। তবে সরাসরি বরফ চোখের ত্বকে লাগানো উচিত নয়।
খাবারে অতিরিক্ত লবণ খাওয়ার অভ্যাস থাকলে তা কমানোও উপকারী। বেশি লবণ খেলে শরীরে পানি জমে থাকতে পারে, যার প্রভাব চোখের নিচে ফোলা ভাব হিসেবে দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানি পান করা ও নিয়মিত ঘুমের অভ্যাস গড়ে তোলাও জরুরি।
এসব উপায় মেনে চলার পরও যদি দীর্ঘদিন ধরে চোখের নিচে ফোলা ভাব থাকে, তা বাড়তে থাকে কিংবা হঠাৎ করে দেখা দেয়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কখনো কখনো এর পেছনে অন্য শারীরিক সমস্যাও থাকতে পারে।
ক্লান্ত থাকলে চোখের নিচে কালো দাগ পড়ে কেন
কম ঘুমালে চোখের নিচে কালচে দাগ বা ডার্ক সার্কেল আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। এর একটি কারণ হলো, চোখের নিচের ত্বকের রক্তনালিগুলো বেশি দৃশ্যমান হয়ে ওঠা। ত্বক পাতলা হলে এর নিচের রক্তনালির নীলচে বা বেগুনি আভা বাইরে থেকে দেখা যেতে পারে। আবার চোখের নিচে রঞ্জক পদার্থ জমে ত্বকের রং গাঢ় হলেও কালচে দাগ দেখা দেয়।
তবে সবার চোখের নিচে কালো দাগ পড়ার কারণ এক নয়। বংশগত বৈশিষ্ট্য এর অন্যতম কারণ। কারও কারও চোখের নিচের ত্বকে স্বাভাবিকভাবেই রঞ্জক পদার্থ বেশি থাকে। ঘুমের অভাব, অতিরিক্ত রোদে থাকা, শরীরে পানির ঘাটতি ও আয়রনের অভাবও কালচে দাগকে আরও স্পষ্ট করে তুলতে পারে।
ঘুমের অভাবে চোখের নিচে ফোলা ভাব তৈরি হলে সেখানে ছায়া পড়ে কালচে দেখাতে পারে। আবার ক্লান্তির কারণে মুখের ত্বক ফ্যাকাশে দেখালেও চোখের নিচের রক্তনালিগুলো বেশি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। তাই ডার্ক সার্কেল সব সময় ত্বকের প্রকৃত রং পরিবর্তনের কারণে হয় না; অনেক সময় আলো-ছায়ার প্রভাবও এতে ভূমিকা রাখে।
চোখের নিচে কালচে দাগ কতটা স্পষ্ট হবে, তা ত্বকের স্বাভাবিক রং ও পুরুত্বের ওপরও নির্ভর করে। পাতলা ত্বকে রক্তনালির আভা বেশি বোঝা যেতে পারে। অন্যদিকে ত্বকে রঞ্জক পদার্থের পরিমাণ বেশি হলে কালচে দাগের ধরনও আলাদা হতে পারে।
ডার্ক সার্কেল কমানোর উপায় কী
বংশগত কারণে চোখের নিচে কালচে দাগ থাকলে তা পুরোপুরি দূর করা কঠিন হতে পারে। তবে কিছু অভ্যাস মেনে চললে দাগের তীব্রতা কমানো সম্ভব।
প্রথমত, প্রতিদিন পর্যাপ্ত ঘুমাতে হবে। কিশোর-কিশোরীদের সাধারণত রাতে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, রোদে বের হলে সানগ্লাস ব্যবহার করা এবং চোখের চারপাশের ত্বকের জন্য উপযুক্ত সুরক্ষাব্যবস্থা নেওয়া ভালো। পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে ও সুষম খাবার খেতে হবে। শরীরে আয়রনের ঘাটতি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তার সমাধান করতে হবে।
চোখের চারপাশের ত্বকের জন্য তৈরি কিছু ক্রিম কালচে দাগ কমাতে সাহায্য করতে পারে। তবে সব ক্রিম সবার জন্য উপযোগী নয়। তাই ব্যবহার করার আগে উপাদান সম্পর্কে জানা জরুরি। চোখের আশপাশে কোনো প্রসাধনী ব্যবহারে জ্বালাপোড়া হলে তা বন্ধ করতে হবে।
মনে রাখতে হবে, চোখের নিচে কালো দাগ বা ফোলা ভাব মানেই অসুস্থতা নয়। তবে দাগ হঠাৎ বেড়ে গেলে এক চোখের নিচে অস্বাভাবিক ফোলা দেখা দিলে কিংবা ব্যথা ও অন্য উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
