দরজায় কড়া নাড়ছে শারদীয় দুর্গোৎসব। মন্দিরে মন্দিরে চলছে শেষ সময়ের প্রস্তুতি। প্রতিমার সাজসজ্জা, মন্দির ও মণ্ডপ পরিপাটি করার কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন পুণ্যার্থীরা। এসব কাজে নারী-পুরুষ সবাই কাজ করছেন মিলেমিশে। তবে ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরের একটি গ্রামে পূজার পুরো আয়োজন করছেন নারীরা।
ডেকোরেটর ভাড়া করা কিংবা প্রতিমার সাজসজ্জা, যাবতীয় কেনাকাটা, পুরোহিত ও অতিথি আপ্যায়ন, এমনকি মন্দিরে রং করার মতো কাজও করছেন নারীরা। কোটচাঁদপুর পৌর শহরের সলেমানপুর সাহাপাড়ায় এমনই চিত্র দেখা গেছে।
বিজ্ঞাপন
সরেজমিনে দেখা গেছে, সাহাপাড়ার মন্দিরে বাহারি সাজে সাজানো হয়েছে দুর্গা প্রতিমা। গণেশ, কার্তিক, সরস্বতী দেবীর প্রতিমায় লেগেছে রংতুলির আঁচড়। মন্দির চত্বরে পুণ্যার্থীদের অর্চনার তরতাজা ফুল জমে আছে তুলসি তলায়। নারীরা রঙের বালতি হাতে মন্দিরের দেওয়ালে আল্পনা ও রঙের কাজে ব্যস্ত।

কেউ কেউ ব্যস্ত ডেকোরেশনের কাজে। নারীদের কেউ ব্যস্ত বাজার সদাইয়ের কাজে। কেউ ব্যস্ত অতিথি আপ্যায়নে। মন্দির চত্বর পরিচ্ছন্ন করার কাজেও নারীরা করছেন মিলেমিশে।
বিজ্ঞাপন
আয়োজকরা জানান, পূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হতে আর মাত্র কয়েকদিন বাকি। দেবী দুর্গার আগমনের আগে ভক্ত-অনুরাগীরা মন্দির প্রস্তুতে চরম ব্যস্ত সময় পার করছেন। গত বছরও এই মন্দিরে দুর্গাপূজার আয়োজন করেন নারীরা। যদিও আগে পুরুষরাই ছিলেন পূজা আয়োজনের মূল কেন্দ্রে। তবে ২০২৫ সালের আগে পরপর কয়েকবার পুরুষরা এই মন্দিরে পূজা আয়োজনে ব্যর্থ হন। এরপর সলেমানপুর সাহাপাড়ার নারীরা মিলে গড়ে তোলেন ‘নবারণ মহিলা সংঘ’।

স্থানীয় বাসিন্দা হরিপ্রসাদ সাহা জানান, ব্রিটিশ আমল থেকে সাহাপাড়ার মন্দিরে দুর্গাপূজার আয়োজন হতো। তখন মন্দিরের কোনো স্থায়ী ঘর ছিল না। বর্তমানে টিনের ছাউনি ও পাকা দেওয়ালের একটি ঘরেই গড়ে তোলা হয়েছে মন্দির। এই মন্দিরেই বছরের পর বছর ধরে পুরুষদের আয়োজনে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হতো। তবে ২০২৫ সালের আগে বেশ কয়েক বছর সাহাপাড়ার এই মন্দিরে দুর্গাপূজার আয়োজন বন্ধ ছিল। এ নিয়ে মহল্লার সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মাঝেও মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।
হরিপ্রসাদ সাহার ভাষ্যমতে, পুরুষরা বেশ কয়েক বছর এই মন্দিরে দুর্গাপূজার আয়োজন করতে পারেনি। পরে এলাকার নারীরা ‘নবারণ মহিলা সংঘ’ নামে একটি সংগঠন তৈরি করে। নারীরাই উদ্যোগী হয়ে গত বছর দুর্গাপূজার আয়োজন করে। এবারের আয়োজনেও নারীরা। তারাই বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে পূজার জন্য চাঁদা সংগ্রহ করেন। পাড়ার সব নারী এই পূজা আয়োজনের জন্য সারা বছর ধরেই নিজ নিজ উদ্যোগে টাকা জমান। নারীদের এমন উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে।
বিজ্ঞাপন

পার্শ্ববর্তী আলামপুর গ্রামের বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘বাজার সদাই থেকে শুরু করে, পুরোহিত ঠিক করা, ডেকোরেটর ভাড়া করাসহ যাবতীয় কাজ নারীরাই করছেন। এরকম খবর শুনে মন্দিরটি দেখতে এসেছি। এখানে এসে নারীদের উদ্যোগ, পরিশ্রম ও আন্তরিকতা দেখে মুগ্ধ হয়েছি।’
নবারণ মহিলা সংঘের কোষাধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করছেন পূজা রানি সাহা। তিনি জানান, অন্যান্য বছরের চেয়ে এবছর প্রতিমা সাজসজ্জার সরঞ্জামের দাম অনেক বেড়েছে। এছাড়া পূজার আনুষঙ্গিক জিনিসের দামও বাড়তি। মহল্লার নারীদের উদ্যোগে যে পরিমাণ অর্থ জোগাড় করা হয়েছে, তা চাহিদার তুলনায় কম। এজন্য স্থানীয় প্রশাসনসহ সরকারের সহযোগিতা বাড়ানোর দাবি জানান তিনি।
বিজ্ঞাপন
সংঘের সাধারণ সম্পাদক কবিতা রানি সাহা জাগো নিউজকে বলেন, “নারীরা পারে না এমন কোনো কাজ নেই। পুরুষরা যখন দুর্গাপূজার আয়োজন ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়, তখন আমরা কয়েকজন নারী মহল্লার সব নারীকে নিয়ে একটা মিটিং করি। সেই মিটিংয়ে ‘নবারণ মহিলা সংঘ’ গঠন করা হয়। আমাদের একটি কমিটি আছে। আমরা গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে পূজার জন্য চাঁদা সংগ্রহ করি। দেবী দুর্গার আরাধনা করাই আমাদের লক্ষ্য। দেবী মা যদি আমাদের ওপর সন্তুষ্ট হন, তাহলে আমাদের আর কোনো চাওয়া নেই।”
সার্বিক আয়োজন প্রসঙ্গে নবারণ মহিলা সংঘের সভাপতি বেবী রানি সাহা জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের এই যাত্রা অনেক কঠিন ছিল। প্রথম দিকে অনেকেই আমাদের নিরুৎসাহিত করেছে। কিন্তু আমাদের মা-বোনেরা সবাই খুব আন্তরিক ছিলেন। যে কারণে আমরা এই কঠিন কাজটি করে যেতে পারছি। টানা দ্বিতীয়বারের মতো আমরা দুর্গা পূজা আয়োজন করছি।’
তিনি বলেন, ‘এই মন্দিরের পূজার যাবতীয় কাজ, বাজার-সদাইয়ের কাজ নারীরা করেন। তবে পুরুষরাও আমাদের নানান কাজে সহায়তা করেন। তারাও পরামর্শ দেন। এবছর প্রশাসন থেকেও আমাদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। গত বছর শান্তিপূর্ণভাবে উৎসবমুখর পরিবেশে পূজা উদযাপন করেছি। এবারও সার্বিক পরিবেশ অত্যন্ত সন্তোষজনক রয়েছে।’
এম শাহাজান/এসআর/জেআইএম
ফলো করুন
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন jagofeature@gmail.com ঠিকানায়।
