ঢেঁড়স খেতে পছন্দ করেন অনেকে। ভাজি, তরকারি কিংবা ঝোল—বিভিন্নভাবে রান্না করে খাওয়া যায় এই সবজি। তবে ঢেঁড়সের পিচ্ছিল ভাবের কারণে অনেকেই এটি এড়িয়ে চলেন। অথচ এই পিচ্ছিল উপাদানই হজমের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, অন্ত্রের সুস্থতা এবং কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে।
ভারতীয় বংশোদ্ভূত গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট চিকিৎসক ডা. সৌরভ শেঠি জানিয়েছেন, ঢেঁড়সের পিচ্ছিল উপাদানে রয়েছে দ্রবণীয় খাদ্য আঁশ, যা পানির সংস্পর্শে এলে জেলির মতো পদার্থ তৈরি করে। এই উপাদানকে বলা হয় মিউসিলেজ। ঢেঁড়সের পরিচিত পিচ্ছিল ভাবের জন্য মূলত এটিই দায়ী। তবে এই উপাদান শুধু সবজিটির গঠনেই ভূমিকা রাখে না, শরীরের বিভিন্ন স্বাভাবিক কার্যক্রমেও সহায়তা করতে পারে।
ডা. সৌরভ শেঠি এআইআইএমএস, হার্ভার্ড ও স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসক। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে এক পোস্টে তিনি ঢেঁড়সের পিচ্ছিল উপাদানের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগত উপকারিতা তুলে ধরেছেন।
হজমে সহায়তা করে
ঢেঁড়সে থাকা দ্রবণীয় খাদ্য আঁশ হজমপ্রক্রিয়া স্বাভাবিক রাখতে এবং নিয়মিত মলত্যাগে সহায়তা করতে পারে। খাদ্য আঁশ মলের পরিমাণ বাড়াতে এবং পরিপাকতন্ত্রের মধ্য দিয়ে মল চলাচলে সহায়তা করে। ফলে পর্যাপ্ত আঁশযুক্ত খাবার খাওয়ার অভ্যাস কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধেও ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে শুধু ঢেঁড়স খেলেই হজমের সব সমস্যা দূর হবে, এমনটি নয়। পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং সুষম খাদ্য গ্রহণও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
অন্ত্রের উপকারী অণুজীবের জন্য সহায়ক
মানুষের পরিপাকতন্ত্রে অসংখ্য অণুজীব বসবাস করে, যাদের সম্মিলিতভাবে অন্ত্রের মাইক্রোবায়োম বলা হয়। এদের মধ্যে কিছু উপকারী অণুজীব খাদ্য আঁশকে খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করে।
ঢেঁড়সের মতো আঁশসমৃদ্ধ সবজি নিয়মিত সুষম খাদ্যতালিকায় রাখলে এসব অণুজীবের কার্যক্রমে সহায়তা করতে পারে। এর ফলে অন্ত্রের সামগ্রিক সুস্থতা বজায় রাখতেও ভূমিকা রাখতে পারে খাদ্য আঁশ।
কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে ভূমিকা
ঢেঁড়সের আরেকটি সম্ভাব্য উপকারিতা হলো কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করা। ডা. শেঠি জানান, পরীক্ষাগারে পরিচালিত গবেষণা ও প্রাণীর ওপর করা কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, ঢেঁড়সের উপাদান পিত্ত অ্যাসিডের সঙ্গে যুক্ত হয়ে মলের মাধ্যমে শরীর থেকে তা বের করে দিতে সহায়তা করতে পারে।
পিত্ত অ্যাসিড যকৃতে কোলেস্টেরল ব্যবহার করে তৈরি হয় এবং চর্বি হজমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শরীর থেকে বেশি পরিমাণে পিত্ত অ্যাসিড বেরিয়ে গেলে যকৃৎ নতুন পিত্ত অ্যাসিড তৈরির জন্য আরও কোলেস্টেরল ব্যবহার করতে পারে। দ্রবণীয় খাদ্য আঁশের মাধ্যমে কোলেস্টেরল কমতে সাহায্য করার পেছনে এটি একটি সম্ভাব্য প্রক্রিয়া।
তবে এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতাও রয়েছে। পরীক্ষাগার ও প্রাণীর ওপর পরিচালিত গবেষণার ফলাফল থেকে মানুষের শরীরে একই প্রভাব নিশ্চিতভাবে পাওয়া যাবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। ঢেঁড়স খাওয়ার সঙ্গে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমার সম্পর্ক আরও ভালোভাবে বুঝতে মানুষের ওপর বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন।
খাদ্যতালিকায় রাখবেন যেভাবে
ঢেঁড়সের পিচ্ছিল ভাব অনেকের কাছে অপছন্দের হলেও এর পুষ্টিগুণ বিবেচনায় সবজিটি খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে। ভাজি বা তরকারি হিসেবে রান্না করা ছাড়াও মসলা দিয়ে ভেজে কিংবা বিভিন্ন ধরনের ঝোল ও কারিতে এটি যোগ করে খাওয়া যায়।
বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য অনুযায়ী, ঢেঁড়সের দ্রবণীয় খাদ্য আঁশ হজম, অন্ত্রের স্বাস্থ্য এবং কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সম্ভাব্য উপকার দিতে পারে। তবে কোনো নির্দিষ্ট রোগের চিকিৎসা হিসেবে শুধু ঢেঁড়সের ওপর নির্ভর না করে বৈচিত্র্যময় ও সুষম খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখাই গুরুত্বপূর্ণ।