ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পুলিশের ডিস্ট্রিক্ট স্পেশাল ব্রাঞ্চের (ডিএসবি) সাবেক সদস্য মশিউর রহমান মাতুব্বর, যিনি সবার কাছে মোয়াজ্জেম হোসেন নামে পরিচিত ছিলেন, আর নেই। আনুমানিক বয়স হয়েছিল ৬০ বছর। তাঁর মৃত্যুতে পরিবার, আত্মীয়স্বজন, সাবেক সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
গত শনিবার (১০ অক্টোবর) ভোররাত ২টার দিকে ঢাকার মহাখালীস্থ ইউনিভার্সেল মেডিকেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন। পরে শনিবার বাদ আসর বরিশালের বাকেরগঞ্জে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। কর্মজীবন শেষে তিনি স্ত্রী ও দুই ছেলেকে নিয়ে বরিশাল শহরে বসবাস করছিলেন।
মোয়াজ্জেম হোসেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দীর্ঘ ২১ বছর চাকরি করেছেন। ২০১৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া ছেড়ে যান। এরপর বরিশালে আরও এক বছর চাকরি করে অবসরে যান। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি সহকর্মী ও পরিচিতজনদের কাছে একজন সৎ, মানবিক ও ধর্মপরায়ণ মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার দুপুরে নামাজের পর হঠাৎ তাঁর বুকে ব্যথা শুরু হয়। বিষয়টি স্ত্রীকে জানানোর পর তাঁকে প্রথমে বরিশালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার মহাখালীস্থ ইউনিভার্সেল মেডিকেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
হাসপাতালে এনজিওগ্রাম করার পর তাঁর হৃদ্যন্ত্রে একটি ব্লক ধরা পড়ে। পরে শুক্রবার (৯ অক্টোবর) ভোররাত ৩টার দিকে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাঁর হৃদ্যন্ত্রে একটি রিং বসানো হয়। এরপর তাঁকে নিবিড় পর্যবেক্ষণের জন্য সিসিইউতে রাখা হয়। তবে শনিবার রাতে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। শেষ পর্যন্ত ভোররাত ২টার দিকে তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুর খবরে স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে শোকের মাতম শুরু হয়।
মোয়াজ্জেম হোসেনের সঙ্গে প্রতিবেদকের ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল প্রায় ১০ বছরের। এই দীর্ঘ সময়ে তাঁর সঙ্গে গড়ে উঠেছিল আন্তরিকতা, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সম্পর্ক। ব্রাহ্মণবাড়িয়া ছেড়ে যাওয়ার আগে তিনি প্রায় দুই বছর সদর হাসপাতালসহ আশপাশের এলাকার দায়িত্বে ছিলেন।
প্রতিবেদকের মানবিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের প্রতি তাঁর ছিল বিশেষ স্নেহ ও আন্তরিকতা। ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর প্রতিষ্ঠার পর বিভিন্ন সময়ে তিনি অনুপ্রেরণা ও দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। মানবিক কাজগুলো এগিয়ে নিতে উৎসাহ জুগিয়েছেন। কর্মজীবনে তাঁর সঙ্গে বিভিন্ন সামাজিক ও অপরাধবিরোধী কর্মকাণ্ডেও একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল প্রতিবেদকের। হাসপাতালের দালালচক্রের বিরুদ্ধে অবস্থান, বিভিন্ন এলাকার সংঘর্ষ, হত্যা, ধর্ষণসহ নানা অপরাধের তথ্য সংগ্রহ এবং হাসপাতালকেন্দ্রিক চুরি-ছিনতাইয়ের মতো ঘটনার বিষয়ে তাঁরা কাজ করেছেন। মোয়াজ্জেম হোসেন এসব ঘটনার তথ্য ও প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে তুলে ধরতেন।
অন্যদিকে, প্রতিবেদক সংবাদ প্রকাশ এবং বিভিন্ন তথ্য ও সংবাদ সিনিয়র সাংবাদিকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে ভূমিকা রাখতেন। মানুষের কল্যাণে কাজ করা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকার সেই দিনগুলোর স্মৃতি আজও গভীরভাবে নাড়া দিচ্ছে। সময়ের ব্যবধানে কর্মস্থল ও অবস্থান বদলালেও তাঁদের মধ্যকার আন্তরিক সম্পর্ক অটুট ছিল।
মৃত্যুর আগে গত ৩ অক্টোবর মোয়াজ্জেম হোসেন সর্বশেষ প্রতিবেদককে ভিডিও কল করেছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, ব্যস্ততার কারণে সেই কলটি আর রিসিভ করা সম্ভব হয়নি। পরদিন ৪ অক্টোবর প্রতিবেদকও তাঁকে ফোন করেছিলেন, কিন্তু সেদিন তিনিও কলটি রিসিভ করতে পারেননি। দুজনেরই কথা বলার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু সেই কথাগুলো আর বলা হলো না। এখন মোবাইলের ফেসবুক মেসেঞ্জারে জমে থাকা কল হিস্টোরি দেখলেই বারবার মনে পড়ে যায় প্রিয় মানুষটির কথা। যে মানুষটি একসময় ফোন করে খোঁজ নিতেন, উৎসাহ দিতেন, পাশে থাকার আশ্বাস দিতেন, তিনি আর কখনো ফোন করবেন না, এই বাস্তবতা মেনে নেওয়া বড় কঠিন। কিছু মানুষ জীবনে আসেন, নীরবে ভালোবাসা ও আন্তরিকতার জায়গা তৈরি করেন। একসময় চলে গেলেও তাঁদের রেখে যাওয়া স্মৃতি, শিক্ষা ও অনুপ্রেরণা থেকে যায় আজীবন। মোয়াজ্জেম হোসেন ছিলেন তেমনই একজন মানুষ।
মোয়াজ্জেম হোসেনের মৃত্যুতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর পরিবার গভীরভাবে শোকাহত ও মর্মাহত। তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানিয়ে শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা প্রকাশ করা হয়েছে।
মহান আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা করে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারকে এই অপূরণীয় ক্ষতি সহ্য করার শক্তি দান করুন। আমিন।
The post ব্রাহ্মণবাড়িয়া ডিএসবিতে ২১ বছরের কর্মজীবন, চিরবিদায় নিলেন মোয়াজ্জেম হোসেন appeared first on The voice of Brahmanbaria || Local news means the world is.
