ড. প্রণব কুমার পাণ্ডে
শরৎ এলেই প্রকৃতিতে দেখা দেয় এক সুন্দর পরিবর্তন। নীল আকাশ, সাদা মেঘ, কাশফুল আর শিউলির সুবাস জানান দেয় দুর্গাপূজার আগমনী বার্তা। বাঙালি জীবনে দুর্গাপূজা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; আনন্দ, ভালোবাসা, সম্প্রীতি ও মিলনেরও উপলক্ষ। হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান এই উৎসবকে ঘিরে সমাজের বিভিন্ন ধর্মের মানুষও আনন্দ ভাগ করে নেন। এভাবেই দুর্গাপূজা বাংলার সংস্কৃতি ও সামাজিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
পূজা ঘিরে মণ্ডপ সাজানো, প্রতিমা তৈরি, নতুন পোশাক কেনা, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করা এবং বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার আয়োজন চলে। শহর থেকে গ্রাম—সবখানেই তৈরি হয় উৎসব পরিবেশ। ব্যস্ত জীবনে এই উৎসব মানুষকে আপনজনের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ দেয় এবং সম্পর্কের বন্ধন আরও দৃঢ় করে।
দুর্গাপূজার অন্যতম প্রধান শিক্ষা হলো অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির বিজয়। হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবী দুর্গা মহিষাসুরকে পরাজিত করে অন্যায়ের শক্তিকে দমন করেন। এই কাহিনি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অন্যায় যত শক্তিশালীই হোক, সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো জরুরি। বর্তমান সমাজেও এই শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যায়, দুর্নীতি, হিংসা, বৈষম্য ও অসহিষ্ণুতা দূর করতে শুধু কথায় নয়, কাজেও মানবিক মূল্যবোধের চর্চা করতে হবে।
অন্যায়ের প্রতিবাদ করা, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং সবার অধিকার রক্ষায় ভূমিকা রাখাই হোক দুর্গাপূজার অন্যতম শিক্ষা। দেবী দুর্গার শক্তি আমাদের সাহস জোগাক। তার আগমনের বার্তা আমাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে অনুপ্রাণিত করুক।
বাংলাদেশ বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষের দেশ। ঈদ, দুর্গাপূজা, বুদ্ধপূর্ণিমা ও বড়দিনসহ বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব এ দেশের বৈচিত্র্যময় সমাজের পরিচয় বহন করে। ধর্মীয় বিশ্বাস আলাদা হলেও মানুষের সুখ-দুঃখ, আশা-আকাঙ্ক্ষা ও ভালোবাসার অনুভূতি সবার কাছেই গুরুত্বপূর্ণ। দুর্গাপূজা পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্প্রীতি বাড়ানোর একটি সুযোগ। বিভিন্ন ধর্মের মানুষ যখন একে অপরের আনন্দে অংশ নেন, শুভেচ্ছা জানান এবং সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন, তখন সামাজিক বন্ধন আরও শক্তিশালী হয়। তবে সম্প্রীতি শুধু উৎসবের কয়েকটি দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না।
সারা বছরই একে অন্যের ধর্মীয় বিশ্বাস, অধিকার ও মর্যাদার প্রতি সম্মান দেখাতে হবে। কেউ যেন ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে অবহেলা, ভয় বা বৈষম্যের শিকার না হন, তা নিশ্চিত করা জরুরি। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো সব নাগরিকের নিরাপত্তা ও সমান অধিকার নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে সমাজের প্রত্যেককে সাম্প্রদায়িকতা, বিদ্বেষ ও অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে সচেতন থাকতে হবে। গুজব বা উসকানিমূলক বক্তব্যের কারণে যেন কোনো বিভেদ বা সংঘাত সৃষ্টি না হয়- এ বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। উৎসবের আনন্দ তখনই পূর্ণতা পাবে- যখন সবাই নিরাপদে ও নির্ভয়ে নিজেদের ধর্মীয় আচার পালন করতে পারবেন।
দুর্গাপূজা আনন্দময় করতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। পূজামণ্ডপ, মন্দির, সড়ক ও জনসমাগমস্থলে যথাযথ নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকতে হবে। এ জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন, পূজা উদ্যাপন কমিটি এবং সাধারণ মানুষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। নারী, শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি ও প্রতিবন্ধী মানুষের নিরাপত্তা ও চলাচলের সুবিধার দিকে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। মণ্ডপে প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ সহজ রাখা, অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা রাখা জরুরি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো খবর বা ছবি দেখেই তা বিশ্বাস করা বা ছড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়। তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে হবে। কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে উত্তেজিত না হয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। শান্তিপূর্ণ উৎসব নিশ্চিত করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; আয়োজক, দর্শনার্থী, স্থানীয় বাসিন্দা ও সামাজিক সংগঠন- সবার দায়িত্বশীল আচরণ প্রয়োজন। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার মাধ্যমে দুর্গাপূজাকে সবার জন্য আনন্দময় করে তোলা সম্ভব।
উৎসবের আনন্দ তখনই অর্থবহ হয়- যখন সমাজের সব শ্রেণির মানুষ সেই আনন্দের অংশ হতে পারেন। আমাদের আশপাশে অনেক দরিদ্র পরিবার, অসহায় শিশু, প্রবীণ ব্যক্তি ও অসুস্থ মানুষ রয়েছেন, যাদের পক্ষে উৎসবের আনন্দ উপভোগ করা কঠিন। সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের পাশে দাঁড়ানো, খাবার ও পোশাক দিয়ে সহযোগিতা করা এবং আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে উৎসবের মানবিক দিকটি আরও উজ্জ্বল করা যায়। কারণ উৎসবের সৌন্দর্য শুধু আলোকসজ্জা, প্রতিমা বা নতুন পোশাকে নয়; মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর মধ্যেও রয়েছে।
পরিবেশের প্রতিও আমাদের দায়িত্ব রয়েছে। পূজামণ্ডপের সাজসজ্জায় একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাতে হবে। শব্দদূষণ এড়িয়ে চলতে হবে এবং পূজা শেষে বর্জ্য যথাযথভাবে পরিষ্কার করতে হবে। প্রতিমা বিসর্জনের ক্ষেত্রেও নদী ও জলাশয়ের পরিবেশ রক্ষায় সতর্ক থাকতে হবে। পরিবেশবান্ধব উপকরণ ব্যবহার ও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার মাধ্যমে ধর্মীয় আচার পালন এবং প্রকৃতি রক্ষা-দুই দায়িত্বই পালন করা সম্ভব।
দুর্গাপূজা নারীশক্তি, সাহস ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতীক হিসেবেও বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। দেবী দুর্গার শক্তি ও সাহসের প্রতীকী রূপ আমাদের নারীর মর্যাদা ও ক্ষমতায়নের কথাও মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু বাস্তব জীবনে এখনও অনেক নারী নির্যাতন, বৈষম্য ও বাল্যবিবাহের শিকার হন। শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও তাদের নানা বাধার মুখোমুখি হতে হয়। তাই দেবী দুর্গার আরাধনার পাশাপাশি নারীর অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও সমাজে নারীর সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করা সবার দায়িত্ব। নারীকে সম্মান করা এবং তার মতামত ও সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দেওয়া শুধু উৎসবের শিক্ষা নয়; এটি সারা বছরের অঙ্গীকার হওয়া উচিত।
দুর্গাপূজা আমাদের জীবনে আনন্দের পাশাপাশি নতুন আশার বার্তা নিয়ে আসে। এই উৎসব শেখায় অন্যায় ও হতাশার কাছে হার না মেনে সত্য, ন্যায় ও মানবিকতার পক্ষে দাঁড়াতে হবে। মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে একটি সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে তুলতে। আমরা চাই এবারের দুর্গাপূজা সবার জীবনে শান্তি, সুখ ও সমৃদ্ধি বয়ে আনুক। প্রতিটি পূজামণ্ডপ হয়ে উঠুক সম্প্রীতির মিলনস্থল। প্রতিটি পরিবারে ছড়িয়ে পড়ুক আনন্দ। ধর্মীয় পরিচয় যা-ই হোক, প্রত্যেক মানুষ যেন নিরাপদে, সম্মানের সঙ্গে ও নির্ভয়ে জীবনযাপন করতে পারেন।
দুর্গাপূজার এই শুভক্ষণে আমাদের অঙ্গীকার হোক—আমরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াবো, বিপদে মানুষের পাশে থাকবো এবং ধর্মীয় ভেদাভেদ ভুলে মানবতার বন্ধনকে শক্তিশালী করবো। বিদ্বেষের বদলে ভালোবাসা, বিভেদের বদলে সম্প্রীতি এবং উদাসীনতার বদলে সহমর্মিতাকে বেছে নেবো।
দেবী দুর্গার আগমন আমাদের মনে শুভবোধ জাগিয়ে তুলুক। অশুভ শক্তির পরাজয় এবং শুভ শক্তির বিজয়ের বার্তা ছড়িয়ে পড়ুক ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে। শুভ দুর্গাপূজা। সবার জীবন আনন্দ, শান্তি, সম্প্রীতি ও মানবিকতায় পূর্ণ হোক।
লেখক: প্রফেসর, লোক-প্রশাসন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)
কেএমএএ/আপ্র/১৭.১০.২০২৬
