উচ্চ শব্দ, কেমিক্যালের তীব্র গন্ধ আর কালো ধোঁয়ায় বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে রাজধানীর বহু আবাসিক এলাকা। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ঢাকা মহানগরীর অলিগলিতে গড়ে উঠেছে হাজার হাজার অনুমোদনহীন ও অবৈধ কলকারখানা। আবাসিক ভবনের বেজমেন্ট, ছাদ কিংবা ভেতরের সংকীর্ণ কক্ষে চলছে প্লাস্টিক রিসাইক্লিং, জুতা তৈরি, কেমিক্যাল ও ব্যাটারি ভাঙার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এসব কারখানার কারণে একদিকে যেমন জনস্বাস্থ্য মারাত্মক হুমকির মুখে, অন্যদিকে বাড়ছে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি।
সরেজমিন ঘুরে জানা গেছে, পুরান ঢাকার চকবাজার, লালবাগ, বংশাল, কামরাঙ্গীরচর থেকে শুরু করে মিরপুর, কারওয়ান বাজার, জুরাইন ও কদমতলীর আবাসিক এলাকার প্রায় প্রতিটি গলিতেই চোখে পড়ে অবৈধ কারখানা। নিয়মানুযায়ী আবাসিক এলাকায় কোনো বাণিজ্যিক বা শিল্পকারখানা স্থাপন নিষিদ্ধ। কিন্তু অধিক মুনাফার আশায় বাড়ির মালিকরা আইন অমান্য করে কারখানা ও গুদাম ভাড়া দিচ্ছেন। আর এসব কারখানায় যত্রতত্র প্লাস্টিক দানা তৈরি এবং রাসায়নিক ও দাহ্য পদার্থ ব্যবহার করা হচ্ছে। কোনো প্রকার অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছাড়াই এসব কারখানা পরিচালিত হচ্ছে।
শুধু তাই নয়, দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা ভারী যন্ত্রপাতির বিকট শব্দ এবং বিষাক্ত ধোঁয়া আবাসিক এলাকার পরিবেশকে বিষাক্ত করে তুলছে। আরো জানা গেছে, আবাসিক এলাকায় এসব কারখানা সচল থাকায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশু ও বৃদ্ধরা। বিষাক্ত ধোঁয়া ও কেমিক্যালের কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ফুসফুসের সংক্রমণ, অ্যালার্জি ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগ জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। এছাড়া রাতভর কারখানার ভারী মেশিনের তীব্র শব্দে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটছে এবং সাধারণ মানুষের কানের সমস্যা তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি কারখানার রাসায়নিক ও প্লাস্টিক বর্জ্য সরাসরি ঘরোয়া ড্রেনে ফেলা হচ্ছে। ফলে ড্রেনেজ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে সামান্য বৃষ্টিতেই দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে।
এদিকে রাজধানীর এসব অলিগলি সংকীর্ণ হওয়ার কারণে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢোকার মতো ন্যূনতম রাস্তাও নেই। নিমতলী, চুড়িহাট্টা কিংবা চকবাজারের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাগুলো বারবার আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে আবাসিক এলাকায় এই কলকারখানাগুলো কতটা বিপজ্জনক। তবুও প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে কিংবা কলকারখানা অধিদপ্তরের একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের যোগসাজশে এগুলো বহাল তবিয়তে চলছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জুরাইন ও কদমতলী আবাসিক এলাকায় ছোট ছোট অবৈধ কারখানা গড়ে ওঠা বর্তমান সময়ের একটি অন্যতম বড় নাগরিক ও পরিবেশগত সমস্যা। ঘনবসতিপূর্ণ এই আবাসিক অঞ্চলটিতে নিয়ম-কানুন না মেনে শত শত ছোট ও মাঝারি কারখানা গড়ে উঠেছে, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনযাত্রাকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলছে। জুরাইন ও কদমতলীর আবাসিক এলাকা এবং বসুন্ধরা রিভার ভিউ আবাসিক এলাকা সংলগ্ন এলাকার ভেতরে কেমিক্যাল, প্লাস্টিক, গ্লাস, জুতা, লোহা এবং তামার তার গলানোর কারখানা থাকায় দিন-রাত কালো ধোঁয়া ও তীব্র শব্দ উৎপন্ন হয়। এতে শিশু ও বৃদ্ধদের মাঝে শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগ এবং শ্রবণশক্তির সমস্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এছাড়া এসব অননুমোদিত কারখানার রাসায়নিক ও তরল বর্জ্য সরাসরি স্থানীয় ড্রেন ও জলাশয়ে ফেলা হয়। ফলে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি জলাবদ্ধতা ও দুর্গন্ধে পুরো এলাকা বাস অযোগ্য হয়ে পড়ছে।
স্থানীয়রা জানান, আবাসিক ভবনের নিচতলায় বা সংকীর্ণ গলির ভেতরে গড়ে ওঠা এসব কারখানায় কোনো ধরণের অগ্নি-নির্বাপণ ব্যবস্থা নাই। প্লাস্টিক, জুতার আঠা ও কেমিক্যালের মতো দাহ্য পদার্থের মজুত থাকায় যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড ঘটার তীব্র ঝুঁকি রয়েছে এবং রাস্তা সরু হওয়ার কারণে সেখানে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢোকাও অসম্ভব বলেও জানান তারা। তাদের দাবি, এই কারখানাগুলোর একটি বড় অংশই অবৈধ বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ ব্যবহার করে চলে। অসাধু চক্রের সহায়তায় মিটার ছাড়া বা আবাসিক লাইনে বাণিজ্যিক কাজ চালানোর কারণে একদিকে যেমন সরকার কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে আবাসিক এলাকায় গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকট এবং লোডশেডিং দেখা দিচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক বাড়ির মালিক জানান, যথাযথ লাইসেন্স (যেমন : পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র বা ট্রেড লাইসেন্স) না থাকায় এই কারখানাগুলোকে টিকিয়ে রাখতে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী ও অসাধু চক্রের নিয়মিত মাসোহারা বা চাঁদা দিতে হয়। ফলে নিয়মের তোয়াক্কা না করেই এগুলো বছরের পর বছর টিকে থাকে। আইন অনুযায়ী, সিটি কর্পোরেশন, পরিবেশ অধিদপ্তর কিংবা কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (উওঋঊ)-এর আবাসিক এলাকায় কারখানার ট্রেড লাইসেন্স বা পরিবেশগত ছাড়পত্র দেওয়ার কোনো বিধান নেই। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, হাজার হাজার কারখানা কোনো রকম লাইসেন্স ছাড়াই বছরের পর বছর চলছে। মাঝে মধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালতের উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও, কয়েকদিন পরই পরিস্থিতি আবার আগের রূপ নেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরান ঢাকা ও অন্যান্য আবাসিক এলাকার সমস্ত ঝুঁকিপূর্ণ কলকারখানা নির্ধারিত বিসিক (ইঝঈওঈ) শিল্পনগরী বা কেরানীগঞ্জ-সাভারের প্লাস্টিক ও কেমিক্যাল পল্লীতে দ্রুত সরিয়ে নেওয়া উচিত। এবং রাজউক, সিটি কর্পোরেশন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও ফায়ার সার্ভিস এবং কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (উওঋঊ)-এর সমন্বয়ে নিয়মিত কঠোর চিরুনি অভিযান পরিচালনা ও অবৈধ কারখানার গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ স্থায়ীভাবে বিচ্ছিন্ন করার বিষয়েও পরামর্শ তাদের।
পাশাপাশি বাড়ির মালিকদের আবাসিক ভবনে কারখানা বা ঝুঁকিপূর্ণ গুদাম ভাড়া দেওয়ার ব্যাপারে সচেতন এবং আইনগতভাবে বাধ্য করতে হবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এ বিষয়ে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (উওঋঊ) ঢাকা কার্যালয়ের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মো. আতিকুর রহমানের মুঠোফোনে বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। অতপর ওই নাম্বারের হোয়াটস্অ্যাপে টেক্সট করলেও তিনি কোনো রিপ্লাই দেননি।
বিআলো/অর্নব