উড়োজাহাজ ইজারার প্রায় ৪৫ কোটি ৮৩ লাখ টাকা বকেয়া পরিশোধে ব্যর্থ হয়েছে রিজেন্ট এয়ারওয়েজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান এইচজি এভিয়েশন লিমিটেড। দেনা স্বীকার করেও কিস্তিতে অর্থ পরিশোধের প্রতিশ্রুতি রাখেনি প্রতিষ্ঠানটি। শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি অবসায়নের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে পাওনা আদায়ের প্রক্রিয়া পরিচালনায় একজন অবসায়ক নিয়োগ করেছেন আদালত।
হাবিব গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এইচজি এভিয়েশন লিমিটেড অবসায়নের নির্দেশ দিয়ে গত ১৯ আগস্ট রায় দেন হাইকোর্ট। শনিবার (১৭ অক্টোবর) রায়ের ১৫ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করা হয়।
বিচারপতি মো. তৌফিক ইনামের একক কোম্পানি বেঞ্চ এ রায় দেন। আদালত সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার আসিফ বিন আনোয়ারকে প্রতিষ্ঠানটির অবসায়ক (লিকুইডেটর) নিয়োগ করেছেন।
তাঁকে এক সপ্তাহের মধ্যে অবসায়ন প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। দুই মাসের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেওয়ারও নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
এইচজি এভিয়েশনের কাছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক উইলমিংটন ট্রাস্ট কোম্পানির পাওনা ৩৭ লাখ ৯ হাজার ৮২৭ দশমিক ৩৮ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৮ অক্টোবর ২০২৬-এর প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ৫৫ পয়সা বিনিময় হার ধরে এর পরিমাণ প্রায় ৪৫ কোটি ৮৩ লাখ ৪৯ হাজার টাকা। এর বাইরে চুক্তি অনুযায়ী সুদ ও অন্যান্য পাওনাও দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। বিনিময় হার পরিবর্তিত হলে টাকার অঙ্কও পরিবর্তিত হবে।
দেনা স্বীকার, তবু পরিশোধ নয়
আদালতের রায়ের বিবরণ অনুযায়ী, উড়োজাহাজ ইজারার বকেয়া পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ার পর এইচজি এভিয়েশন পাওনার দায় স্বীকার করেছিল। আইনজীবীদের মাধ্যমে কিস্তিতে অর্থ পরিশোধের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু পরে সেই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী অর্থ পরিশোধ করেনি।
রায়ে আদালত বলেন, ভবিষ্যতে বিনিয়োগ পাওয়ার সম্ভাবনা দেখিয়ে স্বীকৃত ও পরিশোধযোগ্য ঋণের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। প্রতিষ্ঠানটি পাওনার মূল দায় অস্বীকার করেনি। বরং কিস্তিতে অর্থ পরিশোধে সম্মত হয়েছিল। কিন্তু নিজেই সম্মত হওয়া সময়সূচি অনুসরণে ব্যর্থ হয়েছে।
অবসায়নের আবেদনে হাবিব গ্রুপের আরও ১০ প্রতিষ্ঠান
এইচজি এভিয়েশনের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া উইলমিংটন ট্রাস্ট কোম্পানি হাবিব গ্রুপের আরও ১০টি প্রতিষ্ঠানের অবসায়ন চেয়েছে। ২০২৩ সালে গ্রুপটির মোট ১১টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অবসায়নের আবেদন করে পাওনাদার প্রতিষ্ঠানটি।
তবে হাইকোর্ট আপাতত এইচজি এভিয়েশন লিমিটেড অবসায়নের নির্দেশ দিয়েছেন। এ প্রতিষ্ঠান থেকে পাওনা আদায় সম্ভব না হলে অন্য ১০টি প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উইলমিংটন ট্রাস্ট কোম্পানির আইনজীবী ব্যারিস্টার মো. মুক্তাদির রহমান দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আদালতের চলতি মাসের ছুটি শেষে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর অবসায়নের আবেদনের ওপর শুনানির উদ্যোগ নেওয়া হবে।
অবসায়নের আবেদনের মুখে থাকা অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—হাবিব স্টিলস লিমিটেড, ডায়মন্ড সিমেন্ট লিমিটেড, লিগ্যাসি ফ্যাশন লিমিটেড, রিজেন্ট স্পিনিং মিলস লিমিটেড, রিজেন্ট টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড, সিয়াম সুপেরিয়র লিমিটেড, এমটিএস রি-রোলিং মিলস লিমিটেড, আনোয়ারা পেপার মিলস লিমিটেড, রিজেন্ট পাওয়ার লিমিটেড ও রিজেন্ট এয়ারওয়েজ লিমিটেড।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এই ১১টি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিভিন্ন সরকারি সংস্থা, ব্যাংক ও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন পাওনাদারের প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা পাওনা রয়েছে।
পাওনাদারদের বিপাকে রেখে দেশ ছাড়েন পাঁচ কর্ণধার
হাবিব গ্রুপের ব্যবসায়িক পরিস্থিতির অবনতির মধ্যে ২০২২ সালে গ্রুপটির পাঁচ শীর্ষ কর্ণধার দেশ ছেড়েছেন বলে জানা গেছে। তাঁরা হলেন গ্রুপের চেয়ারম্যান ইয়াকুব আলী, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইয়াসিন আলী এবং পরিচালক মাশরুফ হাবিব, সালমান হাবিব ও তানভীর হাবিব।
প্রায় ৩০টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে গ্রুপটির প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। ঋণখেলাপির কারণে একসময় দেশের অন্যতম বড় শিল্পগোষ্ঠীটির ব্যবসায়িক কার্যক্রমও সংকুচিত হয়ে পড়ে।
সাত দশকের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের পতন
১৯৪৭ সালে চট্টগ্রামে হাবিব ট্রেডিংয়ের মাধ্যমে ব্যবসা শুরু করেন হাবিব উল্লাহ মিয়া। ভোগ্যপণ্য আমদানি-রপ্তানি ছিল তাঁর প্রাথমিক ব্যবসা। পরে তাঁর তিন ছেলে ইয়াকুব আলী, মাহবুব আলী ও ইয়াসিন আলী ব্যবসায় যুক্ত হন।
সময়ের সঙ্গে গড়ে ওঠে হাবিব গ্রুপ। গার্মেন্টস, টেক্সটাইল, জাহাজভাঙা, ইস্পাত, সিমেন্ট ও কাগজশিল্পে ব্যবসা সম্প্রসারণ করে গ্রুপটি। একসময় প্রতিষ্ঠানটিতে ১৬ হাজারের বেশি মানুষ কাজ করতেন।
তবে পরবর্তী সময়ে সার, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও এভিয়েশনসহ বিভিন্ন খাতে ব্যবসা সম্প্রসারণের পর গ্রুপটির আর্থিক সংকট বাড়তে থাকে। ২০১৯ সাল থেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঋণখেলাপির ঘটনা সামনে আসতে শুরু করে
পরে গ্রুপটির ৩১টি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এর কিছু প্রতিষ্ঠান অন্য ব্যবসায়ীদের কাছে ভাড়া দেওয়া হয়েছে।
যেভাবে শুরু হয় মামলা
২০১২ সালের ১৪ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক উইলমিংটন ট্রাস্ট কোম্পানি ‘ওনার ট্রাস্টি’ হিসেবে এইচজি এভিয়েশন লিমিটেডের সঙ্গে একটি উড়োজাহাজ ইজারা চুক্তি করে। চুক্তির আওতায় প্রতিষ্ঠানটিকে একটি ব্যবহৃত বোয়িং ৭৩৭-৭০০ উড়োজাহাজ ইজারা দেওয়া হয়।
পরবর্তী সময়ে ইজারার অর্থসহ চুক্তি অনুযায়ী বিভিন্ন পাওনা পরিশোধে ব্যর্থ হয় এইচজি এভিয়েশন। এতে পাওনা আদায়ে আইনি পদক্ষেপ নেয় উইলমিংটন ট্রাস্ট কোম্পানি।
আবেদনকারীর দাবি অনুযায়ী, ২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বকেয়ার পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৭ লাখ ৯ হাজার ৮২৭ দশমিক ৩৮ মার্কিন ডলার। ওই সময়ের বিনিময় হার অনুযায়ী টাকার অঙ্ক ভিন্ন হতে পারে। এর সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী প্রযোজ্য সুদ ও অন্যান্য পাওনাও দাবি করা হয়।
বকেয়া পরিশোধের জন্য ২০২০ সালের ২৮ জানুয়ারি, ৩ ফেব্রুয়ারি ও ১৮ ফেব্রুয়ারি এইচজি এভিয়েশনকে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়। পরে প্রতিষ্ঠানটি পাওনার দায় স্বীকার করে কিস্তিতে অর্থ পরিশোধের নতুন সময়সূচিতে সম্মত হয়। কিন্তু সেই সময়সূচিও কার্যকর করেনি।
উড়োজাহাজ ইজারা নেওয়ার সময় হাবিব গ্রুপের আরও ১০টি প্রতিষ্ঠান চুক্তির জামিনদার ছিল বলে জানিয়েছেন উইলমিংটন ট্রাস্ট কোম্পানির আইনজীবী ব্যারিস্টার মো. মুক্তাদির রহমান।
পাওনা আদায়ের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর ২৪১(৫) ও ২৪৫ ধারার অধীনে এইচজি এভিয়েশনসহ হাবিব গ্রুপের ১১টি প্রতিষ্ঠান অবসায়নের আবেদন করে উইলমিংটন ট্রাস্ট কোম্পানি।
আদালতে পাওনাদার প্রতিষ্ঠানের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার মো. মুক্তাদির রহমান। তবে এইচজি এভিয়েশনের পক্ষে কোনো আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন না।
The post ৪৫ কোটি ৮৩ লাখ টাকা দেনা, হাবিব গ্রুপের প্রতিষ্ঠান অবসায়নের নির্দেশ হাইকোর্টের appeared first on সুপ্রভাত বাংলাদেশ.
