বাংলাদেশে অতি-প্রক্রিয়াজাত প্যাকেটজাত খাবারের ব্যবহার আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় অসংক্রামক ব্যাধির চরম ঝুঁকিতে পড়েছে জনস্বাস্থ্য। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় খাবারের প্যাকেটের সামনে সহজ, স্পষ্ট ও বাধ্যতামূলক সতর্কীকরণ লেবেল চালুর দাবি জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে খাদ্যশিল্প মালিকদের নানা কৌশল ও চাপের মুখে এ সংক্রান্ত ‘নিরাপদ খাদ্য প্রবিধানমালা, ২০২৬’-এর খসড়াটি এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। দ্রুত এই নীতি চূড়ান্ত করে কার্যকর করার মাধ্যমে ভোক্তার স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন সচেতন মহল।
বিশ্ব খাদ্য দিবস ২০২৬ উপলক্ষ্যে বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটর (জিএইচএআই)-এর সহযোগিতায় গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান ‘প্রজ্ঞা’ (প্রগতির জন্য জ্ঞান) আয়োজিত ‘অতি-প্রক্রিয়াজাত খাদ্য-প্যাকেটের সামনে সতর্কতামূলক লেবেল: অগ্রগতি, বাধা ও করণীয়’ শীর্ষক ওয়েবিনারে এসব তথ্য ও সুপারিশ তুলে ধরা হয়। উল্লেখ্য, বিশ্ব খাদ্য দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য ‘ইনোভেট টুডে, নারিশ টুমরো’ (Innovate Today, Nourish Tomorrow)।
ওয়েবিনারে জানানো হয়, বাংলাদেশে শিশু-কিশোরসহ সব বয়সী মানুষের মধ্যে মাত্রাতিরিক্ত লবণ, চিনি ও সম্পৃক্ত চর্বিযুক্ত অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণের প্রবণতা ব্যাপক হারে বাড়ছে। গবেষণা বলছে, দেশের ৯৭ শতাংশ মানুষ সপ্তাহে অন্তত একবার এসব খাবার খেয়ে থাকেন। তবে বর্তমানে খাদ্য-প্যাকেটের পেছনে থাকা জটিল পুষ্টিতথ্য সাধারণ ভোক্তার পক্ষে বোঝা এবং সঠিক খাদ্য নির্বাচন করা কঠিন।
এই সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ফ্রন্ট-অফ-প্যাক লেবেলিং (এফওপিএল) সংক্রান্ত একটি খসড়া প্রবিধানমালা তৈরি করেছে, যা বর্তমানে খাদ্য মন্ত্রণালয়ে পর্যালোচনার অধীনে রয়েছে। জানা গেছে, খাদ্যশিল্পের দেশি-বিদেশি অংশীজনদের পক্ষ থেকে বাধ্যতামূলক ব্যবস্থার বদলে স্বেচ্ছামূলক লেবেলিং, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তির অজুহাত, বাস্তবায়নের সময় বাড়ানো, ছোট প্যাকেটে ছাড় এবং সতর্কবার্তার পরিবর্তে বিভ্রান্তিকর বা কম দৃশ্যমান এফওপিএল ব্যবহারসহ নানাবিধ দাবি উত্থাপন করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শোয়েব বলেন, “খসড়াটি বর্তমানে খাদ্য মন্ত্রণালয়ে রয়েছে। আমরা ইতোমধ্যে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও)-এর বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে দিয়েছি এবং ব্যবসায়িক সংগঠনগুলোর সাথেও কাজ করছি। আশা করছি এটি দ্রুত গেজেট আকারে প্রকাশ করা সম্ভব হবে।”
জনস্বাস্থ্যবিদ ও রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, “দেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশ ঘটে বিভিন্ন অসংক্রামক রোগে, যার অন্যতম কারণ অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণ। বাধ্যতামূলক এফওপিএল খাদ্যজনিত অসংক্রামক রোগ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। তাই শিল্পগোষ্ঠীর হস্তক্ষেপমুক্ত থেকে খসড়া প্রবিধানমালাটি দ্রুত চূড়ান্ত করতে হবে।”
ব্র্যাক জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অফ পাবলিক হেলথের সহযোগী বিজ্ঞানী আবু আহমেদ শামীম বলেন, “প্যাকেটজাত অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের প্রকৃত পুষ্টিমান ও সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে ভোক্তাদের স্পষ্ট ধারণা দিতে সতর্কীকরণভিত্তিক এফওপিএল সবচেয়ে বেশি কার্যকর।”
গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের বাংলাদেশ কান্ট্রি লিড মুহাম্মাদ রূহুল কুদ্দুস বলেন, এফওপিএল বাস্তবায়নে স্বাস্থ্য ব্যয় কমবে এবং এসডিজি ৩.৪ অর্জনের পথ আরও সুগম হবে।
দৈনিক ইত্তেফাকের চিফ রিপোর্টার এম শামসুদ্দীন আহমেদ বলেন, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় এফওপিএল খুবই কার্যকরী পদক্ষেপ। খসড়া প্রবিধানমালাটি দ্রুত চূড়ান্ত করতে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
ওয়েবিনারে আরও বক্তব্য রাখেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রোগ্রাম অফিসার (ডায়েট রিলেটেড রিস্ক ফ্যাক্টর) সামিনা ইসরাত এবং ভাইটাল স্ট্র্যাটেজিসের কনসালটেন্ট আমিনুল ইসলাম সুজন। প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়েরের সভাপতিত্বে এবং কো-অর্ডিনেটর মাশিয়াত আবেদিনের সঞ্চালনায় ওয়েবিনারে বিষয়ভিত্তিক উপস্থাপনা তুলে ধরেন প্রোগ্রাম অফিসার শবনম মোস্তফা। নাগরিক সমাজ, এনজিও ও যুব সমাজের প্রতিনিধি এবং সাংবাদিকসহ দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এই ওয়েবিনারে অংশ নেন।
