সোমালিয়ার উপকূলে জলদস্যুদের তৎপরতা দমনে নিরাপত্তা অভিযান জোরদার করেছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও আন্তর্জাতিক নৌবাহিনী। এতে সমুদ্রে মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা, গ্রেপ্তার এবং সামরিক নজরদারির মুখে পড়েছেন দেশটির পুন্টল্যান্ড অঞ্চলের উপকূলীয় শহর বান্দের বেইলার জেলেরা। জলদস্যুতার সঙ্গে জড়িত না থেকেও জীবিকা হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন তারা। জেলেদের অভিযোগ, জলদস্যুদের দমনে নেওয়া পদক্ষেপের কারণে তাদের পরিবারও দুর্ভোগে পড়েছে।
বিজ্ঞাপন
সোমালিয়ার উপকূলে ২০ বছর ধরে মাছ ধরছেন আবদিফাতাহ মোহাম্মদ। ১৫ বছর বয়সে এ পেশায় আসেন তিনি। কিন্তু মাছের পরিমাণ কমে যাওয়া ও বিদেশি ট্রলারের কারণে এখন পরিবারের ভরণপোষণ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে তার।
৩৫ বছর বয়সি মোহাম্মদ বলেন, ‘আগের মতো আর মাছ পাই না। গলদা চিংড়ি ধরার সম্ভাবনাও দিন দিন কমে যাচ্ছে।’
তার অভিযোগ, ‘বিদেশি ট্রলারগুলো সমুদ্রের মাছ নিঃশেষ করে দিচ্ছে।’
১৯৯১ সালে সোমালিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের পতনের পর দেশটির জলসীমায় নজরদারি দুর্বল হয়ে পড়ে। এতে অবৈধ মাছ ধরার সুযোগ তৈরি হয়। বিদেশি জাহাজের হাতে দেশের সামুদ্রিক সম্পদ শোষিত হচ্ছে—এমন ক্ষোভ থেকে কিছু জেলে জলদস্যুতায় জড়িয়ে পড়েছেন।
মোহাম্মদ বলেন, ‘বিদেশি ট্রলারগুলোর সঙ্গে আমরা জেলেরা পেরে উঠি না। তাদের সক্ষমতা আমাদের চেয়ে অনেক বেশি। এর প্রভাব পড়ে স্থলে থাকা আমাদের পরিবারের জীবিকার ওপর।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের এলাকার কেউ কেউ সমুদ্রে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছেন। কিন্তু আমি জানি, এতে আমাদের নিজেদের সম্প্রদায়েরই ক্ষতি হচ্ছে।’
সমুদ্রে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা
২০২৬ সালের এপ্রিলের শেষ দিক থেকে সোমালিয়ার উপকূলে জলদস্যুদের তৎপরতা বেড়েছে। তবে কতটি জাহাজ ছিনতাই হয়েছে, তা নিয়ে বিভিন্ন হিসাবে পার্থক্য রয়েছে। বাণিজ্যিক জাহাজ, মাছ ধরার নৌযান ও ধাও—সব ধরনের নৌযানকে হিসাবে ধরা হচ্ছে কি না, তার ওপর এই সংখ্যা নির্ভর করছে। ছিনতাই হওয়া কয়েকটি জাহাজ বান্দের বেইলার কাছে আটকে রাখা হয়েছে। ফলে শহরটির জেলে সম্প্রদায়ের ওপর সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে।
জলদস্যুরা জেলে সেজে চলাফেরা করতে পারে—এমন আশঙ্কায় স্থানীয় কর্তৃপক্ষ আগস্টের শেষ সপ্তাহে জেলেদের সমুদ্রে যাওয়া বন্ধ করে দেয়।
মোহাম্মদ বলেন, ‘আগস্টের শেষ সপ্তাহে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ সমুদ্রে যেতে নিষেধ করে। এই নিষেধাজ্ঞা দুই মাস বহাল থাকার কথা ছিল।’
তিনি বলেন, ‘সমুদ্রে মাছ ধরে যা আয় করি, তা দিয়েই আমাদের পরিবার চলে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মাছের পরিমাণ কমে গেলেও এই আয় ঘরের খরচ চালাতে সাহায্য করত। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, এমন অপরাধের শাস্তি আমাদের দেওয়া হচ্ছে, যার সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। এর মাশুল দিতে হচ্ছে আমাদের পরিবারকে।’
মোহাম্মদের ভাষায়, নিষেধাজ্ঞা মানা কিংবা অমান্য করা—দুই ক্ষেত্রেই জেলেদের ঝুঁকি রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘কর্তৃপক্ষ জানতে পারলে যে আপনি সমুদ্রে গিয়েছিলেন, তারা আপনাকে জলদস্যুতা কিংবা ছিনতাই করা জাহাজে রসদ সরবরাহের অভিযোগে অভিযুক্ত করতে পারে।’
তিনি আরো বলেন, ‘সমুদ্রে থাকলে আন্তর্জাতিক নৌবাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার কিংবা সহিংসতার শিকার হওয়ার আশঙ্কা থাকে। জলদস্যু ভেবে আপনাকে ধরে বিদেশের কোনো কারাগারে নিয়ে যাওয়া হতে পারে। এই শহরের অনেক পুরুষের সঙ্গেই এমন ঘটনা ঘটেছে।’
বান্দের বেইলায় ১৫ বছর ধরে মাছ ধরছেন আবদিরিজাক সাঈদ। তার মতে, জলদস্যুবিরোধী অভিযানে স্থানীয় বাসিন্দাদের দুর্ভোগ আরো বেড়েছে।
সাঈদ বলেন, ‘অসংখ্য মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের বেশির ভাগকে গ্রেপ্তার করা হয় জলদস্যুদের খাবার কিংবা খাত সরবরাহের পর। তখন ছিনতাই করা জাহাজগুলো বান্দের বেইলার কাছে নোঙর করা ছিল।’
খাত একধরনের উদ্দীপক পাতা, যা ওই অঞ্চলের কিছু মানুষ চিবিয়ে থাকেন।
সাঈদ আরো বলেন, ‘স্থানীয় সরকার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও দোকানগুলোকে জলদস্যুদের কাছে কোনো কিছু বিক্রি না করার নির্দেশ দিয়েছিল। কেউ তা করলে তাকেও জলদস্যু হিসেবে বিবেচনা করা হবে বলে জানানো হয়।’
জলদস্যুতার পেছনে আত্মীয়তার নেটওয়ার্ক
জাহাজ ছিনতাইয়ের ঘটনায় জড়িত কয়েকজন বান্দের বেইলারই বাসিন্দা। ফলে জলদস্যুতার কারণে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থার মুখে পড়া শহরটির কিছু বাসিন্দার সঙ্গে এ অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে।
সাঈদ বলেন, ‘ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত কিছু জলদস্যু বান্দের বেইলার বাসিন্দা। তারা এই সম্প্রদায়েরই মানুষ।’
ডেনিশ ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ গবেষক জেথ্রো নরম্যান বলেন, জলদস্যুতাকে শুধু সমুদ্রে সংঘটিত অপরাধ হিসেবে দেখলে এর প্রকৃতি বোঝা যাবে না। এর পেছনে স্থলভাগে থাকা এমন কিছু নেটওয়ার্ক কাজ করে, যেগুলো অর্থ, সরঞ্জাম, লোকবল ও নিরাপত্তা দিতে পারে।
নরম্যান বলেন, ‘আত্মীয়তার নেটওয়ার্ক অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো হিসেবে কাজ করতে পারে। জলদস্যুতার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয়। অতীতে জলদস্যুরা এসব নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ঋণ, সরঞ্জাম, লোকবল ও সুরক্ষা জোগাড় করতে পেরেছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘গোত্রীয় সম্পর্ক জলদস্যুতার জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ জোগাড় এবং লোকজনকে সংগঠিত করার ভিত্তি তৈরি করতে পারে। এ কারণেই জলদস্যুতা দমনে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হলে স্থলভাগে থাকা এসব নেটওয়ার্ক সম্পর্কে ধারণা থাকা জরুরি।’
এসব নেটওয়ার্কের কারণে জলদস্যুবিরোধী অভিযানের প্রভাব স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে। সাঈদ জানান, ইয়েমেন থেকে সোমালিয়ায় পণ্য ও রসদ নিয়ে আসা নৌযানগুলোর চলাচলও বন্ধ হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, ‘জলদস্যুদের এসব হামলার কারণে ইয়েমেন থেকে রসদ নিয়ে আসা নৌযানগুলোও আসা বন্ধ করে দিয়েছে।’
জলদস্যুদের ঠেকাতে উদ্যোগ বাসিন্দাদের
নিরাপত্তা অভিযান ও নিষেধাজ্ঞার কারণে জীবনযাত্রা ব্যাহত হলেও স্থানীয় কিছু বাসিন্দা তরুণদের জলদস্যুতায় জড়ানো থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করছেন বলে জানিয়েছেন মোহাম্মদ।
তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি স্থানীয় কয়েকজন সশস্ত্র তরুণ সমুদ্রে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু বাসিন্দারা তাদের বাধা দেন। তারা তরুণদের বোঝান, এমন কাজ করলে নিজেদের সম্প্রদায়ের ক্ষতি আরো বাড়বে।’
মোহাম্মদের ভাষ্য, ‘তাদের থামানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন সাধারণ মানুষ, সরকার নয়। কারণ, এখান থেকে হামলা চালানো হলে এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ার শিকার হবেন এই শহরের সাধারণ বাসিন্দারাই।’
গণমাধ্যমে কথা বলার অনুমতি না থাকায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় সরকারের দুই কর্মকর্তা জানান, জলদস্যুদের রসদ সরবরাহকারী স্থানীয় নেটওয়ার্ক দুর্বল করতেই নিরাপত্তা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল।
প্রথম কর্মকর্তা বলেন, ‘জলদস্যুবিরোধী সফল অভিযানে তিনটি জাহাজ মুক্ত হওয়ার পর ১ অক্টোবর নিরাপত্তা বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া হয়।’
আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন সংস্থা (আইএমও) ২ অক্টোবর জানায়, ছিনতাই হওয়া তিনটি জাহাজ—‘অনার ২৫’, ‘সিমাল’ (যা ‘সিবু ১’ নামেও পরিচিত) এবং ‘ইউরেকা’—মুক্ত করা হয়েছে। এসব জাহাজের ৪৪ জন নাবিককে মুক্তি দেওয়া হয়। তবে ‘অনার ২৫’ উদ্ধারের অভিযানের সময় পাঁচজন নাবিকের মৃত্যু হয়েছে বলে জানায় সংস্থাটি।
বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া হলেও বান্দের বেইলার আশপাশে নিরাপত্তা বাহিনীর তৎপরতা কমেনি বলে জানিয়েছেন ওই দুই কর্মকর্তা।
এক কর্মকর্তা বলেন, ‘সমুদ্র থেকে স্থলভাগের দিকে আসা সামরিক হেলিকপ্টারগুলো নিয়মিত শহরের ওপর চক্কর দেয়। কাছাকাছি প্রত্যন্ত উপকূলীয় এলাকায় এসব উড্ডয়ন আরো ঘন ঘন হচ্ছে।’
অন্য কর্মকর্তা বলেন, ‘উপকূলে সশস্ত্র ব্যক্তিদের যেকোনো তৎপরতা শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।’
দুই কর্মকর্তার ভাষ্য, হেলিকপ্টারগুলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের নৌবাহিনীর। এই বাহিনী বহু বছর ধরে ওই অঞ্চলে জলদস্যুবিরোধী অভিযান পরিচালনা করছে।
নৌবাহিনীর ওপর বাড়তি চাপ
আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা এবং সমুদ্রপথের নিরাপত্তা রক্ষায় একাধিক চ্যালেঞ্জের মধ্যে সোমালিয়ার উপকূলে জলদস্যুদের নতুন করে তৎপরতা বেড়েছে। সোমালিয়ার রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাবিষয়ক বিশ্লেষক আবদিনুর আবদেলা বলেন, ২০২৩ সালের শেষ দিকে লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরে হুথিদের হামলা শুরু হওয়ার পর আন্তর্জাতিক নৌবাহিনীর মনোযোগের বড় অংশ ওই দিকে সরে যায়।
গাজায় যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় হুথিরা ওই দুই অঞ্চলে হামলা শুরু করেছিল। আবদেলার মতে, এর ফলে আন্তর্জাতিক নৌবাহিনী হুথিদের হুমকি মোকাবিলায় বেশি মনোযোগ দেয়। এই সুযোগে সোমালিয়ার উপকূলে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগ নেয়।
আবদেলা বলেন, ‘২০২৩ সালের শেষ দিকে হুথিরা লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরে হামলা শুরু করার পর আন্তর্জাতিক নৌবাহিনীর নজর ও তৎপরতা হুথিদের হুমকির দিকে সরে যায়। এতে সোমালিয়ার উপকূলে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো নিরাপত্তার শিথিলতার সুযোগ নিতে পেরেছে।’
ডেনিশ ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের গবেষক নরম্যান বলেন, পুন্টল্যান্ডের সামুদ্রিক নিরাপত্তা বাহিনীও অন্য নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের কারণে চাপে রয়েছে।
আলজাজিরাকে তিনি বলেন, ‘আল-মিসকাদ পাহাড়ে আইএসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে পুন্টল্যান্ড মেরিটাইম পুলিশ ফোর্সের (পিএমপিএফ) সক্ষমতা চাপে পড়েছে। ২০২৩ সালে লাস আনোদে সোমালিল্যান্ডবিরোধী বিদ্রোহের সময়ও বাহিনীটি কিছু সদস্য হারিয়েছে।’
নরম্যান জানান, পুন্টল্যান্ডের বাহিনীর কিছু ধুলবাহান্তে যোদ্ধা, যাদের মধ্যে পিএমপিএফের সদস্যও ছিলেন, ওই বিদ্রোহে যোগ দিয়েছিলেন। বিদ্রোহীরা সোমালিল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ থেকে তাদের দাবিকৃত ভূখণ্ডের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ছিনিয়ে নেয়।
নরম্যানের মতে, এখানেও গোত্রীয় পরিচয় ও আত্মীয়তার সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। সমসাময়িক জলদস্যু নেটওয়ার্ক এবং তা দমনের উদ্যোগ বুঝতে এসব সম্পর্ক ও পারস্পরিক দায়বদ্ধতার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে।
বান্দের বেইলার বাসিন্দাদের কাছে এসব নিরাপত্তা সংকট কেবল আঞ্চলিক রাজনীতির বিষয় নয়। এর ওপর নির্ভর করছে জেলেরা সমুদ্রে যেতে পারবেন কি না, পণ্য ও রসদ আসবে কি না এবং সাধারণ মানুষ জলদস্যু সন্দেহে আটক হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বেন কি না।
সাঈদ বলেন, নিরাপত্তা বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার পরও আকাশে বিমানের উপস্থিতি জেলেদের মনে করিয়ে দেয়, তাদের ওপর নজরদারি চলছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা বিমানের শব্দ শুনতে পাই। শব্দ যত জোরে শোনা যায়, বুঝতে পারি সেগুলো তত কাছে। তখন বুঝি, আমাদের ওপর নজর রাখা হচ্ছে।’
সাঈদের কথায়, ‘আমি শুধু জীবিকা নির্বাহ করতে চাই। সমুদ্রে গিয়ে নিরাপদে তীরে ফিরতে পারব কি না, তা নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে চাই না।’
এএম
