লন্ডন, ২৩ অক্টোবর – জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক পরিণতি এখন আর কোনো অদূর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়, বরং এক নির্মম ও নির্মম বাস্তবতার রূপ নিয়েছে। চলতি ২০২৬ সালের গ্রীষ্মে ইউরোপজুড়ে বয়ে যাওয়া অভূতপূর্ব তীব্র দাবদাহে ৫০ হাজার ৩৯১ জন মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এর মাধ্যমে চলতি বছরটি ইউরোপ মহাদেশের ইতিহাসে তাপদাহজনিত মৃত্যুর দিক থেকে সবচেয়ে প্রাণঘাতী বছর হিসেবে এক কালো রেকর্ড সৃষ্টি করেছে।
আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী ‘নেচার হেলথ’-এ প্রকাশিত পিয়ার-রিভিউড দুটি গবেষণা নিবন্ধে উঠে এসেছে এই ভয়াবহ তথ্য। গবেষকরা জানিয়েছেন, এই বিপুল সংখ্যক প্রাণহানির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ—অর্থাৎ ৩২,৬০০টিরও বেশি মৃত্যু সরাসরি মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের ফল। লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের প্রখ্যাত গবেষক ও প্রতিবেদনের অন্যতম লেখক ক্লেয়ার বার্নস সতর্ক করে বলেছেন, ইউরোপের অর্ধেকেরও বেশি এলাকার জন্য ২০২৬ সালের গ্রীষ্মকাল ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে বিধ্বংসী ও প্রাণঘাতী সময়।
স্বাভাবিকের চেয়ে ১২ ডিগ্রি বেশি তাপমাত্রা: আগুনের চুল্লিতে পরিণত পুরো মহাদেশ
চলতি বছরের মে মাসের শেষ থেকে আগস্টের শেষ পর্যন্ত নজিরবিহীন তাপদাহে পুরো ইউরোপ মহাদেশ যেন অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়। বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণ হতে থাকা এই মহাদেশে এবারের গ্রীষ্মকাল ছিল পশ্চিম ইউরোপের ইতিহাসে সর্বকালের সবচেয়ে উত্তপ্ত।
গবেষণায় উঠে আসা মূল পরিসংখ্যান:
তাপমাত্রার নজিরবিহীন বৃদ্ধি: গ্রীষ্মের গড় তাপমাত্রা ১৯৯১-২০২০ সালের গড় তাপমাত্রার চেয়ে প্রায় ২.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস (৫.২ ডিগ্রি ফারেনহাইট) বেশি ছিল।
চরম তাপদাহ: কিছু অঞ্চলে নির্দিষ্ট দিনে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অবিশ্বাস্যভাবে ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস (২১.৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট) পর্যন্ত বেশি রেকর্ড করা হয়।
২৬ বছরের রেকর্ড ভঙ্গ: এই প্রাণহানি বিগত ২৬ বছরের ইতিহাসের সর্বোচ্চ, যা ২০০৩ এবং ২০২২ সালের ভয়াবহ দাবদাহের ক্ষয়ক্ষতিকেও অনেক পেছনে ফেলে দিয়েছে।
বিজ্ঞানীরা ইউরোপের ৩০টি দেশের ৮৫৪টি শহরের তাপমাত্রার সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনহীন বিশ্বের সম্ভাব্য তাপমাত্রার তুলনা করে এই প্রাণহানির সংখ্যা নিরূপণ করেছেন। দক্ষিণ ও পশ্চিম ইউরোপ সবচেয়ে বেশি বিপর্যয়ের মুখে পড়লেও যুক্তরাজ্যসহ অপেক্ষাকৃত শীতল উত্তরাঞ্চলীয় দেশগুলোতেও হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।
প্রবীণদের পাশাপাশি বলির পাঁঠা তরুণরাও!
সাধারণত তাপদাহে ৮৫ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রবীণদের ঝুঁকি বেশি থাকলেও এবারের গবেষণায় এক উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে উঠেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ২০ থেকে ৪৪ বছর বয়সী অন্তত ৮০০ জন তরুণ ও যুবক সরাসরি দাবদাহজনিত কারণে মারা গেছেন। এছাড়া ৬৫ বছরের কম বয়সী হাজার হাজার মানুষ এই দুর্যোগে প্রাণ হারিয়েছেন।
ওয়ারউইক ইউনিভার্সিটির হেলথ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রাকেল নুনেস এই তাপদাহকে ‘নীরব ঘাতক’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, “দাবদাহের প্রভাব সবসময় সাথে সাথে চোখে পড়ে না, কিন্তু কম বয়সী মানুষের এমন মৃত্যু চরম উদ্বেগের বিষয়।”
তুরস্ক সম্মেলনের আগে বিশ্বনেতাদের প্রতি চরম সতর্কবার্তা
জাতিসংঘের বার্ষিক জলবায়ু সম্মেলনে যোগ দিতে বিশ্বনেতারা তুরস্কে একত্রিত হওয়ার মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে এই ভয়াবহ রিপোর্ট সামনে এলো। এর কিছুদিন আগেই জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, প্রাক-শিল্পায়ন যুগের তুলনায় বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার যে শেষ সুযোগ ছিল, তা বিশ্ব ইতোমধ্যে হারিয়ে ফেলেছে।
গবেষকরা জানান, চলতি শতাব্দীর শুরুতে তাপদাহে মৃত্যুর ৪০ শতাংশের জন্য দায়ী ছিল জীবাশ্ম জ্বালানির দূষণ, যা আজ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশে (৬৬%)। গবেষক ক্লেয়ার বার্নস স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, “যতক্ষণ না আমরা জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের অভ্যাস পুরোপুরি ত্যাগ করতে পারছি, ততক্ষণ একের পর এক আরও তীব্র ও প্রাণঘাতী গ্রীষ্মের মুখোমুখি হতে হবে আমাদের।”
এনএন/ ২৩ অক্টোবর ২০২৬
সম্পুর্ন খবরটি পড়ার জন্য এই লিঙ্কে ক্লিক করুন ::জলবায়ু পরিবর্তনের নির্মম থাবা: ইউরোপে ভয়াবহ দাবদাহে ৫০ হাজারেরও বেশি প্রাণহানি first appeared on DesheBideshe.