ভারতে ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ ঘিরে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবিতে আন্দোলন জোরালো হচ্ছে। ভারতীয় কংগ্রেস ও তরুণদের সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টিসহ (সিজেপি) বিরোধী দলগুলো এ দাবিতে সোচ্চার। তবে রাজনৈতিক চাপ কিংবা জনদাবির মুখে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে সরিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। সাংবিধানিকভাবে এ পদ থেকে কাউকে অপসারণের প্রক্রিয়া অত্যন্ত কঠোর এবং দীর্ঘ।
ভারতের সংবিধান অনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারপতিকে যেভাবে এবং যে কারণে অপসারণ করা যায়, প্রধান নির্বাচন কমিশনারকেও একই পদ্ধতিতে ও একই কারণে অপসারণ করতে হয়। এ জন্য প্রমাণিত অসদাচরণ বা অক্ষমতার ভিত্তিতে সংসদের নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। লোকসভা ও রাজ্যসভা-সংসদের উভয়কক্ষে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতায় অপসারণ প্রস্তাব পাস না হলে তাকে পদ থেকে সরানো সম্ভব নয়।
দেশটির সংবাদপত্র দ্য হিন্দুর এক প্রতিবেদনে ভারতের সংবিধান ও সংশ্লিষ্ট আইনের আলোকে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের নিয়োগ, অপসারণ এবং দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আইনি সুরক্ষার বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে।
ভারতের সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদের পঞ্চম দফায় প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট
বিধান রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতিকে অপসারণের ক্ষেত্রে যে পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়, প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণেও একই পদ্ধতি প্রযোজ্য হবে।
অর্থাৎ শুধু সরকারের সিদ্ধান্ত, রাজনৈতিক বিরোধীদের দাবি কিংবা সংসদের একটি কক্ষে প্রস্তাব পাসের মাধ্যমে তাকে অপসারণ করা যাবে না। অপসারণের জন্য লোকসভা ও রাজ্যসভা— উভয় কক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন। নির্ধারিত সংসদীয় প্রক্রিয়ায় প্রমাণিত অসদাচরণ বা অক্ষমতার ভিত্তিতে প্রস্তাব গ্রহণ করতে হবে। এরপর রাষ্ট্রপতি অপসারণের আদেশ দিতে পারবেন।
এ প্রক্রিয়ায় ১৯৬৮ সালের বিচারক (তদন্ত) আইন প্রযোজ্য। সংসদের উভয় কক্ষে প্রস্তাব পাসের ক্ষেত্রে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা যথেষ্ট নয়; সংবিধান ও সংশ্লিষ্ট আইনে নির্ধারিত বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতার শর্ত পূরণ করতে হয়।
এই কঠোর ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হলো, নির্বাহী বিভাগের চাপ কিংবা রাজনৈতিক বিরোধিতার কারণে যেন প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে সহজে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া না যায়। নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব পালনকারী সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটির স্বাধীনতা নিশ্চিত করতেই এ সুরক্ষা রাখা হয়েছে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণের নিয়ম অন্য নির্বাচন কমিশনারদের ক্ষেত্রে পুরোপুরি এক নয়। সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদের পঞ্চম দফা অনুযায়ী, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সুপারিশ ছাড়া অন্য কোনো নির্বাচন কমিশনার বা আঞ্চলিক নির্বাচন কমিশনারকে পদ থেকে অপসারণ করা যায় না।
অর্থাৎ প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণের জন্য সংসদের উভয় কক্ষে বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় প্রস্তাব পাসের যে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে, অন্য কমিশনারদের ক্ষেত্রে তা একইভাবে প্রযোজ্য নয়। তাদের অপসারণের ক্ষেত্রে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সুপারিশই সাংবিধানিকভাবে নির্ধারিত শর্ত।
ভারতের সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদে নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচন পরিচালনার তত্ত্বাবধান, নির্দেশনা ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ অনুচ্ছেদের দ্বিতীয় দফা অনুযায়ী, সংসদে প্রণীত আইনের অধীনে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্য নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ দেন।
তবে দীর্ঘদিন এ নিয়োগের পদ্ধতি নির্ধারণে কোনো আইন না থাকায় নির্বাহী বিভাগের হাতে নিয়োগের ক্ষমতা থাকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে আনুপ বারানওয়াল এ ব্যবস্থাকে অসাংবিধানিক দাবি করে জনস্বার্থে মামলা করেন। তার আবেদনে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা রক্ষায় স্বাধীন ও কলেজিয়ামধর্মী নিয়োগব্যবস্থা গড়ে তোলার নির্দেশনা চাওয়া হয়।
২০২৩ সালের মার্চে সুপ্রিমকোর্টের পাঁচ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চ আনুপ বারানওয়াল বনাম ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া মামলায় রায় দেয়। এতে বলা হয়, সংসদ আইন প্রণয়ন না করা পর্যন্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্য কমিশনারদের নিয়োগের সুপারিশ করবে তিন সদস্যের একটি কমিটি। কমিটিতে থাকবেন প্রধানমন্ত্রী, লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা এবং প্রধান বিচারপতি।
কিন্তু ওই বছরের শেষ দিকে সংসদ নতুন আইন প্রণয়ন করে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে কার্যকর হওয়া এ আইনে নিয়োগ কমিটির কাঠামো পরিবর্তন করা হয়। নতুন ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী ও লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে থাকেন প্রধানমন্ত্রীর মনোনীত কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার একজন সদস্য। ফলে নিয়োগ কমিটিতে প্রধান বিচারপতির পরিবর্তে সরকারের একজন প্রতিনিধিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এ আইনে কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠনেরও বিধান রয়েছে। কমিটি পাঁচজনের একটি তালিকা তৈরি করে নিয়োগের সুপারিশকারী কমিটির কাছে পাঠায়।
