এক দিন আগেও কেনাবেচার ব্যস্ততা, দোকানিদের হাঁকডাক আর কর্মচারীদের ছোটাছুটিতে মুখরিত ছিল পুরান ঢাকার চকবাজারের ছোট কাটারা গলি। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সেই চেনা দৃশ্য বদলে গেছে। এখানে আগুনে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া মনসুর খান প্লাজার সামনে এখন উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা আর অনিশ্চয়তা। ভবনের জানালা থেকে মাঝেমধ্যে বেরিয়ে আসছে ধোঁয়া, ভেতরের প্রচণ্ড তাপে ভেঙে পড়ছে কাচ। কোথাও পোড়া মালামালের স্তূপ, কোথাও পানি ও ধোঁয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত পণ্য। আর ভবনের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যবসায়ীদের চোখেমুখে একটাই প্রশ্ন— বহু বছরের পুঁজি, দোকানের মালামাল আর জীবিকার অবলম্বন শেষ পর্যন্ত কতটুকু রক্ষা পেল? গত সোমবার বিকালে আগুন লাগার পর গতকাল মঙ্গলবার এই দৃশ্য দেখা গেছে।
ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় সূত্র জানায়, সোমবার বিকাল ৫টা ৪ মিনিটে সাততলা মনসুর খান প্লাজার ষষ্ঠ তলার একটি গুদাম থেকে আগুনের সূত্রপাত ঘটে। আগুন ছড়িয়ে পড়ে ভবনটিতে গড়ে তোলা বিভিন্ন গুদামে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। প্রায় ১২ ঘণ্টার চেষ্টায় গতকাল মঙ্গলবার ভোর ৫টা ২০ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে নিয়ন্ত্রণে আসার পরও ভবনের ভেতরে জমে থাকা তাপ ও ধোঁয়া, পোড়া মালামালের নিচে আগুনের অবশিষ্ট অংশ এবং পুনরায় আগুন ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা পরিস্থিতিকে জটিল করে রাখে।
গতকাল দুপুরে ঘটনাস্থলের চিত্র ছিল উদ্বেগজনক। নিরাপত্তার কারণে ভবন ও আশপাশের
এলাকায় প্রবেশ সীমিত রাখা হয়। পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে ঘিরে রাখে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ। কৌতূহলী মানুষের ভিড় ঠেকানোর পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিসের কাজ নির্বিঘ্ন রাখতে নেওয়া হয় বাড়তি সতর্কতা। ভবনের আশপাশের আরও ১০ থেকে ১৫টি ভবন ও দোকান বন্ধ রাখায় ক্ষতির আশঙ্কায় পড়েছেন পাশের ব্যবসায়ীরাও।
গতকাল সকাল থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত দোকান দেখতে আসতে থাকেন মালিকরা। আগুনে কী পরিমাণ মালামাল পুড়েছে, কত টাকার ক্ষতি হয়েছে, তাৎক্ষণিকভাবে জানাতে পারেননি অনেকে। আগুন লাগার পরপরই ফায়ার সার্ভিসের কার্যক্রম শুরু হলেও তা নিয়ন্ত্রণে আনতে দীর্ঘ সময় লেগেছে। এ নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে।
ফায়ার সার্ভিস সদরদপ্তরের সহকারী পরিচালক কাজী নজমুজ্জামান জানান, মনসুর খান প্লাজার ষষ্ঠ তলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ওই তলায় বিভিন্ন পণ্যে ঠাসা একাধিক গুদাম ছিল। ষষ্ঠ তলায় ১২ থেকে ১৪টি বড় গুদাম ছিল। এর মধ্যে সাত থেকে আটটি গুদামে আগুন লেগেছিল। এসব গুদামে ছাতা, প্রসাধনী, আতরের বোতল ও বিভিন্ন ধরনের পণ্য মজুদ ছিল। পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলার পাশাপাশি সপ্তম তলাতেও গুদাম থাকায় আগুনের তাপ ও ধোঁয়ার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে ওপরের অংশে। তবে আগুনে পুরো ভবন বা পুরো বাজার পুড়ে যায়নি। সপ্তম তলায় তুলনামূলক কম ক্ষতি হয়েছে। তিনি জানান, আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পরও ক্ষতিগ্রস্ত গুদাম থেকে মালামাল সরানো, পানি দেওয়া এবং বিভিন্ন অংশ পরীক্ষা করার কাজ চলছে। কারণ পোড়া মালামালের নিচে তাপ থেকে গেলে আবার আগুন জ্বলে উঠতে পারে।
বেগ পেতে হয় ফায়ার সার্ভিসকে : আগুন নিয়ন্ত্রণের অভিযানে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যদের ঝুঁকি ছিল চোখে পড়ার মতো। ভবনের ভেতরে জমে থাকা ঘন ধোঁয়া, প্রচণ্ড তাপ, সরু সিঁড়ি এবং গুদামের তালাবদ্ধ দরজা তাদের কাজকে আরও কঠিন করে তোলে।
ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া সেলের কর্মকর্তা আনোয়ারুল ইসলাম দোলন জানান, ষষ্ঠ ও সপ্তম তলার ধোঁয়া বের হওয়ার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় ভেতরে কাজ করতে গিয়ে সদস্যদের শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। প্রচণ্ড তাপের কারণে একটানা দীর্ঘ সময় কাজ করাও সম্ভব হচ্ছিল না। সে কারণে পর্যায়ক্রমে সদস্য বদল করে অভিযান চালানো হয়। একজন সদস্য ১৫ থেকে ২০ মিনিট কাজ করার পর তাকে সরিয়ে অন্য সদস্যকে পাঠানো হয়েছে। এভাবে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ জনবল নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজে অংশ নেয়। আগুন নেভাতে গিয়ে ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে পড়েন ফায়ার সার্ভিসের চার সদস্য। তারা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
অগ্নিকাণ্ডের কারণ ও নিয়ন্ত্রণে প্রতিবন্ধকতা : ফায়ার সার্ভিসের কাজী নজমুজ্জামান জানান, চকবাজারের সরু গলি ও ব্যস্ত সড়কে যানজটের কারণে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে সময় লেগেছে। এ ছাড়া গুদামগুলোর শাটার ও দরজা তালাবদ্ধ থাকায় ভেতরে প্রবেশ করতে বাধা তৈরি হয়। ভবনের ভেতরে গাদাগাদি করে মালামাল রাখায় তাপ আটকে যায় এবং আগুনের অবশিষ্ট অংশ খুঁজে বের করা কঠিন হয়ে পড়ে। আশপাশের পানির রিজার্ভ শেষ হয়ে আসায় পাম্প ও রিজার্ভার পরিবর্তন করে অন্য রিজার্ভার থেকে পানি নিয়ে আগুন নেভানোর কাজ চালাতে হয়েছে। এতে অভিযানের জটিলতা আরও বেড়েছে। তিনি বলেন, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে তদন্তের আগে কোনো কারণকে চূড়ান্ত বলা সম্ভব নয়। এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন প্রক্রিয়াধীন।
ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের ক্ষোভ ও হতাশা : ভবনের নিচতলার ব্যাগের দোকানের মালিক মো. ইমতিয়াজ আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের কার্যক্রম নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তার অভিযোগ, আগুন লাগার পর দীর্ঘ সময় ধোঁয়া বের হলেও পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হয়নি। দোকান বন্ধ থাকায় ব্যবসায়িক ক্ষতির মুখেও পড়েছেন তিনি। তার মতে, দ্রুত স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা না গেলে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি আশপাশের দোকানিদেরও বড় লোকসান হবে।
গুদামমালিক মো. রবিন জানান, ভবনের ষষ্ঠ তলার ডান পাশে তার গুদাম রয়েছে। সেখানে প্রায় ৪০ লাখ টাকার ব্যাগ ছিল। আগুনের পর থেকে ভেতরে প্রবেশ করতে না পারায় মালামালের কতটা পুড়েছে বা নষ্ট হয়েছে, তা নিশ্চিত হতে পারছেন না তিনি। সব মালামাল পুড়ে গেলে তার পক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন। ভবনের পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম তলায় ব্যাগ ও প্রসাধনীর গুদাম রয়েছে। প্রতিটি গুদামে ২০ থেকে ৪০ লাখ টাকার মালামাল থাকতে পারে বলে কয়েকজন ব্যবসায়ী জানিয়েছেন।
