Published on
:
3 min read
পার্থময় চট্টোপাধ্যায়
‘মেঘ পিয়নের ব্যাগের ভেতর/ মন খারাপের দিস্তা, মন খারাপ হলে কুয়াশা হয়/ ব্যাকুল হলে তিস্তা’
করোনেশন ব্রিজ পেরিয়ে কালিঝোরা হয়ে তিস্তা গেট পার করে যখন পাহাড়ের দিকে উঠতে শুরু করলাম, তখন চোখের সামনে যেন ভেসে উঠছিল তিতলি ছবির ঋতুপর্ণ ঘোষের লেখা আর শ্রীকান্ত আচার্যের কণ্ঠে গাওয়া সেই গানটির প্রতিটি শব্দ।
চলেছি কালিম্পং জেলার খাসমহল অঞ্চলের ইয়ং মাকুম। পাহাড়ের বুকের এমন এক বাহারি গ্রাম, যেখানে মনে হয় মেঘ পিওনেরও যেন একটা নিজস্ব পোস্ট অফিস আছে। কালিম্পংয়ের পাহাড়ে এমন কিছু জায়গা আছে, যেখানে পৌঁছলে মনে হয়—মানচিত্রের কোনও বিন্দুতে নয়, বরং সময়ের বাইরে এসে দাঁড়িয়েছি। ইয়ং মাকুম তেমনই এক পাহাড়ি ঠিকানা।
কালিম্পং শহরের পরিচিত কোলাহল থেকে অনেকটা দূরে এই পাহাড়ি গ্রাম। পানবুধারা হয়ে যত এগোতে থাকবেন, ততই চোখের সামনে খুলে যাবে তিস্তার কুয়াশা-ঢাকা রূপ। অদ্ভুত সুন্দর সেই দৃশ্য। আর যত উপরের দিকে উঠবেন, পাহাড় তত নিজের মুখ বদলাতে থাকবে। রাস্তা সরু হবে, গাড়ির শব্দ কমে আসবে, আর চারপাশে জেগে উঠবে সবুজের অসংখ্য স্তর।
দূরের পাহাড়ের গায়ে ছড়িয়ে থাকা ছোট ছোট ঘর, কোথাও প্রার্থনার পতাকা, কোথাও ঝরনার শব্দ—সব মিলিয়ে পথটা যেন প্রকৃতির সৌন্দর্যের এক অদৃশ্য খনি। কাকে ছেড়ে কাকে দেখব—এই দ্বিধার মধ্যেই একসময়ে পৌঁছে যাবেন ইয়ং মাকুমে। পাহাড়ের কাঁধে বসে থাকা এক টুকরো জমির উপর দাঁড়িয়ে আছে মঞ্জুশ্রী—নিঃশব্দে নিজের গল্প নিয়ে।
ইয়ং মাকুমের সকাল অন্যরকম। সূর্য ওঠার আগেই কাছের পাহাড়ের গায়ে এসে বসে মেঘ। তারপর ধীরে ধীরে রাতের কালো চাদর সরিয়ে স্লিপিং বুদ্ধ তার রঙ বদলাতে শুরু করে— প্রথমে লাল, তারপর হলুদ, আর শেষে সাদা। যেন পাহাড় নিজেই ধীরে ধীরে জেগে উঠছে।
কিন্তু ইয়ং মাকুমের আসল গল্প তার প্রকৃতিতে নয়, তার মানুষগুলোর জীবনে। পাহাড়ের ঢালে যাঁরা বসবাস করেন, তাঁদের কাছে এই পাহাড় শুধু সৌন্দর্য নয়—এটাই তাঁদের ঘর, জীবিকা, স্মৃতি এবং ভবিষ্যৎ। ভোরে কেউ বেরিয়ে যান জমির কাজে, কেউ পশুপালনের দিকে, কেউ বা দূরের বাজারের পথে। শহরের মানুষ যে পাহাড়কে ছবি হিসেবে দেখে, তাঁদের কাছে সেই পাহাড়ই প্রতিদিনের জীবন।
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪২০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত ছোট্ট এই পাহাড়ি গ্রাম প্রকৃতির মায়াজালে আবদ্ধ। কাঞ্চনজঙ্ঘা যেন এই রূপসী কন্যাকে একটু বেশিই ভালোবাসে—তাই তো সারাক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থাকে।
পর্যটকদের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইয়ং মাকুমে তৈরি হয়েছে বেশ কয়েকটি হোমস্টে। তার মধ্যে ‘মঞ্জুশ্রী ধিম’ যেন পাহাড়ের মাথায় তৈরি এক টুকরো স্বর্গ। ‘ধিম’ কথার অর্থ লামা ভাষায় বাড়ি। তবে এই বাড়ি যেন একটু অন্যরকম—পাহাড়ের সঙ্গে মিশে থাকা এক শান্ত আশ্রয়। বিশাল চাতাল নিয়ে পাহাড়ের মাথায় দাঁড়িয়ে থাকা এই ১২ ঘরের ধিমে সকাল আসে সূর্যের স্পর্শে, ঘুম ভাঙে পাখির কলরবে।
সারাদিন কাঞ্চনজঙ্ঘার হাসি যেন কানে বাজতে থাকে। বিকেলে আকাশজুড়ে শুরু হয় রঙের খেলা। সন্ধ্যায় দূরের পাহাড়ে একে একে জ্বলে ওঠে সন্ধ্যা প্রদীপের মতো আলো। আর রাত নামলে তারাদের নরম আলো আর পাহাড়ি শীতলতার স্পর্শে কখন যে ঘুমের দেশে ভেসে যাবেন, টেরই পাবেন না। এই তো ইয়ং মাকুম। এখান থেকে শুধু কাঞ্চনজঙ্ঘা নয়, চোখ মেললেই দেখা যায় প্রত্যন্ত ডুয়ার্স এবং তরাইয়ের বিস্তীর্ণ অঞ্চল।
ইয়ং মাকুম থেকে সহজেই যাওয়া যায় সামথার, পারুঙ, কাফেরগাঁও, কালিম্পং। পাশাপাশি লাভা, লোলেগাঁও, রিশপ, পেডংও ঘুরে নেওয়া যায়। আর একটু বড় রুট করতে চাইলে কোলাখাম বা ঝান্ডি হয়ে গরুবাথান দিয়ে নেমে আসা যায় মালবাজারের দিকে।
কী ভাবে যাবেন?
নিউ মাল থেকে দূরত্ব আনুমানিক ৪৫ কিলোমিটার। শিলিগুড়ি থেকে প্রায় ৪২ কিলোমিটার এবং নিউ জলপাইগুড়ি থেকে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার। সেবক, করোনেশন ব্রিজ হয়ে কালিঝোরার পথে যেতে হয়। কালিঝোরা থেকে পামবুধরা হয়ে আনুমানিক সাড়ে ১৩ কিলোমিটার পথ পেরোলেই ইয়ং মাকুম।
কোথায় থাকবেন?
রাস্তা বেশ ভালো। মসৃণ কালো পিচের পাহাড়ি রাস্তা, চারপাশে নিস্তব্ধতা—গাড়ি চালাতেও বেশ আনন্দ। এনজেপি অথবা নিউ মাল থেকে গাড়ি ভাড়া আনুমানিক ৩,০০০ টাকা। এখানে থাকার জন্য হোমস্টে পাবেন। থাকা-খাওয়ার খরচ প্রায় ১,৬০০ টাকা।
FAQ
১. ইয়ং মাকুম কোথায় অবস্থিত?
ইয়ং মাকুম কালিম্পং জেলার খাসমহল অঞ্চলের একটি ছোট পাহাড়ি গ্রাম।
২. ইয়ং মাকুম থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়?
হ্যাঁ, আকাশ পরিষ্কার থাকলে এখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার মনোরম দৃশ্য দেখা যায়।
৩. ইয়ং মাকুম কী ভাবে যাবেন?
সেবক ও করোনেশন ব্রিজ হয়ে কালিঝোরা, তারপর পামবুধরা দিয়ে গাড়িতে ইয়ং মাকুম পৌঁছনো যায়।
৪. ইয়ং মাকুমে কোথায় থাকা যায়?
‘মঞ্জুশ্রী ধিম’-সহ স্থানীয় বিভিন্ন হোমস্টেতে থাকার ব্যবস্থা রয়েছে।
৫. ইয়ং মাকুমের কাছাকাছি কোথায় ঘুরতে যাওয়া যায়?
সামথার, পারুঙ, কাফেরগাঁও, লাভা, লোলেগাঁও, রিশপ ও পেডং ঘুরে দেখতে পারেন।
