আনন্দ, উচ্ছ্বাস আর বিদায়ের করুণ সুরের মধ্য দিয়ে গতকাল বুধবার শেষ হয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। এদিন সন্ধ্যায় প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে মর্ত্যলোক থেকে বিদায় নিয়েছেন দেবী দুর্গা।
পূজার আনুষ্ঠানিকতা অনুযায়ী, গতকাল বুধবার সকালে দর্পণ বিসর্জনের মাধ্যমে দেবীকে বিদায় জানান ভক্তরা। পরে সন্ধ্যা থেকে শুরু হয় প্রতিমা বিসর্জন। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, মানুষের মনের কাম, ক্রোধ, হিংসা ও লালসার মতো আসুরিক প্রবৃত্তি বিসর্জন
দেওয়াই বিজয়া দশমীর মূল তাৎপর্য। এসব প্রবৃত্তি ত্যাগ করে পরস্পরের সঙ্গে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা করাই এ আয়োজনের প্রধান উদ্দেশ্য।
গতকাল ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে সকাল ৭টায় দশমীর বিহিত পূজা শুরু হয়। সকাল ৯টায় দর্পণ বিসর্জনের মাধ্যমে পূজার শাস্ত্রীয় সমাপ্তি ঘটে। এরপর বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত চলে বিজয়া দশমীর অন্যতম প্রধান আকর্ষণ সিঁদুর খেলা। স্বামীর দীর্ঘায়ু ও কল্যাণ কামনায় সধবা নারীরা দেবীর চরণে সিঁদুর নিবেদন করেন। এরপর তারা একে অপরের কপালে ও গালে সিঁদুর মেখে উল্লাসে মেতে ওঠেন।
বিজয়া দশমী উপলক্ষে বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে হিন্দু সম্প্রদায়ের শুভেচ্ছা বিনিময়ের আয়োজন করা হয়। সেখানে ঢাকেশ্বরী মন্দিরের পূজা কমিটির প্রায় ১০০ সদস্য অংশগ্রহণ করেন।
মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক শুভাশিষ কুমার বিশ্বাস সাধন বলেন, আমাদের মধ্যে যে সম্প্রীতির বন্ধন গড়ে উঠেছে, তা ধরে রাখতে চাই। এ বন্ধনকে ধারণ করেই সামনের দিনে সৌহার্দ ও সম্প্রীতির বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে চাই।
পূজা দেখতে আসা সীমা রানী পাল বলেন, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি মুসলিম সহকর্মী ও তাদের সন্তানদেরও রাতে পূজা দেখতে আসতে দেখা যায়। এ কারণে শহরে সম্প্রীতির মেলবন্ধনটা বেশি।
গত ১৬ অক্টোবর ষষ্ঠী তিথিতে চণ্ডীপাঠ, বোধন ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে ‘আনন্দময়ীর’ আগমনে শারদীয় দুর্গোৎসবের সূচনা হয়।
এর আগে গতকাল দুপুরে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ ও মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটির যৌথ উদ্যোগে বের হয় বর্ণাঢ্য বিজয়া শোভাযাত্রা। শোভাযাত্রা ও বিসর্জনে অংশ নিতে দুপুরের পর থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন মণ্ডপ থেকে ট্রাকে করে প্রতিমা নিয়ে ভক্তরা পলাশীর মোড়ে জড়ো হতে থাকেন। পরে শত শত ট্রাকে প্রতিমা নিয়ে শোভাযাত্রাটি সদরঘাটের উদ্দেশে রওনা দেয়। ঢাকেশ্বরী থেকে শুরু হয়ে এই প্রতিমা যাত্রাটি শহীদ মিনার, হাইকোর্ট, পুলিশ সদর দপ্তর, গোলাপ শাহ মাজার ও হাইকোর্ট এলাকা ঘুরে সদরঘাটে পৌঁছায়। এ সময় রাস্তার দুই পাশে দর্শনার্থীদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। সড়ক ও আশপাশের ভবনে সতর্ক অবস্থানে ছিল পুলিশ।
ঢাকের বাদ্য আর বিদায়ের করুণ ছায়ায় সারিবদ্ধভাবে একে একে বুড়িগঙ্গা নদীতে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। একই সময়ে তুরাগ নদীতেও চলে বিসর্জন। বিসর্জন ঘিরে সব ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সড়কে পুলিশ ও নদীতে নৌপুলিশ টহল দেয়। দায়িত্ব পালন করে ফায়ার সার্ভিসের টিমও।
তবে দেশের অধিকাংশ মণ্ডপের প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হলেও ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের প্রতিমাটি রেখে দেওয়া হয়। সেখানে কেবল পূজার কাজে ব্যবহৃত দেবীর ফুল, বেলপাতা ও ঘট বিসর্জন দেওয়া হয়।
এ বছর ঢাকা মহানগরে ২৫৮টিসহ সারা দেশে ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন মণ্ডপের প্রতিমা বিসর্জনের জন্য বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদের মোট ১১টি ঘাট নির্ধারণ করা হয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা ও সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতায় এবার নির্বিঘ্নে দুর্গাপূজা উদযাপিত হয়েছে।
কক্সবাজার প্রতিনিধি জানিয়েছেন, দেশি-বিদেশি হাজার হাজার পর্যটক ও ভক্তদের উপস্থিতি কক্সবাজার সৈকতে হয়ে গেল দেশের সর্ববৃহৎ বিসর্জন অনুষ্ঠান। এ বিসর্জন অনুষ্ঠান দেখতে দীর্ঘ পূজার টানা ছুটিতে পর্যটকের ঢল নামে কক্সবাজারে। বিসর্জন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ভূমি প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর হেলাল উদ্দিন।
ভক্ত ও পূজারিরা প্রতিমা বিসর্জন দিয়ে বাংলাদেশসহ বিশ্বে ?শান্তির জন্য প্রার্থনা করেন দেবীর কাছে। বিসর্জন ও টানা ছুটির কারণে কক্সবাজারে বিপুলসংখ্যক পর্যটকের সমাগম ঘটায় জমে ওঠে পর্যটন। পর্যটক ও ভক্তদের জন্য নেওয়া হয় বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
সনাতন সম্প্রদায়ের সর্ববৃহ ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা উপলক্ষে চলছে টানা ছুটি। এই ছুটিতে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আগমন ঘটে কক্সবাজারে। সেই সঙ্গে বুধবার বিকালে কক্সবাজার সৈকতের লাবণী পয়েন্টে বসে প্রতিমা বিসর্জন উপলক্ষে নানা ধর্ম-বর্ণ মানুষের মিলনমেলা। দুপুরের পর থেকে কক্সবাজার শহর ও আশপাশের এলাকা থেকে একে একে প্রতিমাবোঝাই ট্রাকগুলো আসতে থাকে লাবণী পয়েন্টের দিকে।
প্রতিমা বিসর্জন উপলক্ষে সৈকতের লাবণী পয়েন্টের উন্মুক্ত মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় বিসর্জন অনুষ্ঠান। এখানে প্রধান অতিথি হিসেবে ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর হেলাল উদ্দিন বলেন, বাংলাদেশ সম্প্রীতির দেশ, এখানে সবাই বাংলাদেশি। সবাই যার যার মর্যাদা নিয়ে এদেশে বসবাস করছে। আমরা সবাই বাংলাদেশি।
কক্সবাজার জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি উদয় শংকর পাল মিঠু এতে সভাপতিত্ব করেন।
টানা ছুটিতে কক্সবাজার সৈকতে ঘুরতে আসা বগুড়ার পর্যটক রহিমা আফরোজ বলেন, পূজার ছুটিতে পরিবার নিয়ে ঘুরতে এসেছি কক্সবাজারে। আজকের (গতকাল) এই দিনে দুর্গা বিসর্জনের অনুষ্ঠানটি দেখে খুবই ভালো লাগছে। নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা পর্যটক সুমন, কলিম, পায়েল বলেন, এই বিসর্জনে দেখলাম সব ধর্ম-বর্ণ মানুষের মিলনমেলা। পর্যটকদের জন্য একটি বাড়তি পাওয়া বিসর্জন অনুষ্ঠান।
বিসর্জন উপলক্ষে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের লাবণীর পয়েন্ট বিকালের পর থেকে লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়।
বিকাল ৫টার পর একে একে প্রতিমাগুলো সৈকতে নিয়ে নিরঞ্জন দেওয়া শুরু হয়। অব্যাহত ছিল সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত।
কক্সবাজার জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি উদয় শংকর পাল মিঠু বলেন, এবারে কক্সবাজার শহর ও আশপাশের এলাকার ৫১টি মণ্ডপের ২০৫টি প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমান বলেন, পূজার ছুটি ও বিসর্জন উপলক্ষে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। প্রতিটি প্রতিমাকে নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে সৈকতেই বিসর্জনের জন্য আনা হয়।
ফেনী প্রতিনিধি জানিয়েছেন, উলুধ্বনি, শাঁখ আর ঢাকের বাদ্যে মুখরিত ফেনীর কালিপাল দশমী ঘাট। মঙ্গলধ্বনির সঙ্গে থেকে থেকে শোনা যাচ্ছে হাজার মানুষের আহ্বান ‘আসছে বছর আবার হবে, মা তুমি আবার এসো’। বিজয়া দশমী উপলক্ষে গতকাল আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাহবুবউল করিম।
ফেনী জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট সমীর করের সভাপতিত্বে এ সময় বক্তব্য দেন ফেনী জেলা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি শুকদেব নাথ তপন, ফেনী জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক শান্তি রঞ্জন চৌধুরী, ফেনী সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুলতানা নাসরিন কান্তা।
গতকাল বিকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পুরো ফেনীর কালী পালের দশমী ঘাট যেন এক মহা উৎসবে রূপ নেয়। এর আগে ‘ধান-দূর্বার দিব্যি, মা তুমি আবার এসো’...বাঙালি হিন্দু ভক্ত কণ্ঠের এমন আকুতির ভেতর প্রতিমা বিসর্জনে বিদায় হলো দেবী দুর্গার। শান্তিজল গ্রহণে আড়ম্বরেই শেষ হলো বাঙালি হিন্দুদের সাংবাৎসরিক সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। ছয় দিনব্যাপী দুর্গোৎসবের দশমীতে বুধরার মণ্ডপে মণ্ডপে বিহিতপূজার মধ্য দিয়ে ঘটে সমাপ্তি। অতঃপর দেবীর বিসর্জন আর শান্তিজল গ্রহণ।
এ বছর জেলায় ১৫৩টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। ফেনী জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট সমীর কর বলেন, মা দেবী দুর্গা যেন অশুভ শক্তির বিনাশ করে সবাইকে ভালো রাখেন। পাশাপাশি তিনি যেন দুষ্টের দমন ও শিষ্টের লালনের মধ্যদিয়ে পুরো পৃথিবীকে আলোকিত করেন— এমনটাই আমার প্রার্থনা।
চট্টগ্রাম ব্যুরো জানিয়েছেন, দেবী দুর্গার প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। গতকাল বিকালে চট্টগ্রাম নগরের পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত, ফিরিঙ্গিবাজারের অভয়মিত্র ঘাট, কালুরঘাট ও উত্তর কাট্টলীর রানী রাসমণি ঘাটসহ বিভিন্ন স্থানে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। এ ছাড়া জেলার বিভিন্ন উপজেলায় নদী, সমুদ্র উপকূল ও জলাশয়ে প্রতিমা বিসর্জন দেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা।
প্রতিমা বিসর্জন উপলক্ষে এদিন পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে মানুষের ঢল নামে। নগরের বিভিন্ন পূজামণ্ডপ থেকে ট্রাকে করে প্রতিমা নিয়ে আসেন ভক্তরা। বিসর্জন দেখতে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষও সৈকতে ভিড় করেন। ঢোল ও বাঁশির বাদ্যে উৎসবমুখর পরিবেশে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানান তারা।
বিকাল ৩টায় পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে প্রতিমা বিসর্জন অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। এ সময় ভক্তরা বিভিন্ন ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নেন। এর আগে রীতি অনুযায়ী, সকালে বিভিন্ন পূজামণ্ডপে সিঁদুর খেলা হয়। পরে তেল, সিঁদুর, পান-চিনি ও অশ্রুসজল চোখে দেবীকে বিদায় জানান ভক্তরা।
পতেঙ্গা থানার ওসি মো. পারভেজ বলেন, শান্তিপূর্ণভাবে সাগরে প্রতিমা বিসর্জন দিয়েছেন হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা। নির্বিঘ্নে বিসর্জন কার্যক্রম সম্পন্ন করতে সৈকত ও আশপাশের এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল।
ষষ্ঠী তিথিতে দেবীর বন্দনার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয় বিজয়া দশমীতে। তিথির কারণে এবার মহানবমীর পূজার পরই দশমীর বিহিত পূজা ও দর্পণ বিসর্জন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর বিভিন্ন মণ্ডপ থেকে প্রতিমা নিয়ে বিসর্জনস্থলে যান ভক্তরা।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর চট্টগ্রাম মহানগর ও ১৫ উপজেলায় মোট ২ হাজার ৫৬৮টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে মহানগরে ২৯৪টি মণ্ডপ ছিল। জেলা পর্যায়ে ১ হাজার ৬৫৫টি প্রতিমা পূজা এবং ৬১৯টি ঘটপূজা অনুষ্ঠিত হয়। এ বছর চট্টগ্রামে নতুন করে প্রায় ৪০০টি পূজামণ্ডপ যুক্ত হয়েছিল।
