ভয়াবহ সহিংসতার পর পরিস্থিতি সামাল দিতে কারফিউ জারি করছে ফ্রান্স
-
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: - আপডেট সময় ০৯:০৩:৩৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬
লিমোজেসের ১৯ শতকের ঐতিহাসিক সিটি হলের এখন কেবল ভেঙে পড়া কাচ আর হাউসম্যানিয়ান ছাদের কঙ্কালসার কাঠামোই অবশিষ্ট রয়েছে। সপ্তাহান্তে ফ্রান্স জুড়ে ছড়িয়ে পড়া দাঙ্গা ও লুটপাটের শিকার হওয়া শহরগুলোর মধ্যে এই শহরটি অন্যতম, যা দেশকে বছরের পর বছর ধরে চলা অন্যতম ভয়াবহ সহিংসতার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
লিমোজেস শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত উঁচু চূড়াটি অবশেষে আগুনে ছাই হয়ে ধসে পড়ে, যা নিচে থাকা জনতাকে উল্লাসে মেতে উঠতে বাধ্য করে এবং সেই দৃশ্য ভিডিয়োয় ধারণ করা হয়। অন্যদিকে প্যারিসে আইকনিক পর্যটন কেন্দ্র ‘লুভ মিউজিয়াম’ বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়, কারণ আন্দোলনকারীরা সেখানে অবরোধের ডাক দিয়েছিল।
প্রধান প্রধান শহরগুলোতে পরিস্থিতি ‘নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে’ বলে স্বীকার করেছে কর্তৃপক্ষ। সোমবার তারা জানায়, শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্যে কিছু শহরে সান্ধ্য আইন (কারফিউ) জারি করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর জরাজীর্ণ অবস্থার প্রতিবাদে বেশ কয়েক দিন ধরে চলা শান্তিপূর্ণ সরকারবিরোধী আন্দোলনের পরপরই এই অস্থিরতার সূচনা হয়। কিন্তু সপ্তাহান্তে ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরের রাজপথে এই বিক্ষোভ সহিংসতায় রূপ নেয়। প্রায়শই মুখ ঢেকে আসা দাঙ্গাবাজরা দোকানপাট লুটপাট করে এবং গাড়ি ও সরকারি ভবনে আগুন ধরিয়ে দিয়ে পুলিশের সাথে সংঘর্ষে জড়ায়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ফ্রান্সজুড়ে পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষ এই বিক্ষোভে অংশ নেয় এবং প্রায় ২,৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রায় ১,০০০ পুলিশ সদস্য ও অগ্নিনির্বাপক কর্মী আহত হয়েছেন।
প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এই সহিংসতার জন্য সুদূর-বামপন্থী চরমপন্থা গোষ্ঠীর দুষ্কৃতকারীদের দায়ী করেছেন। রবিবার টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে তিনি বলেন, “এই ছবিগুলো দেখে আমরা সবাই ভাবছিলাম, ফরাসি জনগণ কীভাবে ফ্রান্সের সাথে এমনটা করতে পারে? এর কোনো ব্যাখ্যা বা অজুহাত হতে পারে না; কিছুই এই আচরণকে সমর্থন করে না।ম্যাক্রোঁ আরও যোগ করেন, “যারা প্রজাতন্ত্রকে ধ্বংস করার চেষ্টা করেছে, তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে।”
ম্যাক্রোঁর মধ্যপন্থী সরকার, যার মেয়াদের মাত্র শেষ কয়েকমাস বাকি আছে, তা এক গভীর সংকটের মুখোমুখি। এটি আগামী বছর কট্টর ডানপন্থীদের ক্ষমতায় আসার পথ সুগম করতে পারে। ইউরো অঞ্চলের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ ছাড়ার সময় ম্যাক্রোঁর পেছনে থেকে যাবে পাহাড়সম ঋণ, থমকে যাওয়া প্রবৃদ্ধি এবং গভীর সামাজিক অসন্তোষ।
গত রবিবার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ পরিষ্কার হতেই রাজনৈতিক দলগুলো সহিংসতার জন্য একে অপরকে দোষারোপ করতে শুরু করে। ম্যাক্রোঁর মধ্যপন্থী সরকার উগ্র-বামপন্থীদের ওপর দায় চাপালেও, প্রধান উগ্র-বামপন্থী প্রার্থী জঁ-লুক মেলেনশঁ বর্তমান সরকারকেই দায়ী করেছেন। অন্যদিকে আগামী এপ্রিলে হতে যাওয়া নির্বাচনে জনমত জরিপে এগিয়ে থাকা কট্টর ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী মারিন ল্য পেন রবিবার ম্যাক্রোঁ সরকারকে “শ্রান্ত, দিকভ্রান্ত এবং নিজেদের অক্ষমতার কথা মন্তব্য করা ছাড়া আর কিছুই করতে অপারগ” বলে মন্তব্য করেন।
ডানপন্থী কিছু রাজনৈতিক নেতার জরুরি অবস্থা জারির দাবি সত্ত্বেও ম্যাক্রোঁ তা করা থেকে বিরত থাকেন। তবে দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দর নগরী মার্সেইসহ কয়েকটি শহর সোমবারে জনসমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। সোমবার সরকারের এক সংকটকালীন বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান ল্যাকোরনু জানান, তিনি কিছু স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে সান্ধ্য আইন (কারফিউ) কার্যকর করার নির্দেশ দিয়েছেন।
প্যারিসের প্লেস দে লা রিপাবলিক-এ পুলিশের সাথে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ চলতেই থাকে। তবে ক্ষতির পরিমাণ কেবল রাজধানীতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, পুরো ফ্রান্সে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল।
যদিও প্রতিবাদ ও আন্দোলন ফরাসি সমাজের একটি অংশ, তবুও সপ্তাহান্তের মতো এতটা সহিংস রূপ সাধারণত দেখা যায় না। সিরামিকের জন্য বিখ্যাত কেন্দ্রস্থলের লিমোজেস শহরের সিটি হল আগুনে পুড়ে ছাই হতে দেখা অনেকের কাছেই সরাসরি রাষ্ট্রের ওপর আক্রমণ বলে মনে হয়েছে।শহরের মেয়র গিয়োম গুইরিন রবিবার এক এক্স (টুইটার) পোস্টে লেখেন, “সিটি হলের ওপর আক্রমণ মানে খোদ প্রজাতন্ত্রের ওপর হামলা।”
দক্ষিণ-পূর্বের শহর লিওঁতে একটি পর্যটন কার্যালয় জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। এনবিসি নিউজ কর্তৃক যাচাইকৃত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিডিওতে দেখা গেছে, বরদোর সিটি হলের কাছের কেনাকাটার রাস্তার কিছু দোকানের সামনের অংশ ধ্বংস করা হয়েছে এবং ভেতরের মালামাল লুট করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ রবিবার জানান, মার্সেই, লিল এবং অ্যাঞ্জারসের সিটি হলগুলোতে ভাঙচুর চালানো হয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের সাথে শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক আন্দোলনের তেমন কোনো সম্পর্ক নেই।প্রধান শহরগুলোতে কর্তৃপক্ষ “নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে” বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্বীকার করে প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁর কাছে নিজের পদত্যাগপত্র পেশ করেন, তবে ম্যাক্রোঁ তা প্রত্যাখ্যান করেন।
এদিকে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রবিবার তাঁর নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ লিখেছেন, “ফ্রান্স জ্বলছে!” এবং এই সহিংসতার জন্য অভিবাসনকে দায়ী করেছেন। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এক্স-এ লিখেছেন, এই আন্দোলন আমেরিকানদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। ভ্যান্স আরও বলেন, “ডেমোক্র্যাটরা আপনার দেশের জন্য এমন ভবিষ্যৎ-ই তৈরি করতে চায়।”
তবে ফরাসি কর্মকর্তারা এই আন্দোলনের জন্য অভিবাসীদের দায়ী করেননি। ম্যাক্রোঁ সাধারণ মানুষের যৌক্তিক উদ্বেগের কথা স্বীকার করলেও সহিংসতার জন্য কেবল উগ্র-বামপন্থীদেরই দায়ী করেছেন। মূলত অবকাঠামোগত অচলাবস্থা ও শিক্ষক সংকটের প্রতিবাদে গত মাসে উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রথম রাজপথে নেমেছিল। কিন্তু পুলিশ টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে তাদের আন্দোলন দমনের চেষ্টা চালায়।
পরবর্তী সপ্তাহগুলোতে শিক্ষার্থীদের সাথে বিভিন্ন শ্রমিক ইউনিয়ন ও কৃষকরা যোগ দেয়। তারা জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং মূলত ইরান যুদ্ধের কারণে লাফিয়ে বাড়া জ্বালানির দাম কমানোসহ একাধিক দাবির পক্ষে সরব হয়।উল্লেখ যোগ্য বিষয় হলো, বর্তমানে স্পেন, পর্তুগাল এবং আলবেনিয়ার শিক্ষার্থীরাও শিক্ষার উন্নত পরিবেশের দাবিতে রাজপথে আন্দোলনে নেমেছে, যার সাথে ফরাসি শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনের বেশ মিল রয়েছে।
ট্যাগস :
