জাতীয় ক্রিকেট লিগের (এনসিএল) তৃতীয় রাউন্ডে আজ তৃতীয় দিনটা যেন ব্যাটারদের দখলে। কোথাও প্রথম শ্রেণির ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরিকেই ডাবল সেঞ্চুরিতে রূপ দিয়েছেন তরুণ ব্যাটার, কোথাও শেষ উইকেটে প্রায় একাই লড়াই করে দলকে এনে দিয়েছেন গুরুত্বপূর্ণ লিড। রাজশাহীর নাঈম আহমেদ ও খুলনার আজিজুল হাকিমের ব্যাটে রাঙানো দিনে সেঞ্চুরি পেয়েছেন ঢাকার মোহাম্মদ নাঈম শেখও। আবার সেঞ্চুরির খুব কাছে গিয়েও আক্ষেপ নিয়ে ফিরেছেন জাওয়াদ আবরার ও তাইবুর রহমান।
রাজশাহীতে নাঈম আহমেদের ব্যাটিং ছিল দিনের অন্যতম বড় আকর্ষণ। আগের দিনই প্রথম শ্রেণির ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরি তুলে নিয়েছিলেন ২১ বছর বয়সী এই ব্যাটার। তৃতীয় দিন সকালে কামরুল ইসলাম রাব্বীর বলে বাউন্ডারি মেরে সেই ইনিংসকে নিয়ে যান ডাবল সেঞ্চুরিতে। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে বাংলাদেশের পঞ্চম ব্যাটসম্যান হিসেবে নিজের প্রথম সেঞ্চুরিকেই ডাবল সেঞ্চুরিতে রূপ দিলেন তিনি।
২৬৭ বলে ২৬ চার ও এক ছক্কায় ২০২ রানে অপরাজিত থাকেন নাঈম। তার দুর্দান্ত ইনিংসের ওপর ভর করে ৭ উইকেটে ৪৫৭ রান তুলে ইনিংস ঘোষণা করে রাজশাহী। প্রথম ইনিংসে ২২৯ রান করা বরিশাল দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে পাল্টা আক্রমণের পথ বেছে নেয়।
সেখানে আলো ছড়ান তরুণ ওপেনার জাওয়াদ আবরার। মাত্র ২২ বলে ফিফটি তুলে নিয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে বাংলাদেশের ব্যাটারদের মধ্যে দ্রুততম অর্ধশতকের রেকর্ড গড়েন তিনি। এর আগে ২০১৪-১৫ মৌসুমে জাতীয় লিগে ২৪ বলে ফিফটি করেছিলেন জিয়াউর রহমান। জাওয়াদের আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ে সেঞ্চুরির সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ৯৪ বলে ৯১ রানে থেমে যায় তার ইনিংস। ৯টি চার ও ৪টি ছক্কায় সাজানো ইনিংসটির পরও সেঞ্চুরি না পাওয়ার আক্ষেপ থেকে গেছে। দিন শেষে বরিশালের সংগ্রহ ৫ উইকেটে ২৪৯ রান। রাজশাহীর চেয়ে তারা এগিয়ে ২১ রানে।
সিলেটে দিনের সবচেয়ে নাটকীয় ইনিংসটি উপহার দিয়েছেন আজিজুল হাকিম। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে নিজের পঞ্চম ম্যাচে এসে প্রথম সেঞ্চুরির দেখা পেয়েছেন বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলের সাবেক এই অধিনায়ক। চট্টগ্রামের বিপক্ষে খুলনার দ্বিতীয় ইনিংসে তার ব্যাট থেকে এসেছে ১৪২ রান।
আগের দিন চোটের কারণে মাঠ ছেড়েছিলেন আজিজুল। তৃতীয় দিন সকালে ব্যাট হাতে ফিরে দলকে শুধু বিপদ থেকেই উদ্ধার করেননি, একাই গড়ে দিয়েছেন বড় সংগ্রহের ভিত। ১৪৭ বলে ৯টি চার ও ১০টি ছক্কায় সাজানো তার ইনিংসটি ছিল আক্রমণ ও ধৈর্যের দারুণ মিশেল।
সবচেয়ে অবিশ্বাস্য ছিল শেষ দিকের লড়াই। ২৫৬ রানে নবম উইকেট হারানোর পর আজিজুলের সঙ্গী হন শেষ ব্যাটসম্যান সফর আলী। সেখান থেকে দশম উইকেটে যোগ হয় ৬৭ রান। সফর ২১ বল খেলেও কোনো রান করতে পারেননি। অন্য প্রান্তে আজিজুল একাই যোগ করেন ৬৫ রান। শেষ জুটির প্রায় পুরো রানই এসেছে তার ব্যাট থেকে।
এর আগে ৮৮ রানে থাকা অবস্থায় শরিফের বলে পরপর দুটি ছক্কা মেরে সেঞ্চুরিতে পৌঁছান আজিজুল। সেখানেই থামেননি, আরও ৪২ রান যোগ করে দলকে ৩২৩ পর্যন্ত নিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত মাহমুদুল হাসান জয়ের বলে রিভার্স সুইপ খেলতে গিয়ে থামে তার ইনিংস। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে আগের পাঁচ ইনিংসে তিনটি অর্ধশতক পাওয়া এই তরুণ এবার তুলে নিলেন প্রথম শতকের স্বাদ।
২৭৫ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে চট্টগ্রামও শুরুটা করেছিল দারুণ। মাহমুদুল হাসান জয় ও সাদিকুর রহমানের উদ্বোধনী জুটিতে আসে ১৩০ রান। জয় করেন ৬০, সাদিকুরের ব্যাট থেকে আসে ৭৬। তবে শেষ ঘণ্টায় ম্যাচের চিত্র পাল্টে দেন খুলনার বোলাররা। কনকাশন বদলি হিসেবে খেলতে নামা বাঁহাতি স্পিনার রাকিব হাওলাদার একাই নেন চার উইকেট। মাত্র ২৫ রানের মধ্যে পাঁচ উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে চট্টগ্রাম। তৃতীয় দিন শেষে তাদের সংগ্রহ ৫ উইকেটে ১৭৪ রান। জয়ের জন্য শেষ দিনে প্রয়োজন আরও ১০১ রান, খুলনার চাই পাঁচ উইকেট।
চট্টগ্রামে অবশ্য লড়াই জমিয়ে রেখেছে সিলেট। রংপুরের বিপক্ষে তৃতীয় দিন শেষে ৮ উইকেটে ২৩৫ রান করেছে তারা। প্রথম ইনিংসে ১৭৯ রান করা সিলেট দ্বিতীয় ইনিংসে পেয়েছে ২০৮ রানের লিড। দলের হয়ে অপরাজিত ৯৪ রান করেছেন অমিত হাসান। জাতীয় দল থেকে বাদ পড়ার পর নিজের ব্যাটিং দিয়ে জবাব দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছেন এই ব্যাটার। সেঞ্চুরি থেকে মাত্র ছয় রান দূরে থাকা অমিতের সামনে শেষ দিনে ব্যক্তিগত মাইলফলক ছোঁয়ার পাশাপাশি দলের লিড আরও বাড়ানোর চ্যালেঞ্জ।
কক্সবাজারে ময়মনসিংহ ও ঢাকার ম্যাচ অবশ্য ড্রয়ের দিকেই এগোচ্ছে। ময়মনসিংহের প্রথম ইনিংসে করা ৩৮৭ রানের জবাবে তৃতীয় দিন শেষে ৯ উইকেটে ৩৪২ রান করেছে ঢাকা। দলের অধিনায়ক মোহাম্মদ নাঈম শেখ খেলেছেন ১৩৫ রানের ইনিংস। ২১৩ বলে ১৩টি চার ও তিনটি ছক্কায় সাজানো এই ইনিংসটি তার প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ষষ্ঠ সেঞ্চুরি। অন্যদিকে সেঞ্চুরির খুব কাছে গিয়ে থেমেছেন তাইবুর রহমান। ১৪৮ বলে ৯৩ রান করেছেন তিনি।
জাতীয় লিগের তৃতীয় রাউন্ডের তৃতীয় দিনটি ছিল ব্যক্তিগত অর্জন, রেকর্ড ও দলীয় লড়াইয়ের দারুণ এক মিশেল। নাঈম আহমেদের ডাবল সেঞ্চুরি, আজিজুলের লেজের ব্যাটারকে সঙ্গে নিয়ে অবিশ্বাস্য লড়াই এবং জাওয়াদের দ্রুততম ফিফটি-সব মিলিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে তরুণরাই। শেষ দিনে সেই ব্যক্তিগত কীর্তিগুলোর সঙ্গে কোন দল জয় যোগ করতে পারে, এখন সেটিই দেখার অপেক্ষা!
