Published on
:
2 min read
জয় সাহা
স্কুলস্তরে পাশ–ফেল ফেরাতে উদ্যোগ নিল রাজ্যের সিলেবাস কমিটি। দুর্গাপুজো কাটতেই এ ব্যাপারে পদক্ষেপের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে বলে সূত্রের খবর। বিকাশ ভবন সূত্রে জানা গিয়েছে, এখন একেবারে প্রাইমারি থেকে ক্লাস এইট সরকারি ও সরকার পোষিত স্কুলে পাশ–ফেল নেই। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে সিলেবাস কমিটি মনে করছে, একেবারে প্রাইমারি যদি বাদও থাকে, পঞ্চম অথবা ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে সরকারি বিদ্যালয়ে ফিরুক পাশ–ফেল। পাশ–ফেল প্রথা তুলে দেওয়ার নেপথ্যে একটা বড় কারণ ছিল স্কুলছুট কমানো। কিন্তু বর্তমান সরকারের তৈরি সিলেবাস কমিটির বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ফেল করা স্টুডেন্টদের প্রয়োজনে রেজাল্ট প্রকাশের পরে অতিরিক্ত ১৫ দিন কী এক মাস সময় নিয়ে রেমেডিয়াল ক্লাস করিয়ে আরও একবার পরীক্ষা নেওয়া যেতে পারে। যাতে ফেল করা পড়ুয়ারা ইম্প্রুভমেন্টের সুযোগ পায়। সেখানেও যদি তারা ফেল করে তাহলে তাদের এক ক্লাসেই রেখে দেওয়া হবে। কিন্তু একবারের বদলে ফেল করা পড়ুয়াদের অন্তত আর একবার সুযোগ দেওয়া হোক। এই মর্মেই আপাতত রাজ্য সরকারের কাছে প্রস্তাব পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
সিলেবাস কমিটির চেয়ারপার্সন দেবাশিস চট্টোপাধ্যায়ের কথায়, ‘এখন পড়ুয়ারা ক্লাস নাইনে গিয়ে সর্বপ্রথম পাশ–ফেলের মুখোমুখি হচ্ছে। নিচু ক্লাসে তাদের ভিত পোক্ত হচ্ছে না। উঁচু ক্লাসে পৌঁছে তারা আর খেই রাখতে পারছে না। তাই অন্তত ক্লাস ফাইভ বা সিক্স থেকে পাশ–ফেল থাকা দরকার বলে বিশেষজ্ঞরা আমাদের জানিয়েছেন।’ দেবাশিসের সংযোজন, ‘অনেক বছর হলো পাশ–ফেল উঠে গিয়েছে। কিন্তু স্কুলছুট শুধুমাত্র পাশ–ফেলের জন্যই হয়— এমন একমুখী কারণ খুঁজে পাওয়া যায়নি। তারপরেও মানবিক ভাবে স্কুলের ফল প্রকাশের পরে ফেল করা পড়ুয়াদের অতিরিক্ত ক্লাস করিয়ে তাদের আবার একটা পরীক্ষা নেওয়া যেতে পারে। তাতে ফেল করা পড়ুয়াদের বছরও নষ্টের সম্ভাবনা কমে যাবে।’ যদিও দেবাশিস জানাচ্ছেন, চূড়ান্ত প্রস্তাব রাজ্য সরকারের কাছে পাঠানোর আগে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আরও বিস্তারিত আলোচনা, শিক্ষকদের সঙ্গে ওয়ার্কশপ এবং প্রয়োজনে অভিভাবকদের মতামত সংগ্রহ করে তবেই রিপোর্ট প্রস্তুত করা হবে। সেই পদক্ষেপ শুরু হয়েছে।
বঙ্গে পাশ–ফেল নিয়ে কাটাছেঁড়া বহুদিন ধরে চলছে। সেভ এডুকেশন কমিটি দীর্ঘদিন ধরে এ ব্যাপারে দেশ ব্যাপী আন্দোলন করছে। সেই সংগঠনের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তরুণ নস্কর জানাচ্ছেন, ১৯৮২–তে বাম জমানায় প্রথম প্রাথমিকস্তরে অর্থাৎ ক্লাস ফোর পর্যন্ত সরকারি স্কুলে পাশ–ফেল তুলে দেওয়া হয়। এর বিরুদ্ধে লাগাতার আন্দোলন চলে। ১৯৯৮–এ এই ইস্যুতে রাজ্যজুড়ে ব্যাপক ধর্মঘট হয়। কিন্তু তারপরেও পরিস্থিতির বদল হয়নি। পরে ২০০৯–এ শিক্ষার অধিকার আইন কেন্দ্রীয় ভাবে পাশ হওয়ার পরে সারা দেশ জুড়ে সরকারি স্কুলে ক্লাস এইট পর্যন্ত পাশ–ফেল তুলে দেওয়া হয়। এরপর অবশ্য বিজেপি সরকার কেন্দ্রে ক্ষমতায় এলে এ নিয়ে ফের চর্চা হয়।
২০১৮–তে কেন্দ্রীয় শিক্ষার অধিকার আইনের কিছু সংশোধন করা হয়। তাতে ক্লাস ফাইভ এবং ক্লাস এইটে পাশ–ফেল ফেরানোর কথা বলা হলেও তা কার্যকর হয়নি বলে অভিযোগ। ২০২৪–এও কেন্দ্র এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়, কিন্তু তারপরেও রাজ্য বা দেশে তা কার্যকর হয়নি। তরুণের কথায়, ‘সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ফেরাতে হলে একেবারে ক্লাস ওয়ান থেকেই পাশ–ফেল থাকতে হবে। ফেল করলে পড়ুয়াকে সেই ক্লাসেই রেখে দিতে হবে।’ রাজ্যে বিগত সরকারের সময়েও একাধিক বার এ নিয়ে চর্চা হয়েছে। তৃণমূল রাজনৈতিক ভাবে পাশ–ফেলের পক্ষে থাকলেও গত ১৫ বছরে তা কার্যকর করেনি। প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের বক্তব্য, ‘আমি একাধিক বার দিল্লিকে পাশ–ফেল চালু করতে চেয়ে লিখে বা মিটিংয়ে জানিয়েছি। কিন্তু দিল্লি থেকেই আর কোনও উত্তর বা সবুজ সঙ্কেত আসেনি। তাই তা কার্যকরও করা যায়নি।’
