সড়ক নিরাপদ করতে বর্তমান সরকার বেশ কিছু পরিকল্পনা নিয়েছে। সরকারের এই অঙ্গীকার বাস্তবায়িত হলে নিশ্চয়ই নিরাপদ সড়ক গড়ার সেই স্বপ্নের দেখা মিলবে। গণমাধ্যমে তেমনটিই জানালেন বিআরটিএর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাবীবুর রহমান। অনিরাপদ সড়কে মৃত্যুর ভয়াবহতা উল্লেখ করে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি নিয়মিত ব্রিফিং করে থাকেন। তাদের দেওয়া তথ্য মতে, ২০২২ সালে ৬ হাজার ৭৪৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯ হাজার ৯৫১ জন নিহত, আহত ১২ হাজার ৩৫৬ জন।
দুর্ঘটনার এলাকা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২২ সালে মোট সংঘটিত দুর্ঘটনার ২৭ দশমিক ৭০ শতাংশ জাতীয় মহাসড়কে, ৫২ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ আঞ্চলিক মহাসড়কে, ১১ দশমিক ৮৮ শতাংশ ফিডার রোডে সংঘটিত হয়েছে। এ ছাড়া সারাদেশে সংঘটিত মোট দুর্ঘটনার ৫ দশমিক ৬৭ শতাংশ ঢাকা মহানগরীতে, ১ দশমিক ৭১ শতাংশ চট্টগ্রাম মহানগরীতে, শূন্য দশমিক ৯৯ শতাংশ লেভেলক্রসিংয়ে সংঘটিত হয়েছে।
আসলে বাংলাদেশে সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা খুবই বিশৃঙ্খল এবং দুর্ঘটনাপ্রবণ, রাজধানী ঢাকার বাস সার্ভিসগুলোতে যা প্রকটভাবে দৃশ্যমান। শিক্ষার্থীরা ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনে নামে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য মতে, এরপর গত ৫ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৯ হাজার ৫২২ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ২৮ হাজার ২৯৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫৮ হাজার ৭৯১ জন আহত হয়েছেন। হতাহতের মধ্যে শিক্ষার্থী ছিল ৩ হাজার ৯৪১ জন।
অপূরণীয় ক্ষতি: সড়ক দুর্ঘটনা এমন একটি অপূরণীয় ক্ষতি, যার খেসারত দিতে হয় পরিবার সমাজ এবং রাষ্ট্রকে। কারণ এটি শুধু জীবন কেড়ে নেয় না, বরং একটি পরিবার ও সমাজের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষত সৃষ্টি করে। যেখানে অনেক পরিবার তাদের আর্থিক নিরাপত্তায় হোঁচট খায়। হয়তো কখনো কখনো সেই আর্থিক সমস্যা সমাধানে জরুরি সহায়তা দেওয়া হয় কিন্তু স্বজন হারাদের পরিবার সেই ক্ষতি কোনোভাবেই কাটিয়ে উঠতে পারে না।
বলা যেতে পারে কোনো আর্থিক সহায়তা দিয়ে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার সমাধান সূত্র হতে পারে না। এদিকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তি বা নিহতদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে তীব্র মানসিক বিষণ্নতা, আতঙ্ক এবং পোস্ট-ট্রম্যাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার দেখা দেয়। দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা খরচ, আয়ের উৎস বন্ধ হওয়া এবং পঙ্গুত্বের কারণে পরিবারগুলো চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ অনুযায়ী দুর্ঘটনা কবলিতদের সহায়তা বা ক্ষতিপূরণের জন্য সরকারি ট্রাস্টি বোর্ড ও আর্থিক সহায়তা তহবিল রয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে কথা হয় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাবীবুর রহমানের সঙ্গে। তিনি যেমনটি বলছিলেন। ডিজিটাল, টেকসই, নিরাপদ, সুশৃংখল, পরিবেশ বান্ধব আধুনিক সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার, সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে অংশীজনের সচেতনতা বৃদ্ধি, যুগোপযোগী সড়ক পরিবহন আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগের মাধ্যমে ডিজিটাল, টেকসই, নিরাপদ, সুশৃংখল, পরিবেশ বান্ধব আধুনিক সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে বিআরটিএ দেশজুড়ে সড়ক পরিবহন খাতের নিয়ন্ত্রণ, ব্যবস্থাপনা, শৃঙ্খলা রক্ষা এবং সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে চলছে।
এছাড়া নতুন মোটরযানের রেজিস্ট্রেশন প্রদান, মালিকানা পরিবর্তন, ফিটনেস সনদ নবায়ন এবং ট্যাক্স টোকেন ইস্যু করা। লার্নার বা শিক্ষানবিশ ড্রাইভিং লাইসেন্স, পেশাদার ও অপেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান এবং নবায়ন করা। বাস, ট্রাক ও অন্যান্য গণপরিবহনের জন্য রুট পারমিট ইস্যু ও নবায়ন করা। সরকার নির্ধারিত নীতিমালা অনুযায়ী বিভিন্ন গণপরিবহনের ভাড়া নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণ করার জোড় দিয়ে কাজ করছে বিআরটিএ। সড়ক দুর্ঘটনা কমানোর উদ্দেশ্যে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা এবং রোড সেফটি প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করা। আইন অমান্যকারী যানবাহন ও চালকদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত বা মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা। রাইড-শেয়ারিং প্রতিষ্ঠান ও যানবাহনগুলোর তালিকাভুক্তি ও তদারকি করা। ড্রাইভারদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণ প্রদান এবং পরিবহন খাত নিয়ে গবেষণাও করছে বিআরটিএ।
বিআরটিএ চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাবীবুর রহমান বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় যার ক্ষতি হয় তা পূরণ করা যায় না। দুর্ঘটনা প্রতিরোধে আন্তরিকতার এবং আমাদের সকলের উদ্যোগকে ঐক্য করে কাজ করার আহবান জানিয়ে তিনি বলেন, সকলের সচেতনতাই গড়তে পারে নিরাপদ সড়ক।
তিনি বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার অনেক কারণ আছে, তার মধ্যে বেপরোয়া গাড়ি চালনোই অন্যতম মনে করে তিনি। এছাড়া অবৈধ-ত্রুটিপূর্ণ গাড়ি ও লাইসেন্সবিহীন চালকদের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে সারা বছর বিআরটিএ’র অভিযান ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করার কথা জানান তিনি। তিনি বলেন, ত্রুটিপূর্ণ গাড়ি চালানোর দায়ে চালক, সুপারভাইজার ও সহকারীর সঙ্গে মালিককেও আইনের আওতায় আনার উপর জোর দেন তিনি।
বিআরটিএ সূত্রে জানা গেছে, সুষ্ঠু সড়ক পরিবহন ব্যবস্থাপনা, সড়ক পরিবহন সেক্টরে শৃঙ্খলা এবং সড়ক নিরাপত্তা বিধান কল্পে বিআরটিএ গঠন করা হয়। মোটরযান অধ্যাদেশ ১৯৮৩ বাস্তবায়নের উদ্দ্যেশে তৎকালীন যোগাযোগ মন্ত্রণালয় (বর্তমানে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়)-এর অধীন বিআরটিএ গঠন করা হয়। সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ আইন ২০১৭ এর অধীনে বিআরটিএ কাজ করছে। চেয়ারম্যান বিআরটিএ’র সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। সরকার কর্তৃক সময় সময় জারীকৃত কার্য সম্পাদন করাও চেয়ারম্যানের দায়িত্ব। সংশোধিত অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী বর্তমানে বিআরটিএ’র মোট বিভাগীয় অফিস ৮টি এবং সার্কেল অফিস ৬৪টি। এর মধ্যে জেলা সার্কেল ৬৪টি এবং মেট্রো সার্কেল ৬টি। বিভাগীয় অফিসের প্রধান হচ্ছেন পরিচালক (ইঞ্জি.), মেট্রো সার্কেল প্রধান হচ্ছেন উপ-পরিচালক (ইঞ্জি.) এবং জেলা সার্কেল অফিসের প্রধান হচ্ছেন সহকারী পরিচালক (ইঞ্জি.)।
ছাত্র জনতার অঙ্গীকার, ‘নিরাপদ সড়ক হোক সবার’ এই শ্লোগানকে সামনে রেখে মোটরযান চালকদের প্রতি ১২ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে: ১. গতিসীমা মেনে চলুন। বেপরোয়া ও অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালাবেন না। ২. সিটবেল্ট বাঁধা ব্যতীত মোটরযান চালাবেন না। গাড়ি চালনাকালে মোবাইলফোন বা ইয়ারফোন ব্যবহার করবে না। ৩. বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স, নিয়োগপত্র ও হালনাগাদ কাগজপত্র ব্যতীত গাড়ি চালাবেন না। ৪. চালকের পরিচয়পত্র ও মোবাইলফোন নম্বর গাড়ির দৃশ্যমান স্থানে ঝুলিয়ে রাখুন। ৫. ট্রাফিক আইন, ট্রাফিক সাইন এবং ট্রাফিক পুলিশের নির্দেশনা মেনে চলুন। ৬. ওভারটেকিং নিষিদ্ধ এলাকা, রাস্তার বাঁক ও সরু ব্রিজে ওভারটেকিং করবেন না। ৭. নেশাজাতীয় দ্রব্য সেবন করে অথবা ঘুমঘুম ভাব হলে গাড়ি চালাবেন না। ৮. মানসিক অস্থিরতা, অতিরিক্ত চাপ ও শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে গাড়ি চালাবে না। ৯. উল্টোপথে গাড়ি চালাবেন না। অযথা হর্ন এবং গাড়িতে উচ্চস্বরে গান বাজাবেন না। ১০. নিরাপদে যাত্রী ওঠানামা নিশ্চিত এবং যাত্রীদের সঙ্গে ভালো আচরণ করুন। ১১. মোটারসাইকেলে চালক ব্যতীত একজনের বেশি আরোহী বহন করবেন না। চালক ও আরোহী উভয়ে সঠিকভাবে মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার করুন এবং ১২. সড়ক দুর্ঘটনা রোধে মহাসড়কে মোটরসাইকের ও ধীরগতির বাহন চালানো থেকে বিরত থাকার জন্য এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
মোটরযান মালিকদের ৫ নির্দেশনা: ১.গাড়িতে সঠিক ড্রাইভিং লাইসেন্সধারী চালক নিয়োগ এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করুন। ২. চালককে একটানা ৫ ঘণ্টা ও দিনে ৮ ঘণ্টার বেশি গাড়ি চালাতে বাধ্য করবেন না। ৩. ফিটনেসবিহীন, যান্ত্রিক ক্রুটিযুক্ত ও ধোঁয়া নির্গমণকারী গাড়ি রাস্তায় নামাবেন না এবং ৫. মুক্তিযোদ্ধা, নারী , শিশু, প্রতিবন্ধী ও বয়স্কদের গণপরিবহনে ওঠানামা ও বসার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার প্রদান করার নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।
যাত্রীদের ৬ নির্দেশনা: ১. চলন্ত গাড়িতে ওঠানামা করবেন না। পণ্যবাহী মোটরযানে যাত্রী হয়ে উঠবেন না। ২. আইন নিজের হাতে তুলে নিবেন না, প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করান। ৩. শরীরের কোনো অংশ গাড়ির বাইরে রাখবেন না। চালকের মনোযোগ বিঘ্ন ঘটে এমন কিছু করবেন না। ৪. তাড়াহুড়া করে গাড়ি থেকে নামবেন না, গাড়িতে উঠতে ডান পা এবং নামতে বাম পা আগে ব্যবহার করবেন। ৫. চালক, কন্ডাক্টরের সঙ্গে খারাপ আচরণ এবং গাড়িতে উঠে হইচই করবেন না এবং ৬. গণপরিবহনে নারী যাত্রী যৌন হয়রানি বা অশালীন আচরণের শিকার হলে পরবর্তী স্টপেজে নামার পূর্বেই ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে পুলিশের কাছে অভিযোগ করা নির্দেনা দেওয়া হয়।
পথচারীদের ৩ নির্দেশনা: ১. জেব্রাক্রসিং, ফুটওভারব্রিজ ও আন্ডারপাস দিয়ে রাস্তা পার হোন। যেখানে এসব ব্যবস্থা নেই সেখানে প্রথমে ডানে, পরে বামে, তারপর আবার ডান-বাম ভালো করে দেখে নিরাপদ মনে হলে রাস্তা পার হোন। ২. দৌড়ে অথবা মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে রাস্তা পার হবেন না ৩. চলাচলে ফুটপাত ব্যবহার করুন, ফুটপাতবিহীন রাস্তার ডানপাশ দিয়ে সাবধানে চলাচলের জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বিআলো/অর্নব