মো. আবুল কাশেম। ছবি : রূপালী বাংলাদেশ
বেঁচে থেকেও সরকারি নথিতে মৃত তিনি। নিজের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে প্রায় এক যুগ ধরে ঘুরছেন সরকারি দপ্তরে। কিন্তু জাতীয় পরিচয়পত্রে তাকে জীবিত করানো যায়নি। বন্ধ হয়ে গেছে বয়স্ক ভাতাও। জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে ধরনা দিতে দিতে এখন ক্লান্ত ৭০ বছর বয়সী মো. আবুল কাশেম। তিনি বলেন, বেঁচে থেকেও কাগজে-কলমে মৃত হয়ে থাকতে হবে আর কত দিন?
আবুল কাশেম গাজীপুরের শ্রীপুর পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের লোহাগাছ গ্রামের বাসিন্দা। তার বাবার নাম মৃত মাঈন উদ্দিন। জন্মসূত্রে এই গ্রামের বাসিন্দা আবুল কাশেমের জাতীয় পরিচয়পত্রও ছিল। কিন্তু ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে বয়স্ক ভাতার টাকা তুলতে গিয়ে জানতে পারেন, সরকারি নথিতে তিনি মৃত। এরপর উপজেলা নির্বাচন কার্যালয়ে যোগাযোগ করলে তাকে জানানো হয়, ২০১৪ সালে বরিশালের বাবুগঞ্জে তার মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে। সেই থেকে নিজেকে জীবিত প্রমাণের লড়াই শুরু তার।
পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, আবুল কাশেম তাদের চোখের সামনেই বেঁচে আছেন। নিয়মিত চলাফেরা করছেন, মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন। অথচ সরকারি নথিতে মৃত থাকায় নিজের ভোটাধিকার ফিরে পাওয়া ও বয়স্ক ভাতা চালু করা নিয়ে তাকে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। তাকে দ্রুত ভোটার তালিকায় পুনর্বহাল করে জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধনের ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
নির্বাচন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৪ সালে আবুল কাশেম বরিশালের বাবুগঞ্জের একটি ইউনিয়নে মাইগ্রেশন করেন। একই বছর তিনি মারা গেছেন উল্লেখ করে আজিজুর রহমান নামের এক ব্যক্তি তার মৃত্যুসনদের জন্য আবেদন করেন। পরে স্থানীয় ওয়ার্ড সদস্যের স্বাক্ষরিত পত্রের ভিত্তিতে তাকে মৃত হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়। একই সঙ্গে তার ভোটার পরিচয়পত্রও কর্তন করা হয়। তবে কীভাবে এবং কোন তথ্যের ভিত্তিতে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানা যায়নি।
আবুল কাশেম বলেন, কয়েকটা ট্যাহা বয়স্ক ভাতা পাইতাম। হেইডাও বন্ধ করে দিছে। আমি নাকি মইরা গেছি। বাইচ্চা থাকতেও আমাকে মাইরা ফালাইছে, এইডা কেমনে মাইন্না লই? মেম্বার-চেয়ারম্যানের পেছনে ঘুরতে ঘুরতে জুতার তলি ছিঁড়া গেছে। আর কবে জীবিত হমু?
স্থানীয় বাসিন্দা মনির হোসেন বলেন, আবুল কাশেম আমাদের গ্রামের মানুষ। তিনি সব সময় আমাদের চোখের সামনে আছেন। আজও একসঙ্গে চা খেয়েছি। কয়েক বছর আগে শুনলাম, তিনি নাকি মারা গেছেন। আমরা তাকে কবর দিলাম না, জানাজা দিলাম না, তাহলে তিনি মারা গেলেন কীভাবে?
আরেক বাসিন্দা আমির হোসেন বলেন, তাকে দীর্ঘদিন ধরে চিনি। তিনি অত্যন্ত ভালো মানুষ। উপজেলা নির্বাচন কার্যালয়ের মাধ্যমে আবুল কাশেমকে জীবিত করে ভোটার তালিকায় পুনর্বহালের জোর দাবি জানাচ্ছি।
এ বিষয়ে শ্রীপুর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা বাহাউদ্দিন আহমেদ বলেন, জাতীয় পরিচয়পত্রের বিষয়টি নির্বাচন কার্যালয় সমাধান করবে। পরিচয়পত্রে জীবিত হিসেবে পুনর্বহাল হলে আবেদনের মাধ্যমে তাকে আবার বয়স্ক ভাতার আওতায় আনা হবে।
শ্রীপুর উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) তামান্না রশিদ বলেন, তিনি এ উপজেলায় অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। আবুল কাশেম আগে কতবার কার্যালয়ে এসেছেন, তা তার জানা নেই। তবে তার কাগজপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, মাইগ্রেশনের পর বাবুগঞ্জে যাওয়ার পর সেখানে তার মৃত্যুর তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। ওই উপজেলায় যোগাযোগ করে জাতীয় পরিচয়পত্রে কর্তন-সংক্রান্ত বিষয়টি সংশোধন করতে হবে। সেখানে যোগাযোগ করলে সমস্যার সমাধান হতে পারে।
গাজীপুর জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান বলেন, ভুক্তভোগী ব্যক্তি জেলা নির্বাচন কার্যালয়ে এলে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করা হবে। জেলা কার্যালয় থেকে সমাধান করা সম্ভব হলে তা করা হবে। অন্যথায় দ্রুত কীভাবে সংশোধন করা যায়, সে বিষয়ে তাকে পরামর্শ দেওয়া হবে।
শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাহিদ ভূঞা বলেন, এ বিষয়ে তার কাছে কেউ আসেননি। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি তিনি দেখেছেন। ভুক্তভোগী ব্যক্তি তার কাছে এলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রায় এক যুগ ধরে সরকারি নথিতে নিজের অস্তিত্ব ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছেন আবুল কাশেম। এখন তার বয়স হয়েছে, শরীরেও আগের মতো শক্তি নেই। জনপ্রতিনিধি ও সরকারি দপ্তরের দরজায় ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত তিনি। তার পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীদের প্রত্যাশা, দাপ্তরিক জটিলতা কাটিয়ে দ্রুত তাকে জীবিত হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে। বেঁচে থাকা একজন মানুষকে নিজের অস্তিত্ব প্রমাণের জন্য আর কত দিন অপেক্ষা করতে হবে, সেই প্রশ্নই এখন তাদের।
