সংবাদ · স্বাস্থ্য
গোয়াইনঘাটের হাসপাতাল নিজেই রোগী!
২৪/১০/২০২৬

সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার প্রায় ৩ লাখ ৫৫ হাজার ৯৭৯ জন মানুষের স্বাস্থ্যসেবার অন্যতম ভরসা ৫০ শয্যাবিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নের মানুষের চিকিৎসাসেবার প্রধান কেন্দ্র হলেও দীর্ঘদিন ধরে নানা সংকট, অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। চিকিৎসক সংকট, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, অকার্যকর চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং জরুরি চিকিৎসাসেবা নিয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন রোগীরা।স্থানীয়দের অভিযোগ, জ্বর, সর্দি, কাশি, নিউমোনিয়া ও টাইফয়েডসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা অনেক রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। এমনকি সাধারণ প্রসূতি রোগীদের ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় সেবা না পেয়ে অন্য হাসপাতালে যেতে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা রোগীদের সময় ও অর্থ—দুই-ই বেশি ব্যয় হচ্ছে।৪০ পদের বিপরীতে কর্মরত ৮হাসপাতাল সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চিকিৎসকের মোট পদ ৪০টি। এর বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র আটজন। বিপুলসংখ্যক পদ শূন্য থাকায় স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।স্থানীয়দের অভিযোগ, চিকিৎসক সংকটের পাশাপাশি কর্মরত চিকিৎসকদের উপস্থিতি ও দায়িত্ব পালন নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। হাসপাতালের হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর থাকলেও অনেক সময় রোগীরা প্রত্যাশিত চিকিৎসাসেবা পান না বলে অভিযোগ করেছেন তারা। কিছু চিকিৎসক বেসরকারি ক্লিনিক ও ব্যক্তিগত চেম্বারে বেশি সময় দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে বাড়ছে দুর্ভোগহাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড, টয়লেট ও আশপাশের পরিবেশ নিয়েও রোগী ও স্বজনদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। তাদের অভিযোগ, অপরিচ্ছন্ন ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে চিকিৎসা নিতে এসে রোগীরা আরও স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন।জরুরি বিভাগে পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও জনবল নিশ্চিত করা না গেলে রোগীদের তাৎক্ষণিক চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। স্থানীয়দের অভিযোগ, জরুরি বিভাগে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা প্রদানের ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসক উপস্থিত না থাকায় নার্স ও অন্যান্য কর্মচারীদের ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে জটিল রোগীদের দ্রুত ও যথাযথ চিকিৎসা পাওয়া নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।নষ্ট এক্স-রে মেশিন, অকার্যকর ডেন্টাল ইউনিট২০২২ সালের আকস্মিক পাহাড়ি ঢলে হাসপাতালের এক্স-রে মেশিন ও ডেন্টাল ইউনিটের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে যায় বলে জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সেগুলো মেরামত কিংবা পুনঃস্থাপনের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।ফলে এসব পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা নিতে রোগীদের বাইরের প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের চিকিৎসাব্যয় বাড়ছে। সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি থাকা সত্ত্বেও সেগুলো সচল না থাকলে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার বাধাগ্রস্ত হয়।টিকিট কাউন্টার নিয়ে অভিযোগহাসপাতালের টিকিট কাউন্টার পরিচালনা নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, হাসপাতালের একজন ইলেকট্রিশিয়ান সুজন ও তার স্ত্রী, যিনি একই প্রতিষ্ঠানে আয়া হিসেবে কর্মরত, যৌথভাবে টিকিট কাউন্টার পরিচালনা করেন। টিকিট বিক্রির অর্থের একটি অংশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে যায় বলেও অভিযোগ রয়েছে।দুটি অ্যাম্বুলেন্সের মধ্যে সচল একটিহাসপাতালে দুটি অ্যাম্বুলেন্স থাকার কথা জানা গেলেও বর্তমানে মাত্র একটি অ্যাম্বুলেন্স দিয়ে সেবা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে গুরুতর রোগীদের সিলেটে স্থানান্তর করতে গিয়ে ভোগান্তির সৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষ করে জরুরি রোগী পরিবহনের সময় একাধিক রোগীর প্রয়োজন দেখা দিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।তদারকি নিয়ে প্রশ্নহাসপাতালটির দীর্ঘদিনের সমস্যা ও অনিয়মের অভিযোগের মধ্যেও কার্যকর তদারকি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় সচেতন মহল। তাদের অভিযোগ, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কিংবা জনপ্রতিনিধিরা হাসপাতাল পরিদর্শনে এলেও সব সমস্যা যথাযথভাবে তাঁদের সামনে তুলে ধরা হয় কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।স্থানীয়দের একাংশের দাবি, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এবং জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পরিদর্শনের সময় হাসপাতালের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। তবে পরিদর্শনসংক্রান্ত অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।কার্যকর পদক্ষেপ চান এলাকাবাসীগোয়াইনঘাটের মতো বিস্তীর্ণ ও সীমান্তবর্তী উপজেলার মানুষের জন্য ৫০ শয্যার এই হাসপাতাল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসক সংকট, চিকিৎসা সরঞ্জামের অকার্যকারিতা, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং অন্যান্য অনিয়মের অভিযোগ দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।তাদের দাবি, শূন্য পদে চিকিৎসক নিয়োগ, জরুরি বিভাগে সার্বক্ষণিক চিকিৎসক উপস্থিতি নিশ্চিত করা, নষ্ট যন্ত্রপাতি সচল করা, অ্যাম্বুলেন্স সেবা বাড়ানো এবং হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।একই সঙ্গে টিকিট কাউন্টার পরিচালনা ও অর্থের হিসাবসহ অনিয়মের অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
মূল প্রতিবেদনে যান ↗