ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, সরকারি সেবার মান কমে যাওয়া এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংকটের প্রতিবাদে দেশজুড়ে বিক্ষোভ ও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। গতকাল শনিবারের বিক্ষোভে সরকারি ভবনে আগুন দেওয়া, দোকানপাটে লুটপাট ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় ১২০০ জনের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আহত হয়েছেন অন্তত ১৫০ পুলিশ সদস্য। আজ রোববার রয়টার্স ও দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিক্ষোভে কয়েক লাখ মানুষ অংশ নেন। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, বিক্ষোভকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার। তবে দেশটির অন্যতম বড় শ্রমিক সংগঠন সিজিটি জানিয়েছে, এ সংখ্যা প্রায় ৮ লাখ।
অধিকাংশ মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে মিছিলে অংশ নিলেও কিছু বিক্ষোভকারী সহিংসতায় জড়িয়ে পড়েন। তারা সরকারি ভবন, বিলাসবহুল পণ্যের দোকান ও সুপারমার্কেটে হামলা চালান। পুলিশের গাড়ি ও সদস্যদের ওপরও আক্রমণ করা হয়।
সরকারি ভবনে আগুন, দোকানে লুটপাট
ফ্রান্সের লিমোজ শহরে বিক্ষোভকারীদের দেওয়া আগুনে সিটি হলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা মরিস বারাত এএফপিকে বলেন, আগুনে ভবনটির ছাদ ধসে নিচের তলাগুলোর ওপর পড়ে। পশ্চিম দিকের অংশ ছাড়া ভবনটির বড় একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১৪৩ বছরের পুরোনো ভবনটির এ ক্ষতিকে ঐতিহ্যের জন্য বিপর্যয় বলে বর্ণনা করেন তিনি।
মার্সেই শহরেও বিক্ষোভকারীরা সিটি হলে ঢুকে পড়েন। তারা নিরাপত্তাবেষ্টনী দিয়ে ভবনের দরজায় আঘাত করেন। পরে ভবনের দেয়ালে নৈরাজ্যবাদের প্রতীক ‘এ’ লিখে দেন। পুলিশ তাদের সরিয়ে দেয়। লিয়ঁ শহরে পর্যটন কার্যালয়েও আগুন দেওয়া হয়।
রাজধানী প্যারিসের বিভিন্ন এলাকায় পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। প্লাস দ্য লা রিপাবলিক এলাকায় শান্তিপূর্ণ মিছিল একপর্যায়ে সহিংস হয়ে ওঠে। কালো পোশাক ও মুখোশ পরা বিক্ষোভকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে আতশবাজি ও পাথর ছোড়েন। তারা একটি ব্যাংকে হামলা চালান এবং ক্রীড়াসামগ্রীর দোকানে লুটপাট করেন।
শহরের বিভিন্ন এলাকায় ময়লার পাত্র ও গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। কোথাও কোথাও আগুন ছড়িয়ে পড়ে পাশের ভবনেও। বুলেভার্দ ম্যাজেন্তা এলাকায় বহু দোকানে ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়। গ্যালারি লাফায়েত ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে ঢোকারও চেষ্টা করেন বিক্ষোভকারীরা। এ সময় পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে।
কেন এই বিক্ষোভ
গত মাসে প্যারিসের উত্তরাঞ্চলের নিম্নআয়ের এলাকার কয়েকটি স্কুলে বিক্ষোভ শুরু হয়। শিক্ষক অনুপস্থিতি, শিক্ষক সংকট ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জরাজীর্ণ অবকাঠামো নিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ থেকে এর সূত্রপাত। পরে তা দেশজুড়ে বৈষম্য, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরকারি ব্যয় কমানোর বিরুদ্ধে বৃহত্তর আন্দোলনে রূপ নেয়।
বিক্ষোভকারীদের দাবির মধ্যে রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আরও শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করা, মজুরি ও পেনশন বাড়ানো এবং জনসেবামূলক খাতের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
প্যারিসের ১৯ বছর বয়সী বিক্ষোভকারী লোলা বলেন, জীবনযাত্রার ব্যয় অসহনীয় হয়ে উঠেছে। জ্বালানির দামও অনেক বেশি। ভালো শিক্ষার পরিবেশ ও আরও শিক্ষক নিয়োগের দাবিতে বিক্ষোভ করায় দেশের বিভিন্ন স্থানে স্কুলশিক্ষার্থীদের ওপর হামলা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
২০১৮ সালে ফ্রান্সে জ্বালানির দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলন শুরু হয়েছিল। এবারের বিক্ষোভেও হলুদ রঙের উজ্জ্বল নিরাপত্তা পোশাক পরে অনেকে রাস্তায় নামেন। শনিবারের বিক্ষোভে জনসমাগম ওই আন্দোলনের সর্বোচ্চ পর্যায়ের চেয়েও বেশি ছিল বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ২০২৩ সালে পেনশন সংস্কারের বিরুদ্ধে হওয়া বিক্ষোভের তুলনায় এবারের সমাগম কম ছিল বলে জানানো হয়েছে।
সহিংসতার জন্য উগ্র বামপন্থিদের দায়ী করল সরকার
ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু সহিংসতার জন্য উগ্র বামপন্থি গোষ্ঠী ও অপরাধীদের দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, সহিংসতার মাধ্যমে কেউ সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারবে না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে যারা সহিংসতাকে প্রস্তুতি হিসেবে ব্যবহার করতে চায়, তাদের ভয় পাবে না সরকার। সহিংসতার মাধ্যমে কাউকে রাজনৈতিক কর্মসূচি চাপিয়ে দিতে দেওয়া হবে না।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ বলেন, কিছু সুযোগসন্ধানী অপরাধী বিক্ষোভকে লুটপাটের কাজে ব্যবহার করেছে। তাদের শনাক্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি অবস্থা ঘোষণার পরিকল্পনা নেই বলেও জানান তিনি।
প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ হামলাকারীদের বিচারের মুখোমুখি করার অঙ্গীকার করেছেন। তিনি বলেন, যারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চায় এবং শান্তিপূর্ণভাবে দাবি জানানো মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন করে, তাদের বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশের কাঁদানে গ্যাস ও অন্যান্য নিয়ন্ত্রণমূলক অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে। পুলিশের অভিযানে আহত হওয়ার ঘটনাগুলোও তদন্তের আওতায় এসেছে।
পুলিশের বিরুদ্ধে সহিংসতার অন্তত দুই ডজন অভিযোগ তদন্ত করছে সংশ্লিষ্ট নজরদারি সংস্থা।
শনিবারের সংঘর্ষে এক ব্যক্তি হাত হারিয়েছেন বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নুনেজ নিশ্চিত করেছেন। ফরাসি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই ব্যক্তি পুলিশের ছোড়া একটি স্টান গ্রেনেড তুলতে গেলে এ ঘটনা ঘটে।
এর আগে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরের হাত হারানোর ঘটনার পর পুলিশের ব্যবহৃত এক ধরনের স্টান গ্রেনেডের ব্যবহার স্থগিত করা হয়েছিল। তবে শনিবার সেটি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয় বলে দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু জানিয়েছেন, শনিবারের সংঘর্ষে ১৫০ জনের বেশি পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। অন্যদিকে পুলিশের একটি ইউনিয়ন জানিয়েছে, বিভিন্ন স্থানে পুলিশ সদস্যদের ওপর লাঠি ও ইট দিয়ে হামলা হয়েছে।
ফ্রান্সে আগামী বছর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা। রাজনৈতিক বিভাজন, অর্থনৈতিক চাপ ও জনসেবার মান নিয়ে অসন্তোষের মধ্যে এই বিক্ষোভ দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন চাপ তৈরি করেছে।
সরকারের ঋণ কমানোর প্রচেষ্টার মধ্যেও দেশটির সরকারি ঋণ নেওয়ার ব্যয় দুই দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে বলেও জানিয়েছে রয়টার্স।
