বি. এম মনিরুল ইসলাম
লবণাক্ত পানির প্রভাবে প্রাকৃতিক জলাশয়ে কমে যাচ্ছে শামুক-শালুকসহ উপকূলীয় নানান খাদ্যসংস্কৃতি। উপকূলীয় এলাকায় যারা জীবনযাপন করে দীর্ঘদিন ধরে প্রকৃতিনির্ভর অভ্যস্ত হয়ে ওঠেছে এসকল জনগোষ্ঠীর খাদ্য ও জীবিকার অন্যতম অবলম্বন শামুক-শালুক। প্রকৃতি বা পরিবেশের পরিবর্তন ও পানির লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় উপকূলীয় এই সম্পদগুলো ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে।
একটা সময় জলাশয় ও আশপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশ থেকে শামুক-শালুক সংগ্রহ করে উপকূলীয় এলাকার মানুষেরা নিজেদের খাদ্যচাহিদা পূরণ করতেন। পাশাপাশি এসব প্রাকৃতিক সম্পদ তাদের জীবনযাত্রা ও ঐতিহ্যের সঙ্গেও জড়িয়ে ছিল। এখন আগের মতো শামুক-শালুক না পাওয়ায় তাদের দৈনন্দিন জীবনযাপনে তৈরি হচ্ছে সংকট।
সুন্দরবনঘেঁষা একটি নদীর পাশে মুন্ডা সম্প্রদায় বসবাসকারী একটি আদিবাসী জনগোষ্ঠী। বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, এই অঞ্চলে তাঁদের বসবাসের ইতিহাস প্রায় ২২০ থেকে ৩০০ বছরের পুরোনো। ১৭৫০ থেকে ১৮০০ সালের মধ্যে জমিদার ও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক কর্তৃপক্ষ ঝাড়খণ্ড, বিহার ও ছোটনাগপুর অঞ্চল থেকে মুন্ডাদের সুন্দরবনের উপকূলীয় এলাকায় নিয়ে আসে।
একটা সময় এই অঞ্চলই হয়ে ওঠে তাঁদের স্থায়ী আবাস। প্রায় ৮০ বছর বয়সী এক বৃদ্ধা নাম তার গৌরি মন্ডা, লাঠিতে ভর দিয়ে হাঁটেন। শ্যামনগরের দাঁতিনাখালী এলাকার পরিবর্তনের কথা ভাবতে ভাবতে তিনি নদীর পাশে বসে স্মৃতিচারণা করেন।
বৃদ্ধা দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্মৃতিচারণা করে বলেন, গামছায় এক মুঠো করে শামুক তুলে আনতাম। সেগুলো দিয়ে ঝাল তরকারি রান্না হতো, যা আমাদের সম্প্রদায়ের বিশেষ খাবার। বহু বছর হলো শামুক খাই না। নদী থেকে সেগুলো হারিয়ে গেছে।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা আপেল শামুক, বেলামিয়া বেঙ্গালেনসিস শামুক, পিলা পলিটা প্রজাতির শামুক খেতেন। শামুক সংগ্রহ করে সেদ্ধ করে কিংবা তরকারি রান্না করে খেতেন। প্রোটিন ও খনিজ উপাদানে সমৃদ্ধ হওয়ায় এসব শামুক ছিল তাদের পুষ্টির উৎস ছিলো। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন ও লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশের কারণে মিঠাপানির শামুক ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে তাদের ঐতিহ্যবাহী খাদ্যাভ্যাস ও জীবন-জীবিকার উপর।
শুধু যে শামুক, তা নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের চাপে এদের খাদ্যতালিকা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে আরও অনেক ঐতিহ্যবাহী খাবার। এর মধ্যে রয়েছে শালুক শাপলা বা জলজ উদ্ভিদের মাটির নিচে জন্মানো কন্দ।
তিনি আরও জানান, একটা সময় তাদের অন্যতম খাবার ছিলো ইঁদুরও। যখন এই এলাকায় প্রচুর পরিমাণের ধান চাষ হতো তখন ধান ক্ষেতে অনেক ইঁদুরও পাওয়া যেত কিন্তু এখন আর তেমন পাওয়া যায় না। লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে ধানের চাষ কমে যাওয়ায় মাঠের ইঁদুরও নেই।
জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং বনজ খাবারের প্রাপ্যতা কমে যাওয়ায় তাদের সম্প্রদায় এখন নতুন ধরনের খাদ্যসংকটের মুখোমুখি। তাদের শতাব্দীপ্রাচীন খাদ্যসংস্কৃতিও পর্যায় ক্রমে কমে যাচ্ছে। পানিতে লবণের কারণে নিজেদের জমিতে ধান চাষ করতো, সেই চালের ভাত খেতো। এখন সেই জমিতে ধানের বদলে কাঁকড়া কিংবা বাগদা চিংড়ি হয়।
উপকূলীয় এলাকায় এতোটাই জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে তারা কেনো উৎপাদনই ঠিক মত করতে পারছে না। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আইলা, আম্পান ও সিত্রাংয়ের মতো ঘূর্ণিঝড় কৃষিজমিকে একেবারেই অনুর্বর করে তুলেছে। একসময় যে জমিতে ধান হতো, সেখানে এখন চিংড়ি চাষ করা হচ্ছে। আবার অনেকেই জমি হারিয়ে বেড়িবাঁধের আড়ালে অসহায় হয়ে পড়েছেন। আগে বন থেকে সংগ্রহ করা নানা খাবার ছিল তাদের খাদ্যতালিকার অংশ। বুনো গাজরলতা, বনচালতা, মাশরুম, কচুশাক, শাপলা ও বিভিন্ন ধরনের কন্দ তাদের রান্নায় বিশেষ স্থান দখল করে ছিল। কিন্তু বন উজাড় ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে এসব খাবারও হারিয়ে যাচ্ছে।
