খাদ্যপণ্যের সরবরাহে সংকট তৈরি হলে এবং দাম বাড়লে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর তার প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি পড়ে। আয়ের বড় অংশ যাদের খাদ্য কিনতেই ব্যয় করতে হয়, তাদের জন্য খাদ্যমূল্য বৃদ্ধির অর্থ এ ব্যয়ে রাশ টানা।
খাদ্যনিরাপত্তা মূলত চারটি বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। প্রাপ্যতা, প্রবেশাধিকার, উপযোগিতা ও স্থিতিশীলতা। এগুলো নির্দেশ করে উৎপাদন ও সরবরাহ, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, নিরাপদ খাবার এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে এ তিন উপাদানের নির্বিঘ্ন উপস্থিতিকে। বাংলাদেশের জনগণের খাদ্যনিরাপত্তা আছে কিনা তা বুঝতে গেলে এ চার উপাদান বিবেচনায় নেয়ার প্রয়োজন পড়ে না। গত কয়েক বছরের মূল্যস্ফীতি, বিশেষত খাদ্য মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে উপলব্ধি করা যায় এ দেশে খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকি কত বেশি। একদিকে দামের স্তর স্ফীত হয়েছে, অন্যদিকে মানুষের প্রকৃত আয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি। ফলে ক্রয়ক্ষমতা কমেছে এবং কমছে। এ প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে খাদ্যশস্য সংগ্রহ-পরবর্তী ক্ষতির তথ্য এটিই স্পষ্ট করছে যে দেশে খাদ্যনিরাপত্তা ও দারিদ্র্যের ঝুঁকি আরো বাড়ছে।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও বিভাগীয় প্রধানের সাম্প্রতিক উপস্থাপিত প্রবন্ধ থেকে জানা যাচ্ছে যে দেশে উৎপাদিত টমেটো ও আলুর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সংগ্রহ-পরবর্তী বিভিন্ন পর্যায়ে নষ্ট হয়ে যায়। ধানের ক্ষেত্রেও উৎপাদন থেকে শুরু করে সংগ্রহ, পরিবহন, মাড়াই, পরিষ্কার ও শুকানো পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে ক্ষতির হার প্রায় ১০ দশমিক ২৪ শতাংশ। মাছের ক্ষেত্রে এ হার ২২-২৫ শতাংশ। ফল ও সবজির ক্ষেত্রেও সংগ্রহ-পরবর্তী ক্ষতি ২৫-৪০ শতাংশ পর্যন্ত। এর অর্থ হলো, বিপুল পরিমাণ খাদ্য উৎপাদনের পরও সংরক্ষণ ও বাজারজাত ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে দেশের খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলে সংকট তৈরি হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে আমদানি করে চাহিদা মেটাতে হচ্ছে, যার বহুমাত্রিক প্রভাব রয়েছে।
চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম হলে স্বাভাবিকভাবেই দাম বাড়ার চাপ তৈরি হয়। আবার আমদানীকৃত পণ্যের দাম সমন্বয় করে স্থানীয় বাজারদর নির্ধারণ করা হয়, যা অপেক্ষাকৃত বেশি হয়। কোনো কারণে যথাসময়ে আমদানি ব্যাহত হলে স্থানীয় বাজার অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। ফলে খাদ্যশস্য সংগ্রহ-পরবর্তী ক্ষতি কৃষি খাত ছাড়িয়ে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে সামষ্টিক অর্থনীতিতে পড়ে। এর সঙ্গে দরিদ্রতার সম্পর্কও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
খাদ্যপণ্যের সরবরাহে সংকট তৈরি হলে এবং দাম বাড়লে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর তার প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি পড়ে। আয়ের বড় অংশ যাদের খাদ্য কিনতেই ব্যয় করতে হয়, তাদের জন্য খাদ্যমূল্য বৃদ্ধির অর্থ এ ব্যয়ে রাশ টানা। এতে পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ কমার পাশাপাশি জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়তে পারে। এতে নতুন করে দারিদ্র্যের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের একটি অংশ নষ্ট হওয়ায় তার আয়ও কমে যায়। অর্থাৎ একই ব্যবস্থার কারণে একদিকে উৎপাদক ক্ষতিগ্রস্ত হন, অন্যদিকে ভোক্তাকেও আর্থিক চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে।
এ অবস্থায় কৃষির উৎপাদন বাড়ানোর প্রচলিত ধারণাটিও নতুন করে বিবেচনা করা দরকার। দেশে আলুর উৎপাদন ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১ কোটি ১৮ লাখ ৮০ হাজার টন এবং সবজির উৎপাদন ৬২ লাখ ৮০ হাজার টন হলেও উৎপাদিত পণ্যের পুরোটা যদি বাজারে পৌঁছানো না যায়, তাহলে শুধু উৎপাদনের পরিমাণ বাড়িয়ে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়, বরং উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সংগ্রহ-পরবর্তী ক্ষতি কমানোর ব্যবস্থা না থাকলে তা খাদ্যনিরাপত্তায় সহায়ক হবে না।
দীর্ঘদিন ধরে দেশে কৃষি উৎপাদন বাড়ানোকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। কিন্তু উৎপাদনের পর পণ্য কীভাবে সংরক্ষণ হবে, কীভাবে পরিবহন হবে, কত দ্রুত বাজারে যাবে এবং কোথায় কতটুকু মজুদ প্রয়োজন—এসব প্রশ্নে কাঙ্ক্ষিত সক্ষমতা গড়ে ওঠেনি। আধুনিক স্টোরেজ, কোল্ড চেইন, উপযুক্ত পরিবহন ও প্যাকেজিং সুবিধার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এখনো কৃষিপণ্য সংগ্রহ ও পরিবহনে প্রচলিত ও শ্রমনির্ভর পদ্ধতির ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে উৎপাদন পর্যায়ে অর্জিত সাফল্য পরবর্তী সময়ে কাজে লাগছে কম।
ফসল সংগ্রহ-পরবর্তী ক্ষতি কমানোর জন্য আধুনিক সংরক্ষণ ও কোল্ড চেইন অবকাঠামো সম্প্রসারণ, কৃষক ও সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ, উপযোগী প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কার্যকর বাজার ব্যবস্থার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে খাদ্য অপচয় রোধে উৎপাদক থেকে ভোক্তা—সব পর্যায়েই সচেতনতা বাড়াতে হবে।
সংগ্রহ-পরবর্তী ক্ষতি কমানো গেলে একই জমি ও সম্পদ ব্যবহার করে কার্যত বাজারে খাদ্যের প্রাপ্যতা বাড়ানো সম্ভব। এতে একদিকে কৃষকের বিক্রিযোগ্য পণ্যের পরিমাণ ও আয় বাড়বে, অন্যদিকে বাজারে সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা সহজ হবে। আমদানির প্রয়োজন কমার পাশাপাশি খাদ্যপণ্যের দামের ওপর চাপও কিছুটা কমানো সম্ভব। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নিম্ন আয়ের মানুষের খাদ্যপ্রাপ্তি ও পুষ্টি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তাই খাদ্যনিরাপত্তার প্রশ্নে শুধু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করাই যথেষ্ট নয়। উৎপাদিত খাদ্যের কতটা নষ্ট হচ্ছে এবং কেন নষ্ট হচ্ছে—এ হিসাবও নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে আনতে হবে। একদিকে উৎপাদন বাড়ানো, অন্যদিকে উৎপাদিত খাদ্য সংরক্ষণ ও বাজারে পৌঁছানোর সক্ষমতা না বাড়ানো হলে খাদ্যনিরাপত্তার ভিত্তি দুর্বলই থেকে যাবে।
