অধিকৃত পশ্চিম তীরে জলপাই সংগ্রহের মৌসুম ঘিরে ফিলিস্তিনি কৃষকদের ওপর হামলা, ফসল লুট ও জলপাইগাছ ধ্বংসের ঘটনা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। অক্টোবরের প্রথম দুই সপ্তাহেই জলপাই সংগ্রহের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্তত ১৬০টি হামলার ঘটনা নথিবদ্ধ করেছে জাতিসংঘ। এসব হামলার বেশির ভাগই হয়েছে ইসরায়েলি বাহিনীর সুরক্ষায়, অথবা বাহিনীর সদস্যদের অংশগ্রহণে। কৃষকদের ওপর হামলার পাশাপাশি সংগৃহীত জলপাই ও কৃষি সরঞ্জাম লুট, গাছ ধ্বংস এবং নিজেদের জমিতে প্রবেশে বাধা দেওয়ার ঘটনা ঘটছে।
জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয়বিষয়ক দপ্তরের (ওসিএইচএ) হিসাবে, চলতি বছর জলপাই সংগ্রহের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ২০০টি
হামলায় হতাহত হয়েছেন অথবা সম্পদের ক্ষতি হয়েছে। অথচ গত বছর পুরো জলপাই সংগ্রহের মৌসুমে এ ধরনের হামলার সংখ্যা ছিল ১৮৫টি। অর্থাৎ, গত বছরের পুরো মৌসুমের তুলনায় এবার মৌসুমের শুরুর দিকেই হামলার সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে।
বৃহস্পতিবার অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তর (ওএইচসিএইচআর) আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও দাতাদের প্রতি শুধু নিন্দা জানিয়ে থেমে না থেকে ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, চলতি বছরের জলপাই সংগ্রহের মৌসুমের শুরুটাই অশনিসংকেত দিচ্ছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড কার্যালয়ের প্রধান আজিথ সুনঘাই বলেন, জলপাইগাছ ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্ব ও ভূমির সঙ্গে তাদের সম্পর্কের প্রতীক। প্রতিদিন অধিকার আক্রান্ত হচ্ছে— এমন জনগোষ্ঠীর দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে তুলছে বাস্তুচ্যুত করা ও জমি থেকে উচ্ছেদের এই নতুন হাতিয়ার।
জলপাই চাষ ও ফল সংগ্রহ অধিকৃত পশ্চিম তীরের প্রায় ৮০ হাজার থেকে এক লাখ ফিলিস্তিনি পরিবারের আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। কিন্তু ইসরায়েলের কঠোর চলাচল নিষেধাজ্ঞা এবং দখলদারদের হামলার কারণে হাজারো কৃষক নিজেদের বাগানে যেতে পারছেন না। গত তিন বছরে এসব বিধিনিষেধ পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটিয়েছে। অন্যদিকে, জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ফিলিস্তিনিদের জমিতে ঢুকে তাদের ফসল সংগ্রহের সুযোগ পাচ্ছে ইসরায়েলি দখলদাররা।
প্রতি বছর জলপাই সংগ্রহের মৌসুমে পশ্চিম তীরের বিভিন্ন এলাকায় কৃষকদের বাগানে যাওয়ার পথে বাধা দেওয়া, তাদের ওপর হামলা, ফসল চুরি এবং জলপাইগাছ উপড়ে ফেলা বা পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। পাশাপাশি ফিলিস্তিনিদের ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে অবৈধ বসতি ও চৌকি স্থাপন এবং সড়ক নির্মাণের মাধ্যমে জমির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালানো হয়।
এসব হামলা ও বিধিনিষেধের সরাসরি প্রভাব পড়ছে কৃষিনির্ভর পরিবারগুলোর জীবিকায়। মৌসুমে জলপাই সংগ্রহে বাধা দেওয়া, কৃষকদের আহত করা কিংবা ভয়ভীতি দেখিয়ে বাগান থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার ফলে তাদের আয় কমছে। জলপাইগাছ ধ্বংস ও ফসল লুটের কারণে কৃষকেরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। একই সঙ্গে নিজেদের জমিতে যাতায়াতের সুযোগ হারিয়ে অনেক পরিবার জমি ছেড়ে যেতে বাধ্য হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে।
ফিলিস্তিনের কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে জলপাই খাতে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৫ কোটি ৭০ লাখ ডলার। এ সময়ে গাজা উপত্যকার ২০ লাখ জলপাইগাছের ৯০ শতাংশই ধ্বংস হয়েছে। অন্যদিকে, পশ্চিম তীরে ২০২৩ সাল থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ পর্যন্ত ২ লাখ ৮৬ হাজার জলপাইগাছ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে চলতি বছরই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এক লাখ গাছ। তখনও জলপাই সংগ্রহের মৌসুম শুরু হয়নি।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে পশ্চিম তীরের বিভিন্ন এলাকায় জলপাই সংগ্রহকারী ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা জোরদার করেছে ইসরায়েলি দখলদাররা। গত শনিবার দক্ষিণ হেবরনের মাসাফের ইয়াত্তা এলাকার মাঈন গ্রামে দখলদারদের হামলায় ছয় ফিলিস্তিনি আহত হন। ফিলিস্তিন রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, আহতদের মধ্যে চার নারী ও এক শিশু রয়েছেন। একই সময়ে বিভিন্ন এলাকায় ইসরায়েলি বাহিনী কৃষকদের আটক করে।
রামাল্লার পশ্চিমে দেইর আম্মার শহরে জলপাই সংগ্রহের সময় ফিলিস্তিনি কৃষকদের লক্ষ্য করে গুলি চালায় ইসরায়েলি বাহিনী। ফিলিস্তিনি বার্তা সংস্থা ওয়াফার প্রতিবেদন অনুযায়ী, গুলির মুখে কৃষকেরা জমি ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন। ওই এলাকায় ইসরায়েলি দখলদারদের গুলিতে দুই ফিলিস্তিনি আহত হন।
রামাল্লার উত্তর-পূর্বে কাফর মালেক গ্রামে ভোরে একটি খামারে হামলা চালিয়ে প্রায় ২০টি ভেড়া হত্যা করে দখলদাররা। গ্রামের মেয়র নাজেহ রুস্তুম আল-জাজিরাকে এ তথ্য জানান।
পশ্চিম তীরের উত্তরাঞ্চলে নাবলুসের পূর্বে বাইত ফুরিক সমভূমিতে জলপাইগাছ ধ্বংসের খবর পাওয়া গেছে। আল-জাজিরার সাংবাদিক নূর ওদেহ জানান, দখলদাররা সেখানে জলপাইগাছ নষ্ট করেছে। একই সময়ে ইসরায়েলি বাহিনী জমির মালিক ও জলপাই সংগ্রহকারীদের আটক করে।
রামাল্লার পূর্বে দেইর জারির গ্রামের আল-হারিক এলাকায় সেনাবাহিনীর সুরক্ষায় দখলদাররা কৃষকদের লক্ষ্য করে তাজা গুলি ছোড়ে। এতে কৃষকেরা জলপাই সংগ্রহ বন্ধ করে জমি ছেড়ে যেতে বাধ্য হন। একই গ্রামে আন্তর্জাতিক সংহতি কর্মী জনাথন বুদলাকের গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। এক কৃষকের গাড়ি লক্ষ্য করেও পাথর ছোড়া হয়।
শুক্রবার মুখোশধারী কয়েক ডজন দখলদার জলপাই সংগ্রহরত ফিলিস্তিনি কৃষকদের ওপর হামলা চালায়। তারা পাথর ও গুলতি ব্যবহার করে এবং জলপাইগাছে আগুন ধরিয়ে দেয়।
এর আগে ৭ অক্টোবর নাবলুসের উত্তর-পশ্চিমে বুরকা গ্রামের কাছে জলপাই সংগ্রহকারীদের ওপর হামলার সময় ৪৪ বছর বয়সী আলী হাসান ইয়াসের আল-বাজ্জারি নিহত হন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, দখলদার ও ইসরায়েলি সেনারা একসঙ্গে কৃষকদের ওপর হামলা চালিয়েছিল।
জলপাই সংগ্রহের মৌসুমে ফিলিস্তিনি কৃষকদের ওপর হামলার ঘটনা নথিবদ্ধ করতে গিয়ে সাংবাদিকেরাও আক্রান্ত হচ্ছেন। গত শুক্রবার আবু ফালাহ এলাকার কাছে ওয়াশিংটন পোস্টের হয়ে কাজ করা অভিজ্ঞ ফ্রিল্যান্স আলোকচিত্রী লেভিন হামলার শিকার হন।
এর আগে গত ৬ অক্টোবর নাবলুসের দক্ষিণে আকরাবা এলাকার কাছে ফ্রান্সের বার্তা সংস্থা এএফপির ৫৮ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি আলোকচিত্রী জাফর আশতিয়েকে মারধর করে সশস্ত্র দখলদাররা। প্রত্যক্ষদর্শী, স্বজন ও সহকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাকে রাইফেলের বাঁট দিয়ে মাথা ও শরীরে আঘাত করা হয়। পরে আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
ফিলিস্তিনি কৃষকদের জলপাই সংগ্রহে সহায়তা করার সময় বৃহস্পতিবার অধিকৃত পশ্চিম তীরের দক্ষিণ হেবরনের আল-বুয়াইব গ্রাম থেকে ১১ জন আন্তর্জাতিক সংহতি কর্মীকে আটক করে ইসরায়েলি বাহিনী। ফিলিস্তিনি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ফাজা ক্যাম্পেইন এক বিবৃতিতে জানায়, বৃহস্পতিবার সকাল থেকে তাদের আটক রাখা হয়েছে। তবে আটকের কারণ সম্পর্কে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ইতালি, জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক রয়েছেন।
দখলদারদের হামলা ও কৃষিজমিতে প্রবেশের বিধিনিষেধের মুখে থাকা ফিলিস্তিনি কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে আন্তর্জাতিক সংহতি কর্মীরা জলপাই সংগ্রহের কাজে অংশ নিচ্ছিলেন। তাদের উপস্থিতির উদ্দেশ্য ছিল কৃষকদের সহায়তা করা এবং হামলার ঘটনা নথিবদ্ধ করা। এ বিষয়ে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।
ইসরায়েলি মানবাধিকার সংগঠন ইয়েশ দিন জানিয়েছে, ১০ অক্টোবর পর্যন্ত দুই সপ্তাহে দখলদার ও সেনাদের জড়িত থাকার অভিযোগে ৩৭৭টি সহিংসতার ঘটনা নথিবদ্ধ করেছে তারা। আল-জাজিরার সাংবাদিক নূর ওদেহের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে ইসরায়েলের ডানপন্থি দলগুলোর রাজনৈতিক গুরুত্ব বেড়ে যাওয়ায় দখলদাররা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তার প্রতিবেদনে বলা হয়, জলপাই সংগ্রহ লুট করাকে শুধু অনুমোদনযোগ্য নয়, বরং সঠিক কাজ হিসেবে দেখিয়ে একটি ধর্মীয় নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
ফিলিস্তিনি কৃষকদের সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উপস্থিতি বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর। দপ্তরটির অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড কার্যালয়ের প্রধান আজিথ সুনঘাই ১০০টিরও বেশি আন্তর্জাতিক ও জাতীয় সংস্থার সমন্বয়ে গঠিত সুরক্ষা ক্লাস্টারের আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তার কার্যালয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত এই নেটওয়ার্ক ঝুঁকিপূর্ণ ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় কাজ করে।
ফিলিস্তিনি কৃষকদের সুরক্ষায় জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য জাতিসংঘের ত্রাণ ও কর্মসংস্থান সংস্থার (ইউএনআরডব্লিউএ) কর্মীরা বেইত সুরিক, বিদ্দু ও ওয়াদি ফুকিনসহ বিভিন্ন এলাকায় কৃষকদের জলপাই সংগ্রহে সহায়তা করেছেন। হামলা কমাতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বৈঠকও করেছেন জাতিসংঘের কর্মকর্তারা।
২০২৪ সালে মানবিক তহবিল থেকে জলপাইচাষিদের সহায়তায় ৭ লাখ ৫০ হাজার ডলার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। ওই সময় জাতিসংঘ বলেছিল, ফিলিস্তিনি কৃষকদের তাদের জলপাইবাগানে বাধাহীন ও নিরাপদে যাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু চলতি মৌসুমেও হামলা, ফসল লুট, জলপাইগাছ ধ্বংস এবং কৃষকদের জমিতে প্রবেশে বাধা দেওয়ার ঘটনা থামেনি। এতে জলপাই চাষের ওপর নির্ভরশীল হাজারো ফিলিস্তিনি পরিবারের আয় ও জীবিকা হুমকির মুখে পড়েছে। জাতিসংঘের সতর্কবার্তা সত্ত্বেও পরিস্থিতির অবনতি অব্যাহত থাকায় কৃষকদের নিরাপত্তা, জমির অধিকার ও জীবিকা রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি আরও জোরালো হচ্ছে।
