আপনার মনের খোরাক জোগাতে আর সাহিত্যের ম্যাজিকে হারিয়ে যাওয়ার জন্য রইল এমন ৬ অনবদ্য বইয়ের গল্প।

৬ বইছবি: এআই
কিছু বই শুধু পড়ার জন্য হয় না। সেই বইগুলো যেন আমাদের নিয়ে যায় অন্য এক দুনিয়ায়। যেখানে গ্রামীণ মাটির গন্ধ আছে, শহরের কোলাহল আছে, আর আছে মানুষের মনের গভীরের না বলা কথাগুলো। পাতার পর পাতা উল্টাতে উল্টাতে কখন যে রাতের চাদর নেমে আসে, তা টেরই পাওয়া যায় না। আপনার মনের খোরাক জোগাতে আর সাহিত্যের ম্যাজিকে হারিয়ে যাওয়ার জন্য রইল এমন ৬ অনবদ্য বইয়ের গল্প। চলুন, একে একে ঘুরে আসি সেই চেনা-অচেনা ভুবন থেকে।
হাজার বছর ধরে — জহির রায়হানছবি: সংগৃহীত।
ছোট্ট একটা গ্রাম। নদীর ধারের সেই শান্ত সমাজে একান্নবর্তী একটা পরিবার। কর্তা বুড়ো মকবুল। ৮ ঘরের এই সংসারে সকাল থেকে রাত অব্দি কেবল হাড়ভাঙা খাটুনি। পেটের টানে ঘরের পুরুষদের পাশাপাশি বাড়ির বউ-ঝিরাও কম যায় না — কেউ চাটাই বোনে, কেউ ধান ভানে, তো কেউ আবার শাপলা তোলে। এত কষ্টের পরও পিছু ছাড়ে না সমাজের নানা কুসংস্কার আর গোঁড়ামি। এর মাঝেই টুনি আর মন্তুর মিষ্টি প্রেমের ফুল ফোটে, আবার তা ঝরেও যায়। আবহমান বাংলার শিকড় ছোঁয়া সেই সুপ্রাচীন জীবনযুদ্ধ আর মানুষের সরল প্রাণের গল্প নিয়ে জহির রায়হানের এই উপন্যাস এক চিরকালীন দলিল।
লালসালু — সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহছবি: সংগৃহীত।
১৯৪০ বা ৫০ এর দশকের এক অজ পাড়া গাঁ। চারপাশের মানুষগুলো সরল, সহজ আর বড্ড বেশি বিশ্বাস করে মানুষকে। সেই সরলতাকে পুঁজি করে ধর্মের মোড়কে ভণ্ডামি আর সমাজকে কুশিক্ষায় মুড়ে ফেলার এক জীবন্ত চিত্র এঁকেছেন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ। তাঁর এই প্রথম উপন্যাস যেন শুধু সেকালের কোনও গ্রামের গল্প নয়, বরং মানুষের মনের গভরের অন্ধত্বকে চেনার এক চিরন্তন আয়না। পাতার পর পাতা এগোতেই গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠবে, মনে প্রশ্ন জাগবে — মানুষ কি তবে এ ভাবেই ধর্মের আড়ালে নিজের স্বার্থ লুকিয়ে রাখে?
আমি তপু — মুহম্মদ জাফর ইকবালছবি: সংগৃহীত।
কোনও কিছু বোঝার আগেই ছোট্ট তপুর রঙিন দুনিয়াটা হুড়মুড় করে ভেঙে পড়েছিল। আপন মানুষেরা একে একে দূরে সরে গেল। সে আবিষ্কার করল, সে আজ বড় একা — একেবারেই একা! ঠিক তখনই এক নিঃসঙ্গ কিশোরের পাশে এসে দাঁড়াল তার অদ্ভুত সব বন্ধুরা। তাদের হাত ধরে তপু কি পারবে তার এই বন্ধুহীন নিষ্ঠুর পৃথিবীর সঙ্গে লড়তে? এ এক কিশোরের বুকভাঙ্গা একাকীত্বের গল্প, আবার ঘুরে দাঁড়ানোর এবং ভালোবাসার গল্প যা ছোট-ব বড় সবার চোখ ভিজিয়ে দেবে।
প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ — আরিফ আজাদছবি: সংগৃহীত।
তত্ত্বকথা বা শুষ্ক লেকচার মানুষ খুব একটা সহজে হজম করতে পারে না। কিন্তু যদি সেটাই মজার গল্পের ছলে, যুক্তি দিয়ে খণ্ডন করা যায়? ঠিক এই কাজটাই করেছেন লেখক আরিফ আজাদ। গল্পের শুরুতেই থাকে এক দারুণ মজার সূচনা। কখনও বন্ধু সাজিদের সঙ্গে খুনসুটি, কখনও বা দারুণ কোনও স্মৃতির রোমন্থন। এর পরেই সহজ ভাষায় শুরু হয় বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের অস্পৃশ্য দেওয়াল ভাঙার খেলা। মনে হবে আপনি কোনও বই পড়ছেন না, বরং দুই বন্ধু মিলে আড্ডা দিচ্ছেন কোনও এক মিষ্টি বিকেলে।
দূরবীন — শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ছবি: সংগৃহীত।
তিন পুরুষের এক বিশাল পটভূমি। শুরু হয়েছিল জমিদার হেমকান্তকে দিয়ে। যিনি সামান্য কারণে মৃত্যুচিন্তায় ভুগতেন, আর গোপনে ভালোবেসেছিলেন এক পুরোহিত্যকন্যাকে। সেখান থেকে গড়িয়ে গড়িয়ে সময় পৌঁছয় তাঁর নাতি ধ্রুবর যুগে। মাঝের এই দীর্ঘ সময়ে ঘটে গিয়েছে স্বদেশী আন্দোলন, দেশভাগ আর কতশত চড়াই-উতরাই! সম্পর্ক মানেই কখনও ভালোবাসা, কখনও বা প্রবল অভিমান আর দূরত্ব। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের এই জাদুকরী কলমের টানে অতীত আর বর্তমান যেন এক সুতোয় মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।
চৌরঙ্গী — শংকরছবি: সংগৃহীত।
কলকাতা শহরের এক ঝাঁ চকচকে হোটেলের অন্দরমহল। যেখানে বাইরে থেকে দেখা যায় শুধু আলো, হাসি আর বিলাসবহুল জীবন। কিন্তু তার ঠিক পিছনেই লুকিয়ে আছে কত না বলা বেদনা, মানুষের গোপন কান্না, আর রোমাঞ্চকর সব চরিত্র। সাটার্স হোটেলের কাউন্টারে বসে থাকা মানুষগুলোর চোখের ভাষা পড়তে পড়তে আপনিও হারিয়ে যাবেন সেই ষাটের দশকের কলকাতার বুকে। বাংলা সাহিত্যের এই ধ্রুপদী উপন্যাস একবার হাতে নিলে শেষ না করে উঠতেই পারবেন না।
