দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর: কনস্যুলেটের দুর্বলতা খতিয়ে দেখতে সংসদীয় কমিটির নির্দেশ
মক্কায় দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় জেদ্দায় বাংলাদেশের কনস্যুলেটের কোনো দুর্বলতা বা অবহেলা ছিল কি না, তা জানতে চেয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। এ ঘটনায় কোনো অবহেলা থাকলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, সে বিষয়ে প্রতিবেদন দিতে মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছে কমিটি।
রোববার (২৫ অক্টোবর) বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ১৪ দিন আগে সৌদি আরব প্রায় আড়াই হাজার বন্দির একটি তালিকা পাঠিয়েছিল। ওই তালিকায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশির নাম থাকলেও বিষয়টি যথাযথভাবে চিহ্নিত করা হয়নি।
বৈঠক শেষে কমিটির সভাপতি জহরত আদিব চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, কনস্যুলেট আগে কেন বিষয়টি জানতে পারেনি এবং এ ক্ষেত্রে কোনো দুর্বলতা বা অবহেলা ছিল কি না, তা জানতে চেয়েছেন তাঁরা। সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের সুসম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও কেন আগাম তথ্য পাওয়া যায়নি, সে প্রশ্নও তুলেছে কমিটি।
জহরত আদিব চৌধুরী বলেন, ঘটনার সামগ্রিক পরিস্থিতি থেকে একটি দুর্বলতার বিষয় সামনে এসেছে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ১৪ দিন আগে তথ্য বিনিময়ের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ স্বীকার করেছে যে পাঠানো তালিকাটি যথাযথভাবে শনাক্ত করা হয়নি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কমিটিকে জানিয়েছে, তালিকায় বন্দিদের যে শ্রেণিতে রাখা হয়েছিল, তা দেখে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা হয়েছিল, তাদের ছয় মাস থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতে পারে, তা তারা বুঝতে পারেননি। এ ঘটনায় সৌদি আরবের কাছে কয়েকটি প্রশ্নের জবাব চেয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। জবাব পাওয়ার পর তা সংসদীয় কমিটিকে জানাতে বলা হয়েছে।
কনস্যুলেটের কোনো অবহেলা ছিল কি না, থাকলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা এড়াতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, এসব বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন চেয়েছে সংসদীয় কমিটি।
বৈঠকে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশি নারী শ্রমিকদের ওপর নির্যাতনের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবে কর্মরত বাংলাদেশি নারী শ্রমিকদের এক থেকে দুই শতাংশ নির্যাতনের শিকার হন। এ হার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে কমিটি।
জহরত আদিব চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, সৌদি আরবে বর্তমানে প্রায় এক লাখ ৬৯ হাজার বাংলাদেশি নারী শ্রমিক রয়েছেন। তাদের পাসপোর্ট নিতে আসার সময় নির্যাতনের বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। এ ছাড়া তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমেও জরিপ করা হয়। এ পর্যন্ত এক হাজার ৩৬৪ জন নারী গৃহকর্মীকে উদ্ধার করে নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে বলে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তথ্য দেওয়া হয়েছে।
নারী শ্রমিকদের নির্যাতনের হার এক থেকে দুই শতাংশ শুনতে কম মনে হলেও প্রকৃত সংখ্যার বিবেচনায় বিষয়টি উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেন কমিটির সভাপতি। তিনি বলেন, এক হাজার ৩৬৪ জন নারী গৃহকর্মীকে উদ্ধার ও দেশে ফেরানোর তথ্যকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। এ ধরনের নির্যাতনের ঘটনা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বৈঠক শেষে সংসদ সচিবালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মরত নারী শ্রমিকদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করেছে সংসদীয় কমিটি।
কমিটির সভাপতি জহরত আদিব চৌধুরীর সভাপতিত্বে বৈঠকে সদস্য এ বি এম মোশাররফ হোসেন, এস কে আজিজুল বারী, সাঈদ আল নোমান, হুমাম কাদের চৌধুরী ও সানজিদা ইসলাম অংশ নেন। কমিটির বিশেষ আমন্ত্রণে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির।
