সংগঠনটি বলেছে, ‘স্বচ্ছতা, বিচারিক তদারকি, জবাবদিহি ও কার্যকর প্রতিকারের নিশ্চয়তার মধ্য দিয়েই একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও জনবান্ধব সাইবার আইন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইন নিয়ে ১২ দফা সুপারিশ করেছে সম্পাদক পরিষদ। সংগঠনটি মনে করে, এই আইনের কাঠামোতে একদিকে সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং অন্যদিকে স্বাধীন সাংবাদিকতা, জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশ, বৈধ মতপ্রকাশ ও সংবাদমাধ্যমের পেশাগত স্বাধীনতার সুস্পষ্ট সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
রোববার (১৮ অক্টোবর) পরিষদের সভাপতি নূরুল কবির ও সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদের স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে জানানো হয়, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রীর কাছে পৌঁছানোর জন্য সম্পাদক পরিষদের সুপারিশগুলো প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদের দপ্তরে জমা দেওয়া হয়েছে।
১২ দফা সুপারিশ বিষয়ে সম্পাদক পরিষদ বিবৃতিতে জানিয়েছে, আইনের একইসঙ্গে কনটেন্ট অপসারণ বা ব্লক করা, গ্রেপ্তার, তল্লাশি, জব্দ, নজরদারি এবং ডিজিটাল তথ্যের ওপর হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, নির্দিষ্ট আইনি ভিত্তি, দ্রুত বিচারিক তদারকি এবং কার্যকর প্রতিকারের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
সাংবাদিকদের পেশাগত কর্মকাণ্ডের কারণে তাদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও নির্বাহী ক্ষমতার পরিবর্তে স্বাধীন বিচারিক প্রক্রিয়া ও যথাযথ আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে বলে মনে করে সংগঠনটি। এ লক্ষ্যে সম্পাদক পরিষদ ১২ দফা সুপারিশ করেছে। সেগুলো হলো—
১. সাংবাদিকতা ও বৈধ মতপ্রকাশের জন্য স্পষ্ট সুরক্ষা সংযোজন
আইনে একটি সুস্পষ্ট সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকতে হবে। পেশাগত দায়িত্বের অংশ হিসেবে এবং জনস্বার্থে প্রকাশিত সংবাদ, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, বিশ্লেষণ ও মতামতকে শুধুমাত্র তার বিষয়বস্তু বা সমালোচনামূলক অবস্থানের কারণে সাইবার অপরাধ হিসেবে গণ্য করা যাবে না। জনস্বার্থ, ন্যায্য সমালোচনা, মতামত, রম্য, কার্টুন, প্যারোডি, ভোক্তার অভিযোগ, রাজনৈতিক সমালোচনা, অনিচ্ছাকৃত ভুল পেশাগত সাংবাদিকতার অংশ। এর জন্য কাউকে অপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত করা যাবে না। একইভাবে মত প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত কোনো বিষয়কে আইনে অজামিনযোগ্য করা যাবে না। সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমের অধিকার সুরক্ষায় প্রণীত কোনো বিশেষ আইন এবং এই আইনের মধ্যে অসামঞ্জস্য দেখা দিলে সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও সাংবিধানিক অধিকার সুরক্ষাকারী বিধান প্রাধান্য পাবে।
২. সাংবাদিকের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগের আগে বিচারিক অনুমোদন
সাংবাদিকের পেশাগত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত অভিযোগের ক্ষেত্রে গ্রেপ্তার, তল্লাশি, জব্দ, ডিজিটাল ডিভাইস বা তথ্য-উপাত্তে প্রবেশ এবং নজরদারির মতো ব্যবস্থা গ্রহণের আগে আদালতের অনুমোদন নিতে হবে। জরুরি পরিস্থিতিতে কোনো ব্যতিক্রম করতে হলে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আদালতের পরবর্তী অনুমোদন বা পর্যালোচনা বাধ্যতামূলক করতে হবে। এ ধরনের মামলা জামিনযোগ্য হতে হবে।
৩. ভুল তথ্য, অপতথ্য ও গুজবকে পৃথকভাবে সংজ্ঞায়িত করতে হবে
ভুল বা অসম্পূর্ণ তথ্যকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা যাবে না। ভুল তথ্য, অপতথ্য ও গুজব—এই বিষয়গুলোকে আইনে পৃথকভাবে সংজ্ঞায়িত করতে হবে। বিশেষ করে কোনো তথ্য শুধু অযাচাইকৃত বা অসমর্থিত হওয়ার কারণে তাকে অপরাধের উপাদান হিসেবে গণ্য করা যাবে না। একইসঙ্গে বুলিং, মানহানি, হেয়প্রতিপন্ন করা, রাষ্ট্রের জন্য অবমাননাকর, বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, যৌন হয়রানি ও সেক্সটর্শনের মতো বিষয়ের পরিস্কার সংজ্ঞা থাকা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
৪. জনস্বার্থের সাংবাদিকতার জন্য সুস্পষ্ট আইনি সুরক্ষা
দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, আর্থিক অনিয়ম, পরিবেশগত ক্ষতি, জনস্বাস্থ্য, ভোক্তার অধিকার, সরকারি ব্যয় ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অনিয়মসহ জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সংবাদ, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও বিশ্লেষণ প্রকাশের ক্ষেত্রে জনস্বার্থ সুরক্ষার বিষয়ে প্রস্তাবিত আইনে স্পষ্ট স্বীকৃতি থাকতে হবে।
৫. সরকারের সমালোচনা, রাজনৈতিক বক্তব্য ও সাইবার অপরাধের সীমারেখা স্পষ্ট করতে হবে
সরকার, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, সরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি বা কোনো সরকারি নীতির সমালোচনা, রাজনৈতিক মতামত, বিশ্লেষণ, ব্যঙ্গ বা বিদ্রুপাত্মক মতপ্রকাশ সাইবার অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারবে না। কোনো বক্তব্যকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার ক্ষেত্রে আইনে নির্ধারিত অপরাধের উপাদান প্রমাণিত হতে হবে। ‘রাষ্ট্রকে হেয়প্রতিপন্ন করা’র মতো অস্পষ্ট শব্দবন্ধ আইনে রাখা যাবে না।
রাষ্ট্রের জন্য অবমাননাকর, বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ক্ষুণ্ন, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ইত্যাদি ধারণার সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা ঠিক করতে হবে। সাংবাদিকতা, গবেষণা, মানবাধিকারসংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষণ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বা জনস্বার্থমূলক তথ্য প্রকাশকে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করা যাবে না এবং একে অজামিনযোগ্যও করা যাবে না।
৬. কনটেন্ট অপসারণ ও ব্লক করার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও বিচারিক তদারকি নিশ্চিত করতে হবে
কোনো সংবাদ, পোস্ট, ভিডিও বা ডিজিটাল কনটেন্ট অপসারণ বা ব্লক করার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট আইনগত ভিত্তি, লিখিত কারণ ও প্রয়োজনীয়তার উল্লেখ থাকতে হবে। জরুরি পরিস্থিতি ছাড়া সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ থাকতে হবে। প্রতিটি আদেশের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে স্বাধীন কর্তৃপক্ষ বা আদালতে আপিল ও বিচারিক পর্যালোচনার ব্যবস্থা থাকতে হবে। জরুরি ভিত্তিতে কনটেন্ট ব্লক করা হলে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আদালতের পরবর্তী অনুমোদন বা পর্যালোচনা বাধ্যতামূলক করতে হবে। কনেটন্ট ব্লক বা অপসারণের তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।
৭. মানহানি, অপমানের সীমারেখা স্পষ্ট করতে হবে
অনলাইনে মানহানি করাকে নতুন ও অধিকতর কঠোর সাইবার অপরাধ হিসেবে না দেখে একে বিদ্যমান কাঠামোয় প্রেস কাউন্সিলের কাছে রেফার করতে হবে।
৮. সাংবাদিকতা-সংক্রান্ত অভিযোগের ক্ষেত্রে মোবাইল কোর্ট ও নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করা যাবে না
সংবাদ প্রকাশ, মতপ্রকাশ, মানহানি বা সাংবাদিকতার বিষয়বস্তু-সংক্রান্ত অভিযোগের বিচার মোবাইল কোর্ট বা নির্বাহী কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে করা যাবে না। সাংবাদিকতার বিষয়বস্তু নিয়ে বিরোধে গ্রেপ্তার, জরিমানা, কনটেন্ট অপসারণ বা অন্যান্য শান্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে বিচারিক তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।
৯. কোনো প্রতিবেদনের জন্য প্রতিষ্ঠানকে শাস্তি দেওয়া যাবে না
কোনো প্রতিবেদন বা প্রকাশনার কারণে পুরো সংবাদমাধ্যমের কার্যক্রম বন্ধ, নিবন্ধন বাতিল অথবা প্রতিষ্ঠানকে অযৌক্তিকভাবে শাস্তির মুখে ফেলা যাবে না। এসব বিষয় প্রেস কাউন্সিলের ওপর ন্যাস্ত করতে হবে।
১০. সাংবাদিকের তথ্যসূত্রের গোপনীয়তা রক্ষা করতে হবে
সাংবাদিকতার অন্যতম ভিত্তি হলো তথ্যসূত্রের নিরাপত্তা। তাই সূত্রের পরিচয় প্রকাশে সাংবাদিককে বাধ্য করা যাবে না।
১১. সাংবাদিকতা ও সংবাদমাধ্যম-সংক্রান্ত পেশাগত বিরোধে প্রেস কাউন্সিলের প্রক্রিয়াকে কার্যকর করতে হবে
সাংবাদিকতা, সংবাদ প্রকাশ, পেশাগত আচরণ, নৈতিকতা বা সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সম্পর্কিত অভিযোগের ক্ষেত্রে, যেখানে অভিযোগের প্রকৃতি তা অনুমোদন করে, সরাসরি ফৌজদারি ব্যবস্থা গ্রহণের পরিবর্তে প্রথমে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের বিদ্যমান অভিযোগ ও অনুসন্ধান প্রক্রিয়াকে কার্যকর করার ব্যবস্থা থাকতে হবে। এর জন্য প্রেস কাউন্সিলের এখতিয়ার ও কার্যকারিতা প্রয়োজনে আধুনিকায়ন করতে হবে, যাতে সংবাদপত্রের পাশাপাশি প্রাসঙ্গিক ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমও এর আওতায় আসে।
১২. জাতীয় সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিলকে বহুপক্ষীয় ও স্বাধীন তদারকির উপযোগী করতে হবে এবং কাউন্সিলের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে
সাইবার আইনের অধীনে তদন্ত, গ্রেপ্তার, তল্লাশি, জব্দ, নজরদারি বা কনটেন্ট অপসারণের ক্ষমতা প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকাণ্ডের ওপর কাউন্সিলের কার্যকর স্বাধীন তদারকি থাকতে হবে। জাতীয় সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিলের গঠন, সদস্যদের স্বাধীনতা, তাদেরসহ তদন্ত কর্মকর্তার ক্ষমতার সীমা ও সিদ্ধান্তের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
জাতীয় সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিলে সাইবার নিরাপত্তা, আইন, মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ এবং বিশেষ করে গণমাধ্যম ও সম্পাদকীয় নেতৃত্বের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। কাউন্সিলের জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত, নীতিগত সুপারিশ ও ক্ষমতা প্রয়োগের বিষয়ে স্বচ্ছতা ও জনসম্মুখে তথ্য প্রকাশের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
সম্পাদক পরিষদ মনে করে, ‘সাইবার নিরাপত্তা, সাইবার অপরাধ ও ডিজিটাল পরিসরে সাংবাদিকতা পৃথক বিষয়। প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইনে এসব বিষয়ের মধ্যকার প্রয়োজনীয় সীমারেখা অনেক ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট নয়, যা স্বাধীন ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার জন্য অন্তরায় এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। সম্পাদক পরিষদ সরকারকে এসব বিষয়ের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও পরিসর সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে আইনটি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানাচ্ছে।’
সংগঠনটি বলেছে, ‘স্বচ্ছতা, বিচারিক তদারকি, জবাবদিহি ও কার্যকর প্রতিকারের নিশ্চয়তার মধ্য দিয়েই একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও জনবান্ধব সাইবার আইন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। সম্পাদক পরিষদ আশা করে, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত বিবেচনায় নিয়ে আইনটিতে সেই ভারসাম্য নিশ্চিত করা হবে, যাতে সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও সাইবার অপরাধ কার্যকরভাবে মোকাবিলার পাশাপাশি স্বাধীন সাংবাদিকতা, জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশ ও বৈধ মতপ্রকাশের পরিসর সুরক্ষিত থাকে। নিরাপদ ডিজিটাল বাংলাদেশ এবং স্বাধীন গণমাধ্যম পরস্পরের প্রতিপক্ষ নয়; সঠিক আইন ও যথাযথ সুরক্ষার মাধ্যমে দুটিকেই একসঙ্গে শক্তিশালী করা সম্ভব।’
