ভেজা মেঝের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে আছে ৮ বছরের সামিয়া। মাথার ওপর টিনের চালায় ঝুম বৃষ্টি আর সেই ফুটো চাল গলে নামছে পানি। তার খাতার পাতায় এক ফোঁটা পানি পড়ে মুহূর্তেই ধুয়ে গেল সদ্য লেখা ‘অ’ অক্ষরটি। এটি কোনো গল্প নয়; উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরার অন্তত ২৫০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিদিনের নির্মম বাস্তবতা।
জেলার ১ হাজার ৯৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে অন্তত ২৫০টি বিদ্যালয় ভবন এখন চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কোথাও পুরোনো ভবনের ছাদ থেকে খসে পড়ছে কংক্রিটের প্লাস্টার, কোথাও আবার জং ধরা রড ঝুঁলে আছে শিশুদের মাথার ওপর। বর্ষা মৌসুমে ছাদ চুইয়ে পানি জমে শ্রেণিকক্ষগুলো যেন একেকটি ছোট পুকুরে পরিণত হয়। আবার রোদ উঠলে গোলপাতা ও টিনের চালের নিচে অসহনীয় গরমে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে কোমলমতি শিশুরা।
আশাশুনি উপজেলার নবীননগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মুকুল রানী সরকার বিষণ্ন গলায় বলেন, স্কুলটিতে কোনো সুনির্দিষ্ট পাকা ভবন নেই। আধাপাকা গোলপাতার ছাউনির নিচে চরম কষ্ট সহ্য করে তাদের পাঠদান করতে হয়। সামান্য বৃষ্টিতেই শ্রেণিকক্ষে পানি ঢুকে পড়ে। এই স্যাঁতসেঁতে ও অনিরাপদ পরিবেশে শিশুদের পড়াশোনায় মনযোগ ধরে রাখা তো দূরের কথা, বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিত রাখাই এখন সবচেয়ে বড় যুদ্ধ। সন্তানকে বিদ্যালয়ে পাঠিয়ে বড় কোনো বিপর্যয়ের আশঙ্কায় সারাক্ষণ দুশ্চিন্তায় দিন কাটে অভিভাবকদের। শিক্ষাবিদদের মতে, শুধু শিক্ষক আর বই দিলেই শিক্ষার মান বাড়ে না; এর জন্য প্রয়োজন নিরাপদ ও আনন্দময় পরিবেশ। সুপেয় পানি, উন্নত স্যানিটেশন এবং নিরাপদ মাথার ছাদ ছাড়া উপকূলীয় এসব শিশুর ভবিষ্যৎ আজ অন্ধকারে ধাবিত হচ্ছে।
অবকাঠামোগত এই সংকটের কথা স্বীকার করে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার রুহুল আমীন জানান, জেলার সাতটি উপজেলার জরাজীর্ণ ২৫০টি বিদ্যালয়ের বিস্তারিত তালিকা এরই মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে। চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচির পর পরবর্তী সরকারি পরিকল্পনা ও পিইডিপি-৫ প্রকল্পের আওতায় দ্রুততম সময়ের মধ্যে এসব বিদ্যালয়ে নতুন ভবন নির্মাণ করা সম্ভব হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
