দেশে বিপুল কয়লার মজুদ থাকলেও বিদায়ী অর্থবছরে কয়লা আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ১৮৫ কোটি ডলার। ফুলবাড়ী ও বড়পুকুরিয়া খনির মজুদ কাজে লাগানো গেলে আমদানিনির্ভরতা কমানো, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং দেশীয় জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারের সুযোগ রয়েছে। তবে এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে উত্তোলনের ব্যয়, পরিবেশগত ঝুঁকি ও স্থানীয় জনগণের পুনর্বাসন বিবেচনায় লাভজনক পদ্ধতি নির্ধারণ জরুরি।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, বিদায়ী অর্থবছরে মোট জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ১০ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে কয়লায় ১ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন, ডিজেলে ৩ দশমিক ৩১ বিলিয়ন, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসে (এলএনজি) ২ দশমিক ৭০ বিলিয়ন, তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসে (এলপিজি) ১ দশমিক ২০ বিলিয়ন এবং অপরিশোধিত জ্বালানি তেলে ১ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার মধ্যে এ ব্যয় দেশের অর্থনীতিতে বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
ফুলবাড়ী ও বড়পুকুরিয়ায় উৎপাদনের সম্ভাবনা
দিনাজপুরের ফুলবাড়ী কয়লাখনি থেকে বছরে প্রায় দেড় কোটি টন কয়লা উত্তোলনের সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন খনিসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর চাহিদার বড় অংশ দেশীয় কয়লা দিয়ে মেটানো সম্ভব হতে পারে। এতে আমদানি ব্যয় কমার পাশাপাশি খনি উন্নয়ন, পরিবহন ও সংশ্লিষ্ট সেবাখাতে বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান বাড়তে পারে। তবে উত্তোলনযোগ্য মজুদ, উৎপাদন ব্যয়, কয়লার মান ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহারের উপযোগিতা যাচাই ছাড়া সম্ভাব্য সাশ্রয়ের পরিমাণ নির্ধারণ করা যাবে না। খনি উন্নয়ন, পরিবহন, পরিবেশ সুরক্ষা ও পুনর্বাসনের ব্যয়ও হিসাবের আওতায় আনতে হবে।
দেশের উৎপাদনশীল বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি থেকে উত্তোলিত কয়লা স্থানীয় তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে ভূগর্ভস্থ পদ্ধতিতে মজুদের একটি সীমিত অংশ তোলা সম্ভব হচ্ছে। খনির উত্তর ও দক্ষিণ অংশে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে উত্তোলনের সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে। বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের হিসাব অনুযায়ী, ওই দুই অংশ থেকে প্রায় ১৭ কোটি টন কয়লা উত্তোলনের সম্ভাবনা রয়েছে। এ বিষয়ে নীতিগত অনুমোদন ও নির্দেশনা চেয়ে গত ২ জুলাই পেট্রোবাংলা জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে চিঠি দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। প্রকল্প এগিয়ে নিতে বিস্তারিত কারিগরি ও অর্থনৈতিক সমীক্ষা প্রয়োজন।
পরিবেশ ও পুনর্বাসন বড় চ্যালেঞ্জ
উন্মুক্ত পদ্ধতিতে বেশি কয়লা উত্তোলন করা গেলেও এতে বিপুল জমি অধিগ্রহণ, কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, পানির স্তর পরিবর্তন ও পরিবেশগত ক্ষতির ঝুঁকি রয়েছে। ফুলবাড়ীতে অতীতের কয়লাখনি-সংক্রান্ত আন্দোলনও স্থানীয় জনগণের আস্থা অর্জনের গুরুত্ব তুলে ধরে। প্রকল্প বাস্তবায়নে জমির মালিকদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ, বিকল্প আবাসন ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার পাশাপাশি জীবিকা হারানোর ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোকেও পুনর্বাসনের আওতায় আনতে হবে। ক্ষতিপূরণ বণ্টনে স্বচ্ছতা ও অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থাও জরুরি।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়লা উত্তোলনের আগে স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে কারিগরি, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সমীক্ষা করা প্রয়োজন। এতে উত্তোলন পদ্ধতির ব্যয়-সুবিধা, ব্যবহারযোগ্য কয়লার পরিমাণ এবং কৃষিজমি ও পানিসম্পদের ওপর প্রভাব মূল্যায়ন করতে হবে।
সমীক্ষায় দেশীয় কয়লা উত্তোলন লাভজনক প্রমাণিত হলে তা আমদানির চাপ কমানো ও স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে প্রকল্পের আর্থিক সুফলের পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষা ও স্থানীয় জনগণের স্বার্থ নিশ্চিত করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
