জুমার দিন মুসলমানদের জন্য এক অতি বরকতময় ও সপ্তাহের সেরা দিন। এ দিনে জুমার দুই রাকাত ফরজ নামাজের পাশাপাশি সুন্নাত নামাজ আদায় করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ ও সওয়াবের কাজ। কিন্তু অনেকের মনেই প্রশ্ন থাকে— জুমার সুন্নাত নামাজ আসলে কত রাকাত এবং রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তার সাহাবিরা এ বিষয়ে কী আমল করেছেন?
১. প্রতিদিন ১২ রাকাত সুন্নতের ফজিলত
সাধারণ দিনগুলোতে ফরজ নামাজের পাশাপাশি রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তার সাহাবিরা নিয়মিত ১২ রাকাত সুন্নত গুরুত্বের সঙ্গে (মুআক্কাদা) আদায় করতেন। এ নামাজগুলোর অপরিসীম ফজিলত সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত খুশী হয়ে একটি সুখবর দিয়েছেন। সাধারণ দিনে এই ১২ রাকাত সুন্নত যেভাবে আদায় করতে হয়—
ফজর: ফরজের পূর্বে ২ রাকাত সুন্নত।
জোহর: ফরজের পূর্বে ৪ রাকাত ও ফরজের পরে ২ রাকাত সুন্নত।
মাগরিব: ফরজের পরে ২ রাকাত সুন্নত।
ইশা: ফরজের পরে ২ রাকাত সুন্নত।
২. জুমার দিনে সুন্নত নামাজের সঠিক হিসাব
জুমার দিনে জোহরের চার রাকাত ফরজের স্থলে জুমার মূল ফরজ নামাজ আদায় করা হয় দুই রাকাত। দৈনন্দিন ১২ রাকাত সুন্নতের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে গিয়ে আলেমদের অধিকাংশের মতে জুমার সুন্নতে মুআক্কাদা দাঁড়িয়েছে মোট ৮ রাকাত। তাহলো—
জুমার আগে: ৪ রাকাত সুন্নত।
জুমার পরে: ৪ রাকাত সুন্নত।
কোনো কোনো আলেমের মতে জুমার পরে ৬ রাকাত সুন্নত আদায় করা উত্তম। তবে সিংহভাগ আলেমের সিদ্ধান্ত হলো— জুমার পর ৪ রাকাত সুন্নতে মুআক্কাদা এবং অতিরিক্ত ২ রাকাত পড়া সুন্নতে জায়েদা বা গায়রে মুআক্কাদা।
৩. জুমার পূর্বের ৪ রাকাত সুন্নতের দলিল
জুমার ফরজ নামাজের পূর্বে ৪ রাকাত সুন্নত আদায় করার ভিত্তি সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়িদের আমল থেকে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত। প্রখ্যাত সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) জুমার আগে নিয়মিত চার রাকাত সুন্নত নামাজ আদায় করতেন। এ ছাড়া প্রখ্যাত তাবেয়ি হজরত ইবরাহিম নাখঈ (রহ.) উল্লেখ করেছেন যে, সাহাবায়ে কেরাম জুমার মূল ফরজের পূর্বে চার রাকাত সুন্নত আদায় করতেন।
৪. কুরআন ও হাদিসের আলোকে সুন্নত নামাজের দলিল
সুন্নত নামাজের মর্যাদা এবং দৈনন্দিন ১২ রাকাতের গুরুত্ব সম্পর্কে হাদিসে সরাসরি বিবরণ এসেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রতিদিনের ১২ রাকাত সুন্নত আদায়ের ফজিলত বর্ণনা করে বলেছেন—
مَنْ صَلَّى اثْنَتَيْ عَشْرَةَ رَكْعَةً فِي يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ بُنِيَ لَهُ بِهِنَّ بَيْتٌ فِي الْجَنَّةِ
‘যে ব্যক্তি প্রতিদিন ও রাতে (ফরজ ব্যতীত) ১২ রাকাত (সুন্নত) নামাজ আদায় করবে, তার জন্য জান্নাতে একটি ঘর নির্মাণ করা হবে।’ (মুসলিম ৭২৮)
সাধারণ দিনের সুন্নত বণ্টনের হাদিস
রাসুলুল্লাহ (সা.) এ ১২ রাকাতের সময়সীমা ও বণ্টন নির্দেশ করে ইরশাদ করেছেন—
أَرْبَعًا قَبْلَ الظُّهْرِ وَرَكْعَتَيْنِ بَعْدَهَا وَرَكْعَتَيْنِ بَعْدَ الْمَغْرِبِ وَرَكْعَتَيْنِ بَعْدَ الْعِشَاءِ وَرَكْعَتَيْنِ قَبْلَ صَلاةِ الْفَجْرِ
‘চার রাকাত জোহরের ফরজের আগে, দুই রাকাত জোহরের ফরজের পরে, দুই রাকাত মাগরিবের ফরজের পরে, দুই রাকাত ইশার ফরজের পরে এবং দুই রাকাত ফজরের ফরজের আগে।’ (তিরমিজি ৪১৫)
সাহাবিদের আমলের বর্ণনা
হজরত আবু উবাইদ (রহ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بن مسعود، أَنَّهُ كَانَ يُصَلِّي قَبْلَ الْجُمُعَةِ أَرْبَعًا
‘আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) জুমার পূর্বে চার রাকাত নামাজ আদায় করতেন।’ (মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বা ৫৪০২২)
এ ছাড়া প্রখ্যাত তাবেয়ি হজরত ইবরাহিম নাখঈ (রহ.) সাহাবিদের সুন্নত আদায়ের আমল সম্পর্কে বলেছেন—
كَانُوا يُصَلُّونَ قَبْلَ الْجُمُعَةِ أَرْبَعًا
‘সাহাবায়ে কেরাম জুমার পূর্বে চার রাকাত সুন্নত নামাজ আদায় করতেন।’ (মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বা ৫৪০৫)
জুমার দিনটি ইমানদারদের জন্য যেমন আনন্দের, তেমনি পরম সাওয়াব অর্জনের এক অবারিত সুযোগ। জুমার দুই রাকাত ফরজের পাশাপাশি জুমার পূর্বে ৪ রাকাত এবং জুমার পরে ৪ রাকাত (কিংবা অতিরিক্ত আরও ২ রাকাতসহ ৬ রাকাত) সুন্নত আদায় করার মাধ্যমে আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ ও সাহাবিদের অনুসৃত পথের সঠিক অনুসরণ করতে পারি। জুমার দিনের এই মহান আমলগুলো যেন আল্লাহর নৈকট্য ও জান্নাতের সুউচ্চ মাকাম অর্জনে সহায়ক হয়।