দেশের আকাশপথে যাত্রী চলাচল দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু সে অনুপাতে বাড়ছে না বিমানবন্দরগুলোর অবকাঠামো, পরিচালন সক্ষমতা ও যাত্রীসেবার মান। ফলে সম্ভাবনাময় বিমান পরিবহন খাতের অগ্রগতির পাশাপাশি যাত্রীদের দুর্ভোগও বাড়ছে। দেশের আটটি বিমানবন্দরে যাত্রীর চাপ বৃদ্ধির যে চিত্র উঠে এসেছে, তা শুধু অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার ঘাটতিরও ইঙ্গিত দেয়।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশের বিমানবন্দরগুলো দিয়ে যাত্রী চলাচল আগের বছরের তুলনায় ৫ দশমিক ৪১ শতাংশ বেড়েছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই যাত্রী চলাচল করেছে এক কোটির বেশি। এর মধ্যে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ব্যবহার করেছেন ৮৫ লাখের বেশি যাত্রী। অথচ এই বিমানবন্দরের বছরে প্রায় ৮০ লাখ যাত্রী ব্যবস্থাপনার সক্ষমতার কথা বলা হচ্ছে। অর্থাৎ যাত্রীসংখ্যা ও সক্ষমতার মধ্যে ব্যবধান কতটা প্রকট, তা সহজেই অনুমেয়। এই চাপের প্রভাব পড়ছে ইমিগ্রেশন, নিরাপত্তা তল্লাশি, লাগেজ সরবরাহ ও যাত্রী চলাচলের প্রতিটি ধাপে। দীর্ঘ সারি, লাগেজ পেতে বিলম্ব এবং কাস্টমস তল্লাশি নিয়ে ভোগান্তির অভিযোগ বিমানবন্দরের সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। বিদেশযাত্রা কিংবা দেশে ফেরার সময় একজন যাত্রীর জন্য বিমানবন্দর হওয়ার কথা সুশৃঙ্খল ও স্বস্তিদায়ক প্রবেশদ্বার। অথচ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় অনেক ক্ষেত্রে সেটিই হয়ে উঠছে দুর্ভোগের জায়গা। বিশেষ করে প্রবাসী কর্মী, বয়স্ক মানুষ, শিশু ও অসুস্থ যাত্রীদের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা আরও কষ্টকর। উদ্বেগের বিষয় শাহজালালের ওপর দেশের বিমান পরিবহন ব্যবস্থার অতিরিক্ত নির্ভরতা। দেশের মোট যাত্রীর প্রায় ৮৩ শতাংশ এই একটি বিমানবন্দর ব্যবহার করেন। অন্যদিকে সিলেট ও কক্সবাজার বিমানবন্দরে যাত্রী প্রবৃদ্ধি ২০২৫ সালে যথাক্রমে ১৮ দশমিক ৬৩ ও ১৮ দশমিক ৩৬ শতাংশে পৌঁছেছে। এ পরিসংখ্যান আঞ্চলিক বিমানবন্দরগুলোর সম্ভাবনার পাশাপাশি সেখানে ভবিষ্যৎ চাপ মোকাবিলার প্রস্তুতি নেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরে।
শুধু নতুন টার্মিনাল নির্মাণ কিংবা অবকাঠামো সম্প্রসারণই সমস্যার একমাত্র সমাধান নয়। প্রয়োজন দক্ষ জনবল, আধুনিক প্রযুক্তি, দ্রুত ইমিগ্রেশন, কার্যকর লাগেজ ব্যবস্থাপনা এবং কাস্টমস তল্লাশিতে স্বচ্ছ ও নিয়মভিত্তিক পদ্ধতি। যাত্রীসেবার প্রতিটি পর্যায়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় দীর্ঘসূত্রতা ও হয়রানির অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি। একই সঙ্গে শাহ আমানত ও ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনায় বিমান সংস্থাগুলোকে উৎসাহিত করার উদ্যোগ কার্যকর করা যেতে পারে। ফ্লাইটের সময়সূচি দিনের বিভিন্ন সময়ে সুষমভাবে বণ্টন, আঞ্চলিক বিমানবন্দরগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং যাত্রীদের বিকল্প সুবিধা সম্প্রসারণের মাধ্যমে ঢাকার ওপর চাপ কমানো সম্ভব। বিমানবন্দরে যাত্রী গ্রহণ ও বিদায় জানাতে আসা দর্শনার্থীদের চলাচলও পরিকল্পিতভাবে নিয়ন্ত্রণ করা দরকার, যাতে নিরাপত্তা ও যাত্রীসেবায় বিঘ্ন না ঘটে।
বিমান পরিবহন খাত দেশের অর্থনীতি, পর্যটন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও প্রবাসী আয়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাই ক্রমবর্ধমান যাত্রীর চাপকে কেবল সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না; এটিকে উন্নয়নের সুযোগ হিসেবেও কাজে লাগাতে হবে। এ জন্য বিমানবন্দর সম্প্রসারণের চলমান ও পরিকল্পিত প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি পর্যালোচনা, বাস্তবসম্মত সময়সীমা নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করা জরুরি।
যাত্রী বাড়ছে, এই প্রবৃদ্ধি থামানো সম্ভব নয়; বরং নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল সেবা দিয়ে তা সামলানোর সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। বিমানবন্দর কেবল যাতায়াতের অবকাঠামো নয়, আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই যাত্রীর চাপের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অবকাঠামো, জনবল ও সেবার মান উন্নয়নে এখনই সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় যাত্রী বৃদ্ধির সাফল্য শেষ পর্যন্ত দুর্ভোগের অভিজ্ঞতায় ঢাকা পড়বে।
