সাত মামলায় ২২ জনের মৃত্যুদণ্ড
জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) এ পর্যন্ত সাতটি মামলার রায় হয়েছে। এসব মামলায় মোট ৬৮ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ড দেওয়া হয়েছে।
- পলাতকদের গ্রেফতারের চেষ্টা করা হচ্ছে - পুলিশ সদর দপ্তর
- দণ্ডপ্রাপ্ত ৬৮ জনের মধ্যে ৪৭ জনই পলাতক
- রায় বাস্তবায়নের দায়িত্ব সরকারের - প্রসিকিউটর
- মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামীদের নামে ইন্টারপোলে রেড নোটিশও জারি নেই
জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) এ পর্যন্ত সাতটি মামলার রায় হয়েছে। এসব মামলায় মোট ৬৮ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ড দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে মৃত্যুদণ্ড পেয়েছেন ২২ জন। এসব মৃত্যুদণ্ডের একটিরও বাস্তবায়ন নেই। দণ্ডপ্রাপ্ত আসামীদের অধিকাংশ পলাতক রয়েছে। তারা গ্রেফতার হচ্ছে না। বিদেশে পলাতকদের বিরুদ্ধেও ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারি করা হয়নি। তবে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে বলা হয়েছে, পলাতকদের গ্রেফতার করতে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
সূত্রমতে, জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) এ পর্যন্ত সাতটি মামলার রায় হয়েছে। এসব মামলায় মোট ৬৮ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ড দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে মৃত্যুদণ্ড পেয়েছেন ২২ জন। ১১ জন যাবজ্জীবন এবং ৩৩ জন বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড পেয়েছেন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। ২২ জনের মধ্যে ১৮ জন পলাতক এবং চারজন কারাগারে রয়েছেন। মৃত্যুদণ্ডসহ বিভিন্ন মেয়াদে সাজাপ্রাপ্ত ৪৭ জন এখনো পলাতক রয়েছে। তারা গ্রেফতার হচ্ছেন না। শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জমান কামালসহ তাদের অধিকাংশই প্রতিবেশী দেশ ভারতে অবস্থান করছে বলে বিভিন্ন সংবাদ মারফত জানা গেছে। কিন্তু মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামীদের এখনো ইন্টারপোলে রেড নোটিশ জারি হয়নি। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে বলা হয়েছে, পলাতক আসামীদের বিরুদ্ধে গ্রেফতার করতে আইন অনুযায়ী পুলিশের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান কামাল ও বেনজিরসহ কয়েকজনের বিষয়ে ইন্টারপোলে রেড নোটিশ জারির জন্য আবেদন করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে কতজনের জন্য আবেদন করা হয়েছে আর এসব আবেদনের সর্বশেষ অবস্থা কী এ সর্ম্পকে সুস্পষ্ট তথ্য জানা যায়নি।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ২২ জন
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ২২ জন হলেন—শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান কামাল, ওবায়দুল কাদের, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, শেখ ফজলে শামস পরশ, মাইনুল হোসেন খান নিখিল, সাদ্দাম হোসেন, শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান, মো. সাইফুল ইসলাম, রনি ভূঁইয়া, হাবিবুর রহমান, সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, শাহ আলম মোহাম্মদ আখতারুল ইসলাম, এএফএম সায়েদ, আব্দুল মালেক, বিশ্বজিৎ সাহা, মুকুল চোখদার, আমির হোসেন, সুজন চন্দ্র রায়, মো. রাশেদুল ইসলাম ও মো. মশিউর রহমান।
হাবিবুর রহমান চানঁখারপুল ও রামপুরা-বনশ্রী হত্যাকাণ্ড—দুই মামলাতেই মৃত্যুদণ্ড পেয়েছেন। ফলে তার বিরুদ্ধে দুটি পৃথক মৃত্যুদণ্ড হলেও পৃথক ব্যক্তি হিসেবে ২২ জনের হিসাবের মধ্যে তাকে একবারই গণনা করা হয়েছে।
কারাগারে চারজন, পলাতক ১৮
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ২২ আসামীর মধ্যে বর্তমানে চারজন কারাগারে রয়েছেন। তারা হলেন আশুলিয়া মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত আব্দুল মালেক ও মুকুল চোখদার এবং আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ড মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত আমির হোসেন ও সুজন চন্দ্র রায়। অন্য ১৮ জন পলাতক রয়েছেন।
যে সাত মামলায় রায়
ট্রাইব্যুনালের সাত মামলার রায়ে মোট দণ্ডপ্রাপ্তের সংখ্যা ৬৮ এবং পৃথক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামীর সংখ্যা ২২।
শেখ হাসিনা মামলা: ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। রাজসাক্ষী হওয়া সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। হাসিনা ও কামালের বিচার তাদের অনুপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হয়।
চানঁখারপুল হত্যাকাণ্ড: ২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী এবং সাবেক এডিসি শাহ আলম মোহাম্মদ আখতারুল ইসলামকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। আরও পাঁচ পুলিশ কর্মকর্তাকে তিন থেকে ছয় বছরের বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
আশুলিয়া হত্যাকাণ্ড ও লাশ পোড়ানো: ২০২৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকা-১৯ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলাম ও যুবলীগ ক্যাডার রনি ভূঁইয়াসহ ছয়জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। দণ্ডপ্রাপ্ত অন্য চার সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা হলেন এএফএম সায়েদ, আব্দুল মালেক, বিশ্বজিৎ সাহা ও মুকুল চোখদার। এ ছাড়া নয়জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে সাতজনকে যাবজ্জীবন এবং দুজনকে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ড: ২০২৬ সালের ৯ এপ্রিল সাবেক এএসআই আমির হোসেন ও সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়কে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। অন্য তিনজনকে যাবজ্জীবন এবং বাকিদের বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
রামপুরা-বনশ্রী হত্যাকাণ্ড: ২০২৬ সালের ২৮ জুন ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক এডিসি মো. রাশেদুল ইসলাম ও রামপুরা থানার সাবেক ওসি মো. মশিউর রহমানকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে ২০ বছরের কারাদণ্ড এবং তরিকুল ইসলাম ভূঁইয়াকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। হাসানুল হক ইনুর মামলা: ২০২৬ সালের ৩০ জুন জাসদ সভাপতি ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুকে আটটি অভিযোগের মধ্যে তিনটিতে দোষী সাব্যস্ত করে ৩০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। বাকি পাঁচটি অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দেওয়া হয়।
ওবায়দুল কাদেরের মামলা: ২০২৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, শেখ ফজলে শামস পরশ, মাইনুল হোসেন খান নিখিল, সাদ্দাম হোসেন ও শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
ট্রাইব্যুনালের রায় বাস্তবায়নের দায়িত্ব সরকারের
রায় ঘোষণার সংখ্যা বাড়লেও এখন পর্যন্ত একটি মৃত্যুদণ্ডও কার্যকর হয়নি। দণ্ডপ্রাপ্তদের একটি বড় অংশ এখনও পলাতক। আবার কোনো কোনো মামলার রায়ের বিরুদ্ধে আপিল হয়েছে, কোনোটি রয়েছে উচ্চ আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায়। ফলে ট্রাইব্যুনালের রায়ের খাতা ভারী হলেও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের হিসাব এখনো শূন্য।
এ পরিস্থিতিতে বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর দণ্ড কার্যকরের দায়িত্ব কার, আপিল নিষ্পত্তিতে বিলম্বের কারণ কী এবং পলাতক আসামীদের দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে কী ধরনের আইনি জটিলতা রয়েছে—এসব প্রশ্ন সামনে এসেছে।
ট্রাইব্যুনালের রায় কার্যকর না হওয়া প্রসঙ্গে প্রসিকিউশন জানিয়েছে, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বিচারপ্রক্রিয়া শেষ করে রায় দেওয়া পর্যন্তই ট্রাইব্যুনালের দায়িত্ব। দণ্ড কার্যকরের বিষয়টি মূলত নির্বাহী বিভাগ বা সরকারের এখতিয়ার। কোনো রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হলে তা নিষ্পত্তি করেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে আপিল দায়েরের পর তা ৬০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তির বিধান থাকলেও, মামলার চাপের কারণে অনেক ক্ষেত্রে তা যথাসময়ে সম্ভব হচ্ছে না। প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ রয়েছে। আপিল বিভাগে তা নিষ্পত্তির পর দণ্ড কার্যকরের বিষয় আসে। আইন অনুযায়ী আপিল ফাইলের তারিখ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে তা নিষ্পত্তির বিধান রয়েছে। তবে আপিল বিভাগের মামলার চাপের কারণে অনেক ক্ষেত্রে এ সময়সীমা মানা সম্ভব হচ্ছে না। দ্রুত শুনানি ও নিষ্পত্তির জন্য প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে নিয়মিত আবেদন করা হচ্ছে।
ট্রাইব্যুনালের যেসব রায়ে প্রসিকিউশন সংক্ষুব্ধ হয়েছে, সেসবের বিরুদ্ধে আপিল করা হয়েছে। কনস্টেবল সুজনের সাজা বাড়ানোর জন্য আপিল করা হয়েছে। সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনুকে দেওয়া ১০ বছরের সাজাকেও অপর্যাপ্ত মনে করে সাজা বাড়ানোর জন্য আপিল করেছে প্রসিকিউশন।
পলাতকদের নিয়ে প্রশ্ন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তসহ অধিকাংশ আসামী পলাতক থাকায় তাদের গ্রেপ্তার এবং দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। প্রসিকিউটর তামিম বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মূল দায়িত্ব মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করা। আসামীদের গ্রেপ্তার করা ট্রাইব্যুনালের কাজ নয়; এটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব।
দণ্ডিত ৬৮ জনের মধ্যে ৪৭ জন পলাতক। আর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ২২ জনের মধ্যে মাত্র চারজন পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন। অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পরও অধিকাংশ দণ্ডিত ব্যক্তি দেশের বাইরে বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন। ফলে চূড়ান্ত বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হলেও বাস্তবে সাজা কার্যকরের প্রশ্নে আসামীদের অবস্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, আদালত থেকে পুলিশের কাছে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এলে পুলিশ তা তামিল করে থাকে। বিভিন্ন সময়ে পুলিশ পরোয়ানামূলে অনেক আসামীকে গ্রেপ্তার করেছে। এটা চলমান প্রক্রিয়া। পলাতক দণ্ডপ্রাপ্তদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম এন্ড অপারেশন) মো: সায়েদুর রহমান দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, পলাতকদের গ্রেফতারে ওয়ারেন্ট তামিল করার চেষ্টা করা হচ্ছে। দেশের বাইরে পলাতক আসামীদের বিষয়ে এনসিবি’র মাধ্যমে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। ইন্টারপোলের মাধ্যমে তাদেরকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে বলে তিনি জানান। তবে এ পর্যন্ত কতজনের বিষয়ে ইন্টারপোলে আবেদন করা হয়েছে আর কতজনের বিষয়ে রেড নোটিশ জারি হয়েছে তা সুনির্দিষ্ট ভাবে রেকর্ড দেখে বলতে হবে বলে তিনি জানান।
৭০টির বেশি মামলা বিচারাধীন
প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, শুধু সাতটি মামলার রায়েই বিচারিক কার্যক্রম থেমে নেই। পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালে অভিযোগের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। ২০০৯ সাল থেকে সংঘটিত গুম, খুনসহ বিভিন্ন ঘটনার অভিযোগও বিচারপ্রক্রিয়ার আওতায় আনা হচ্ছে। বর্তমানে প্রসিকিউশনে প্রায় ৬০০টি অভিযোগ জমা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে। এর মধ্যে ৭০টির বেশি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। অনেক মামলায় ইতোমধ্যে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়েছে। ফলে সামনে আরও একাধিক মামলার রায় আসতে পারে।
